সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

গার্ডার দুর্ঘটনা

প্রকল্প দামি, কিন্তু...

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২২, ২১:৩০

রাজধানী উত্তরায় বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পে ক্রেন থেকে ওই প্রকল্পের গার্ডার পড়ে ৫ প্রাইভেটকারযাত্রী নিহতের ঘটনায় এখন পর্যন্ত দায় নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ। তাই সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে নগর বিশেষজ্ঞরা দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে বিচারহীনতা ও দায়িত্ব অবহেলাকে দুষছেন। গতকাল সোমবারের মর্মান্তিক গার্ডার দুর্ঘটনা দায় আজ মঙ্গলবার (১৬ আগস্ট) একাধিক কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমে যে যার মতো করে দুর্ঘটনার ব্যাখ্যা দিচ্ছে। তবে দায় নিতে চাচ্ছে না কেউ। 

উত্তরায় গার্ডার দুর্ঘটনার দায় কার-এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন সচিব সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমরা তদন্ত করছি। যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এই দুর্ঘটনার দায় আমার নয়। এ প্রকল্প দেখভাল করছে বিআরটি প্রকল্প পরিচালক, আপনারা তাদের জিজ্ঞাসা করেন।’ 

গার্ডার  দুর্ঘটনা কবলিত গাড়ি। ছবি: সংগৃহীত

দুর্ঘটনার পর বারবার চেষ্টা করেও প্রকল্প পরিচালককে ফোনে পাওয়া যায়নি। আজ দুর্ঘটনার স্থলে বিআরটি প্রকল্পের একাধিক কর্মকর্তাসহ বিআরটি প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শফিকুল ইসলামসহ পরিদর্শন গিয়ে ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র আতিকুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ‘কমপ্লায়েন্স (নিরাপত্তা ব্যবস্থা) নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ঢাকায় বিআরটিএ প্রকল্পের সব ধরনের কাজ বন্ধ থাকবে। সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর কাজ শুরু হবে। কোথাও একটু সিমেন্ট পড়ে যাবে, কোথাও রড পড়ে যাবে, তখন আবার প্রাণহানি হবে, সেটা হতে পারে না। খামখেয়ালির কারণে এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে। যে কোম্পানি এ কাজের চুক্তি করেছে, তারা সব শর্ত মেনেই চুক্তিতে সই করেছে। সরকার এসবের পেছনে টাকা দিচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে খামখেয়ালি।

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন মেয়র আতিক ও বিআরটি প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

তবে খামখেয়ালিপনার দায় ঠিকাদারের ওপর চাপিয়ে বিআরটি প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আসলে ঠিকাদারদের কাছ থেকে আমরা এই খামখেয়ালিপনা পাচ্ছি। কোনোভাবেই আমরা তাদের কমপ্লায়েন্সে আনতে পারছি না। সড়ক নিরাপত্তা যে একেবারে নেই, তা নয়। তবে ঘাটতি রয়েছে। আমরা দুঃখিত। দুর্ঘটনা নিয়ে ছয় সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি প্রাথমিক প্রতিবেদন সচিবের কাছে জমা দিয়েছে।’

এদিকে, উত্তরায় বিআরটি প্রকল্পের নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের গার্ডার দুর্ঘটনায় মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। এসময় সড়ক সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী জানান, ‘প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার ঘটনার মূল দায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের। তারা কাউকে না জানিয়ে কাজ করছিল অথচ গতকাল কাজ বন্ধ থাকার কথা। তাদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, এ ধরনের ব্যাপার ঘটলে তাদের যে দায়, সেই রকম ব্যবস্থাই তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে। এ নিয়ে বিশদভাবে বসবে মন্ত্রণালয় এবং আর কারও কোনো দায় আছে কি না, তা খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

গার্ডার  দুর্ঘটনা কবলিত গাড়ি। ছবি: সংগৃহীত

সংগ্রহকৃত সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে-রাস্তার মাঝখানে রাখা বিআরটি প্রকল্পের গার্ডার ক্রেন দিয়ে তোলা হচ্ছিল ট্রেইলারে। একপর্যায়ে ভারসাম্য হারিয়ে ক্রেন একদিকে কাত হয়ে যায়। তখন ক্রেনে থাকা গার্ডারটি প্রাইভেটকারের ওপর পড়ে। ভারী ওই গার্ডারের চাপে মুহূর্তের মধ্যে চ্যাপ্টা হয়ে যায় গাড়িটি। এ সময় কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী ওই ভিডিওতে দেখা যায়নি। ঝুঁকিপূর্ণ কাজের মধ্যেই ক্রেনের পাশ দিয়ে গাড়ি যাতায়াত করছিল।

বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক হাদিউজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, এ দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে বিচারহীনতা ও দায়িত্বহীনতা দেখছেন।

১৫ আগস্ট রাতে এক বিবৃতিতে সেভ দ্য রোডের চেয়ারম্যান জেড এম কামরুল আনাম জানান, বিআরটি প্রকল্পের গার্ডার চাপায় পাঁচজনের নির্মম মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে সেভ দ্য রোড। সংস্থাটি বলছে, বিআরটি প্রকল্পের মতো যত প্রকল্প রয়েছে, সব প্রকল্প বন্ধ করে প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতার ও বিচার করতে হবে।

বিবৃতিতে তারা উল্লেখ করেন, ১৫ আগস্ট গার্ডার পড়ে পাঁচজনের মৃত্যুই প্রথম নয়; এক মাস আগে গত ১৫ জুলাই ফ্লাইওভারের গার্ডার চাপায় বিআরটি প্রকল্পের নিরাপত্তারক্ষী জিয়াউর রহমান (৩০) নিহত হন। ওই ঘটনায় আহত হয়েছিলেন আরও দুজন।

গার্ডার  দুর্ঘটনা কবলিত গাড়ি। ছবি: সংগৃহীত

গার্ডার দুর্ঘটনার দায় কার এ বিষয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘সরকারের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের এনে বিআরটি প্রকল্পে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের কোনো জবাবদিহিতা নেই। অতীতের ঘটনায় দায়ীদের চিহ্নিত না করা এবং বিচার না হওয়ায় উত্তরার মতো এমন দুর্ঘটনা বারবার ঘটেছে। পদ্মা সেতু-মেট্রোরেলের মতো প্রকল্পগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে দামি প্রকল্প হলেও এসব প্রকল্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তেমন দামি নয় ।’

উল্লেখ্য, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার পথে বিশেষ লেনের মাধ্যমে বাস চলাচলের জন্য বিআরটি প্রকল্পের কাজ চলছে। ২০১২ সালে বিআরটি প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। ওই সময় মোট ২ হাজার ৩৯ কোটি ৮৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকার এই প্রকল্পটি শেষের মেয়াদ বলা হয়েছিল ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে; কিন্তু ২০১৭ সালে প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানো হয়। পরে২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে প্রাক্কলন ব্যয় বাড়িয়ে উন্নীত করা হয় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ ৪৩ হাজার টাকায়; কিন্তু এ নির্ধারিত সময়েও বিআরটির কাজ শেষ করা যায়নি। 

সেতু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ৯১৭ দিনে প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা। প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা এএফডি, গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি নামের একটি সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকার।

ইত্তেফাক/এএএম