বাংলাদেশের অর্থনীতি একধরনের সীমান্তরেখায় উপনীত হয়েছে। দেশের অর্থনীতি এখন অতীতের যে-কোনো সময়ের চেয়ে বেশি চাপের মুখে আছে বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সিপিডি বলছে, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটা শক্তি ছিল। সেই শক্তিতে একটা চিড় ধরেছে, দুর্বলতা দেখা দিয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘জাতীয় অর্থনীতির পর্যালোচনা ও আসন্ন বাজেট প্রসঙ্গ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সিপিডির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এতে সিপিডির স্বাধীন পর্যালোচনা তুলে ধরেন সংস্থাটির গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান। অনুষ্ঠানে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, সংলাপ পরিচালক আনিসাতুল ফাতেমা ইউসুফসহ গবেষকরা উপস্থিত ছিলেন।
আগামী বাজেটে যেসব বিষয়ে জোর দিতে হবে সেসব বিষয় উল্লেখ করে অনুষ্ঠানে ১০ দফা সুপারিশ করা হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে যে দুর্বলতা রয়েছে তা উন্নয়ন করতে হবে। সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে সুশৃঙ্খল হতে হবে। এক্ষেত্রে যাতে অপচয় না হয় সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। করছাড় শৃঙ্খলার ভেতরে আনতে হবে, যাতে বাজেটের ওপর কোনো প্রভাব না পড়ে। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন করতে হবে। স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠন করতে হবে। পুঁজিবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠাসহ সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাথাপিছু কমপক্ষে ৫ হাজার টাকা করে ভর্তুকি দিতে হবে। রাষ্ট্রীয় মালিকানার বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান লোকসান গুনছে সেসব প্রতিষ্ঠানে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্নদের দিয়ে অডিট করা। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। এ ছাড়া নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সুপারিশ করা হয়।
ক্ষতিগস্ত কৃষকের ভর্তুকির বিষয়ে সিপিডি বলছে, ধানের ন্যায্য দাম না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ৫ হাজার টাকা করে দিতে হবে। এতে সরকারের ব্যয় হবে ৯ হাজার ১০০ কোটি টাকা। ১ কোটি ৮০ লাখ কৃষকের ব্যাংক হিসাবে টাকাটা সহজে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগও রয়েছে বলে মনে করে সিপিডি।
অনুষ্ঠানে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, রপ্তানি খাত ৫ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দাবি করছে। এটা দিলে সরকারের বাড়তি ১৫ হাজার কোটি টাকার মতো ব্যয় হবে। ফলে রপ্তানি খাতে মোট ভর্তুকি দাঁড়াবে ২০ হাজার কোটি টাকার মতো। তিনি বলেন, ‘আমি কৃষককে ৯ হাজার কোটি টাকা দিতে কোনো সমস্যা দেখি না। এটা দিলে তা যুক্তিযুক্ত ও সাম্যবাদী আচরণ হবে।’
এর আগে সিপিডির অর্থনৈতিক পর্যালোচনা তুলে ধরেন সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান। এতে ধানের দাম আলাদাভাবে আলোচনা করা হয়। তৌফিকুল ইসলাম খান বিশ্লেষণ করে দেখান, বোরো মৌসুমে কৃষকের ধান উত্পাদন খরচ অনেক বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে। তিনি বলেন, হঠাত্ কৃষি খাতে মজুরিও বেড়ে গেছে। এটা সামাল দিতে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি উত্পাদনশীলতা বাড়িয়ে উত্পাদন ব্যয় কমিয়ে আনতে হবে।
রাজস্ব আহরণ বিষয়ে দেবপ্রিয় বলেন, ‘কর আহরণে অপারগতা এখন বাংলাদেশের উন্নয়নের একটা অমোচনীয় প্রতিবন্ধকতায় পরিণত হয়েছে। এটা যদি অতিক্রম না করা যায়, তাহলে আমাদের উন্নয়নের যে অভিলাষ রয়েছে তার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের সুযোগ কম হবে এবং অন্য উত্স থেকে যদি আমরা বিনিয়োগের চেষ্টা করি, তাহলে সামষ্টিক অর্থনীতির দুর্বল পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।’
এ সময় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন চিত্রের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এ বছর অর্ধেক এডিপি বাস্তবায়ন হচ্ছে মাত্র তিন মাসে। এটা যে কী এডিপি হবে সেটা আর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে না।
বৈদেশিক মুদ্রার মজুত পরিস্থিতিকে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ার আরেকটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রেমিট্যান্স-প্রবাহ ভালো, রপ্তানিও ভালো, তার পরও বৈদেশিক লেনদেনের ঘাটতি বাড়ছে। বর্তমানে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত মাত্র পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান, যা কয়েক মাস আগেও ছিল আট মাসের সমান।
টাকার অবমূল্যায়ন করার সুপারিশ করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকার (যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের করার কথা) এখন যেটা করছে— ডলার বিক্রি করে টাকাকে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে। টাকাকে স্থিতিশীল পর্যায়ে রাখার যৌক্তিকতা নেই। প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে চালু রাখতে হলে টাকাকে এখন নিচে নামিয়ে নিয়ে আনতে হবে। এটা সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংকিং খাতের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে যত কম বলা যায় ততই ভালো। তিন-চার বছর ধরে এ বিষয়ে বলতে বলতে এমন একটা অবস্থায় এসেছি, অবশেষে ব্যাংক খাতের সংকট সবাই উপলব্ধি করছে। কিন্তু প্রতিক্রিয়ার দিক থেকে আমরা তার প্রতিফলন দেখি না। বর্তমান সরকার আসার পর যে কয়টা পদক্ষেপ নিয়েছে, সবগুলো ব্যাংক খাতের জন্য আরো ক্ষতিকর হয়েছে। অন্যদিকে শেয়ারবাজারে বিভিন্ন সময় যেসব প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে তা কাজে আসছে না। আগামী বাজেটেও এ খাতে প্রণোদনা দেওয়া হবে।’ তবে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে কোনো প্রণোদনায় কাজে আসবে না বলে মনে করেন তিনি।
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া উচিত হবে না এমন অভিমত তুলে ধরে তিনি বলেন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হলে তা আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ব্যত্যয় ঘটবে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে— ঘুষ, অনুপার্জিত আয়, কালো টাকা, পেশি শক্তি মাধ্যমে উপার্জন করা, সেগুলোকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা হবে।
