মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

লাভশেডিং 

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২২, ২১:৪৩

আমি যেই বাসায় ব্যাচেলর হিসেবে ভাড়া থাকি সেই বাসার নাম হৃদি ভিলা। হৃদি ইন্টারমিডিয়েটে পড়ে। তার নামেই বাসার নামকরণ। ছোট্ট একটা মেয়ে, অথচ প্রেম-ভালোবাসা তাকে জিম্মি করে রেখেছে। এই ভালোবাসা অন্য কারও সাথে হলে বেজায় খুশি হতাম। ভালো নাকি আমাকেই বাসে; বিপত্তিটা এখানেই। আমাকে একবার সিঁড়িঘরে থামায়, একবার গেটে, আরেকবার দরজার সামনে। থামিয়ে জোর করে ভালোবাসা আদায় করতে চায়। একদিন তো কলার ধরে শাসিয়ে দিল।

‘এই আপনার পিছনে যে এত ঘুরঘুর করি একটুও কি মন গলে না?’

আমি ব্যাপারটা হেসে উড়িয়ে দিয়ে ঠাট্টাচ্ছলে বলেছিলাম, ‘সামান্য তাপে কখনো সোনা গলে না।’

‘তাহলে কেমন তাপ লাগবে?’

‘আরও উত্তাপ, আরও প্রগাঢ় ভালোবাসা।’ বলে চোখ টিপ মারলাম।

হৃদি ভালো করেই জানে আমি সিরিয়াসলি এসব বলিনি। সে রাগে কটমট করছে। ঝটকা মেরে কলার ছেড়ে চলে গিয়েছিল সেদিন।

আরেকদিন ছাদে কাপড় শুকাতে গিয়েছিলাম। সেখানেও হৃদি এসে উপস্থিত। আমার দিকে না তাকিয়েই সে বলেছিল, ‘ছেলেদের কাপড় ধোয়া মানায় না, একদম বাজে লাগে।’

‘তাহলে আমার কাপড়গুলো আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এসে ধুয়ে দিবে?’

হৃদি লাজুক মুখে বলেছিল, ‘জো বাইডেন না ধুয়ে দিলেও হৃদি ধুয়ে দিবে। সে এই দায়িত্বটা নিতে চায়।’

‘আচ্ছা দিলাম দায়িত্ব। এখন বালতি থেকে একটা টি-শার্ট নিয়ে শুকাতে দাও। পারফরম্যান্স দেখি।’

হৃদির দাঁতে হাসির ঝলক। বালতি থেকে টি-শার্ট নিতে নিতে বলল, ‘এই দায়িত্ব কিন্তু স্থায়ীভাবে পালন করতে চাই।’

আমি বললাম, ‘স্থায়ীই ঘোষণা করলাম। তবে বেতন ১ হাজারের বেশি দিতে পারব না।’

এতদিন হৃদির হাসি আর রাগ দেখেছি। সেদিন দেখলাম জ্বলন্ত মুখ। মুখ থেকে আগুনের ফুলকি বেরুচ্ছে। ফুলকিগুলো এসে আমার গায়ে লাগছে। সেই ফুলকির স্পর্শ পেয়ে কী যে শান্তি পেলাম! তার রাগান্বিত মুখ দেখে আমার হাসির রোল থামছে না। সে চট করে ভেজা টি-শার্ট দিয়ে আমার মুখে ছুঁড়ে মেরে বলল, ‘আমি তোর বুয়া লাগি?’

আমি বললাম, ‘ভালোই হলো, আমার মুখটা ঠান্ডা করে দিলে। এই রোদে সত্যি পুড়ে যাচ্ছিলাম।’

রাত পৌনে ৯টা। বাথরুমের ভীষণ চাপ পেয়েছে। একপ্রকার দৌড়েই গেলাম শান্তির ঘরে। বাথরুম করা শেষে অবাক কাণ্ড ঘটল! ট্যাংকে পানি নেই। সুইচ ঘুরাতে ঘুরাতে একদম ঢিলা করে ফেললাম। তবুও আশানুরূপ পানি বের হলো না। যেটুকু বের হলো সেটুকু দিয়ে বদনার তলা ভিজল মাত্র। মন খারাপের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে নিজের ভুল বুঝতে পারলাম। আসলে বাথরুমে প্রবেশ করার সাথেই পানি আছে কি-না চেক করে নেওয়া দরকার ছিল। নিজের ওপর ভীষণ রাগ হলো। রাগের এক পর্যায়ে মনে পড়ল তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ফোনটা পকেটেই নিয়ে এসেছি। আমি যেন আলাদীনের প্রদীপ পেলাম। ফোনকে বলব, এই ফোন তুই ট্যাংকে পানি তুলে দে আর ওমনি সে পানি তুলে দিবে। এমন একটা ভাব নিয়ে ফোন বের করলাম। ফেসবুকে গিয়ে হূদিকে মেসেজ করলাম। হৃদি এক্টিভ নেই। এই মেয়ে প্রায় সারাদিনই ফেসবুকে পড়ে থাকে। তাই একটু পর আবারও এক্টিভ হবে সেই প্রতীক্ষায় প্রায় ১০ মিনিট বসে থাকলাম। হৃদি এক্টিভ হলো। আমার মেসেজ সিন করল। বলল, ‘বলেন সাহেব।’

‘এই হৃদি ট্যাংকে বোধহয় একটুও পানি নেই। মটরটা চালু করো না তাড়াতাড়ি। আমি ১০ মিনিট থেকে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।’

হৃদি হাসল। জগত কাঁপানো হাসি। আর এদিকে আমি রাগে ফুলে যাচ্ছি।

‘দেখো ফান করিও না। আমি ফানের জায়গায় বসে নেই। তাড়াতাড়ি মটরটা অন করো প্লিজ।’

‘ফানের জায়গায় বসে নেই তবে সেখানে একটা ফ্যান থাকলে ভালোই হতো। অন্তত আরামে বসে থাকতে পারতেন। আহারে! বেচারা গরমে বোধহয় মারা গেল।’

আমি রাগের ইমুজি দিয়ে বললাম, ‘ব্লক দিব কিন্তু।’

হৃদি চট করে বলল, ‘দাও না।’

এই মেয়ে দেখছি বদ আছে। বিপদে রসিকতা করছে। এই মুহূর্তে রসিকতা ভালো লাগছে না। নরম গলায় বললাম, ‘নাও, অনেক মজা করছ। এখন আমাকে বাথরুম থেকে বের হওয়ার সুযোগ দাও।’

‘তো বের হন না। আমি বাইরে থেকে খিল মেরে দিইনি তো।’

আবারও রাগের ইমুজি দিলাম, ‘আর কতক্ষণ মজা নেবে?’

‘যতক্ষণ না সোনা গলছে।’

‘ও তুমি আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছ?’

‘হ্যাঁ। এমন সুযোগ প্রতিদিন আসে না। হি হি হি।’

‘আচ্ছা পানি দাও, ছাদে গিয়ে কথা বলব।’

‘না সোনা। যতক্ষণ না তোমাকে সত্যি সত্যি গলাতে পারছি ততক্ষণ পর্যন্ত পানি দেব না।’

‘ঠিক আছে রাজি।’

‘কী রাজি?’

‘ভালোবাসি।’

‘কাকে?’

‘তোমাকে।’

‘বলো, আমি তোমাকে ভালোবাসি এবং আজ থেকে আর উপহাস করব না।’

‘ভালোবাসি, উপহাস করব না।’

‘এত শর্ট কেন? পানিও অল্প দেব। হাফ বদনা হলেই মটর অফ। হা হা হা।’

‘হৃদি আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। এবং আজ থেকে আর উপহাস করব না।’

‘ধন্যবাদ সোনা। অবশেষে গললা।’

হৃদি বোধহয় মটর অন করতে গেল। বাথরুমে বসে ভাবছি আর ভাবছি। মেয়েটা ভারী ড্রাঞ্জেরাস। এমন মেয়ে যেন দুশমনের কপালেও সেটিং না হয়। ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ বাথরুমটা কেমন অন্ধকার হয়ে গেল। সাথে ফোনে বাজল টুং শব্দ। হৃদি মেসেজ দিয়েছে, ‘মটর চালু করার আগেই তো কারেন্ট চলে গেল সাহেব।’

আমি বোবার মতো বসে থাকলাম। বর্তমানে উত্পাদন সংকটের জন্য এলাকাভিত্তিক শিডিউল করে বিদ্যুৎ সাপ্লাই দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে আর আসার থাকে না। এই বিদ্যুৎ তো এক ঘণ্টার আগে আসবে বলেও মনে হয় না। হৃদিকে ধমক দিলাম, ‘তোমার খামখেয়ালির জন্যই এত বড় বিপদ হলো। ১৫ মিনিট আমাকে বসিয়ে রাখলে। এখন আবার এক ঘণ্টা বসে থাকতে হবে। ভাগ্যে শনির দশা থাকলে আরও বেশি। তুমি কি মানুষ হৃদি?’

‘জি মানুষ। মানুষ বলেই মায়া করে মটরের সুইচ দিতে গিয়েছিলাম। আমার দায়িত্ব শেষ। কারেন্ট চলে গিয়েছে এটা আপনার দুর্ভাগ্য। এখন আরও এক ঘণ্টা বসে থাকেন। আমাকে অবহেলার শাস্তি এটা। হি হি হি। আম্মু ডাকছে, আমি গেলাম।’

এই বলে হৃদি অফলাইনে চলে গেল। আর আমি অন্ধকার বাথরুমে গালে হাত দিয়ে বসে রইলাম।

এক ঘণ্টা হয়ে গেল, বিদ্যুৎ আসেনি। জানি না এই অন্ধকার থেকে কখন আলোতে ফিরতে পারব।

দেবীগঞ্জ, পঞ্চগড়

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন