নিম্নচাপের প্রভাবে গতকাল রবিবার প্রবল জোয়ার ও বৃষ্টির পানিতে দেশের উপকূলীয় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত নিম্নচাপের কারণে সাগর উত্তাল রয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। পর্যটকদের সৈকতে নামতে নিরুত্সাহিত করা হচ্ছে। মাছ ধরার ট্রলারগুলোকে সাগর মোহনায় ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের প্রধান আবহাওয়াবিদ আবদুল হামিদ মিয়ার বরাত দিয়ে কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপটি আরো ঘনীভূত হয়ে নিম্নচাপ আকারে ভারতের উড়িষ্যা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলের অদূরে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। এটি আরো উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে। এর প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় বায়ুচাপ পার্থক্যের আধিক্য বিরাজ করছে। সমুদ্র বন্দরসমূহ, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।
এদিকে সতর্ক সংকেত ও সাগর উত্তাল থাকায় কক্সবাজারে অবস্থান করা পর্যটকদের সমুদ্রস্নান কিংবা পানিতে নামার ক্ষেত্রে সতর্ক করছে ট্যুরিস্ট পুলিশ ও লাইফ গার্ড সদস্যরা। লাইফগার্ড কর্মী মো. ওসমান বলেন, ‘সমুদ্রে ৩ নম্বর সিগন্যাল পড়েছে শুনে আমরাও সতর্ক হই। কোনো পর্যটক যাতে পানির গভীরে না যায় সেদিকে নিয়মিত খেয়াল রাখছি।’
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘জোয়ারের পানিতে সৈকতে কয়েকটি পয়েন্ট ভাঙ্গছে। দর্শনার্থীদের সচেতনতায় নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে।’
কক্সবাজার জেলা বোট মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আহমদ জানান, সাগর উত্তাল থাকায় মাছ ধরার ট্রলারগুলো উপকূলের মোহনায় নোঙ্গররত অবস্থায় রয়েছে। কিছু আবার সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছে। সতর্ক সংকেত কেটে গেলে আবার ট্রলারগুলো মাছ ধরতে সাগরে যাবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
কক্সবাজার পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে। কুতুবদিয়া, মহেশখালী, চকরিয়া, উখিয়া ও টেকনাফ এলাকার জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, সাগর উত্তালের পাশাপাশি প্রচন্ড বাতাস থাকায় জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
খুলনা অফিস ও কয়রা সংবাদদাতা জানান, কয়রায় জোয়ারের পানির তোড়ে কপোতাক্ষ নদের চরামুখা বেড়িবাঁধ ভেঙে পাঁচ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ২-৩ ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। থেমে থেমে বৃষ্টি আর বৈরি আবহাওয়ার কারণে উপকূলীয় এলাকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে উপকূলীয় এলাকার মানুষ। শনিবার দুপুরে দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের কপোতাক্ষ নদের জোয়ারের পানির চাপে চরামুখা গ্রামের বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। তাত্ক্ষণিকভাবে স্থানীয় জনগণ ভেঙে যাওয়া বাঁধ মেরামত করলেও গতকাল দুপুরের জোয়ারের পানির তোড়ে আবারও সেই বাঁধ ভেঙে চরামুখা, হলুদবুনি, দক্ষিণ বেদকাশি, আংটিহারা ও ঘড়িলাল গ্রাম লবণ পানিতে প্লাবিত হয়েছে। সাতক্ষীরা পাউবোর পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহনেওয়াজ তালুকদার বলেন, বেড়িবাঁধের ভাঙ্গন মেরামতের কাজ চলছে।
বরিশাল অফিস জানায়, প্রবল বৃষ্টিপাত ও অস্বাভাবিক জোয়ারের কারণে জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত ও ফসলের ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। বরিশাল নগরীর নিম্নাঞ্চল পানিতে ডুবে গেছে। সদর উপজেলার লামচরি এলাকায় নদী ভাঙ্গনে সড়ক বিলীন হয়ে গেছে। জেলায় রবিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বিগত ২৪ ঘন্টায় ৭৭ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। কীর্তনখোলাসহ বিভাগের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি গত কয়েক দিন ধরে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে।
পিরোজপুর অফিস ও শরণখোলা (বাগেরহাট) সংবাদদাতা জানান, সাগরের জোয়ারে ৩/৪ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছাসে দুবলারচর ও সুন্দরবন প্লাবিত হয়েছে। হরিণসহ বণ্যপ্রাণী পুকুরপাড়সহ বনের উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। এদিকে পিরোজপুর জেলার উপজেলা সমূহের বেশিরভাগ নিম্নাঞ্চল জোয়ারের পানিতে ডুবে গেছে। টগড়া ফেরিঘাট ও আমড়াজুড়ি ফেরিঘাটের গ্যাংওয়ে তলিয়ে যাওয়ায় গাড়ি চলাচল বিঘ্নিত হয়।
কাউখালী (পিরোজপুর) সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। উপজেলার নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩০টি গ্রামের বাড়িঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠসহ ক্লাস রুম জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। বেকুটিয়া ফেরিঘাট, আমরাজুড়ি ফেরিঘাট এবং কাউখালী-সোনাকুর ফেরির গ্যাংওয়ে জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন পারাপারে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, মেঘনা নদীর সৃষ্ট অতিরিক্ত জোয়ারের পানিতে উপকূল সংলগ্ন বেশ কিছু এলাকা তলিয়ে গেছে। স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত তিন ফুটের বেশি পানি উপকূলে ঢুকে পড়েছে। এতে তলিয়ে গেছে বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট, মাছের পুকুর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ফসলি জমি। ফলে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন ভুক্তভোগীরা।
মোংলা (বাগেরহাট) সংবাদদাতা জানান, চার ফুট উচ্চতার জ্বলোচ্ছাসে প্লাবিত হয়েছে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের করমজল পর্যটন ও বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র। কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আজাদ কবির বলেন, রবিবার সুন্দরবনে সবচেয়ে বেশি পানি হয়েছে। চার ফুট পানিতে তলিয়েছে বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রসহ পুরো বন।
বরগুনা (উত্তর) প্রতিনিধি জানান, জেলার প্রধান ৩টি নদীতে (পায়রা-বিষখালী-বলেশ্বর) পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে পৌর শহরসহ নিন্মাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া তলিয়ে গেছে জেলার আমতলী-পুরাকাটা ও বড়ইতলা-বাইনচটকি ফেরির গ্যাংওয়ে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ।
বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, জোয়ারের পানিতে রামপাল উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বেশ কিছু এলাকার চিংড়ি ঘের ভেসে গেছে এবং ঘর বাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। এতে চিংড়ি ঘের মালিকদের ক্ষতিসহ ভোগান্তি বেড়েছে।
আমতলী (বরগুনা) সংবাদদাতা জানান, পায়রা নদীতে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৫৯ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে আমতলীর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পায়রা-আমতলী ফেরিঘাটের গ্যাংওয়ে তলিয়ে যানবাহন ও মানুষ চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। তলিয়ে গেছে আমতলী পৌর শহরের বিভিন্ন সড়ক। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন অর্ধলক্ষাধিক মানুষ।
হাতিয়া (নোয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, ৩/৪ ফুট জোয়ারের পানিতে নিঝুমদ্বীপসহ হাতিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বাঁধ না থাকায় নতুন করে উপজেলার সোনাদিয়া ইউনিয়ন, চরকিং ইউনিয়ন ও চরঈশ্বর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। তীব্র নদী ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে।
রামগতি (লক্ষ্মীপুর) সংবাদদাতা জানান, মেঘনা নদীর জোয়ারে পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৩-৪ ফুট বেড়ে যাওয়ায় রামগতির বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে নদী তীরবর্তী এলাকার অন্তত ২১টি সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাত সহশ্রাধিক শিক্ষার্থী দুর্ভোগে পড়েছে। এছাড়া চরাঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
