বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

‘দেশের অর্থনীতি নিয়ে মিথ্যাচার-অপপ্রচার দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র’

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২২, ২৩:৫৮

বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ চলে আসছে, তা নিয়ে যে মিথ্যাচারের অভিযোগ নেই-এমন বলা যাবে না। শাসকদল এবং বিরোধীদল একে অপরের ওপর মিথ্যাচারের যে সব অভিযোগ আনছে তার সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের প্রয়োজন আছে। হঠাৎ করে শ্রীলংকা দেউলিয়া ঘোষণা হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করার জন্য দেশি এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে ।

পদ্মা সেতু নিয়ে অহেতুক মিথ্যাচার এবং ভূরাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুকে অপরাজনৈতিক   কূট-কৌশল  হিসাবে ব্যবহার করে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে থামিয়ে দেওয়ার একটি চক্র সবসময় ব্যতিব্যস্ত ছিল এবং এখনো আছে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে বিনষ্ট করা এবং বর্তমান স্থিতিশীলতাকে ধ্বংসের নানা-বিধ অপ্রচলিত ও অনাকাঙ্খিত ব্যবস্থা সরকারের সামনে নিয়ে এসে দেশ ও জাতিকে বিব্রত করাই হচ্ছে  বিরোধী দল বিএনপির একমাত্র উদ্দেশ্য। একসময় যুগের প্রয়োজনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাস্তবায়িত হলেও এবং উভয় দল এর সুবিধা ভোগ করলেও পরবর্তীতে আদালতের ডিক্রির মাধ্যমে এটি নাকচ হয়ে গেলে সরকারের পক্ষে তা পুনরায় বাস্তবায়ন সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল হওয়ায় একটি স্থিতিশীল সরকার কোনোভাবেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে সম্মত হতে  পারে না। আগামী নির্বাচনকে ঘিরে ক্ষমতা পরিবর্তনের যে রাজনীতি শুরু হয়েছে এ থেকে উত্তরণ এ জাতির জন্য এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। বিশেষ করে সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদলগুলোর বিশেষ করে বিএনপি মিথ্যাচার এবং অপপ্রচার এখন একটি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিকভাবে পদ্মা সেতু নিয়ে যেভাবে ষড়যন্ত্র এবং মিথ্যাচার হয়েছে, তার দেশি-বিদেশি দোসররা এখনো বাংলাদেশের মাটিতে সোচ্চার।  বিশেষ করে বাংলাদেশ শ্রীলংকা হয়ে যাবে এ ধরনের একটি প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বাংলাদেশে সক্রিয়  আছে, তারা  আগামী নির্বাচনে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করে নির্বাচনকে অসংবিধানিকভাবে বাস্তবায়ন করার  বিএনপির অশুভ পরিকল্পনা ও দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র পুরোপুরি বানচাল করতে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা মাঠে-ময়দানে আছে। এতে সংঘাত ও পাল্টা সংঘতের আশংকা রয়েছে।  শ্রীলংকা দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার পরে বাংলাদেশের রিজার্ভ নিয়ে রাজনীতিতে সরকারি এবং বিরোধী দলের বাকযুদ্ধ বেশ তুঙ্গে উঠে যায়, বিশেষ করে দেশে ৪০ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ  থাকার পরেও রাজনৈতিকভাবে আশংকা হওয়া বা করার অপচেষ্টা দুরভিসন্ধি ব্যতীত অন্য কিছুই নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে নয় মাসের প্রয়োজনীয় খাদ্য এবং সামগ্রী কেনার অর্থ বা রিজার্ভ বিদ্যমান আছে বলে দেশবাসীকে যেভাবে আশ্বস্ত করেছেন, এতে তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতা সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বাংলাদেশে একটি স্থিতিশীল বৈদেশিক বাণিজ্য এবং প্রবাসী রেমিটেন্স নিয়মিতভাবে সচল আছে। তবে ২০২১ সালে প্রবাসী আয় ছিল ২৪.৭৭ বিলিয়ন ডলার। 

চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত শতকরা পাঁচ ভাগ রেমিটেন্স বা প্রবাসী আয় কমলেও এটি চলমান অর্থনীতির জন্য খুব বেশি আশংকাজনক নয় বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। তাছাড়া জিডিপি রেমিটেন্স রেশিও ৬. ০৩ ভাগ, রেমিটেন্স এক্সপোর্ট আর্নিং রেশিও ৬৭.১৪ ভাগ এবং রেমিট্যান্স ইমপোর্ট পেমেন্টস ৪০.৪৩ ভাগ, যা ২০২১ সালের মোট প্রাক্কলিত হিসাব। সরকার প্রচলিত পদ্ধতিতে রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধির নানারকম সুবিধা প্রদান করায় অপ্রচলিত পদ্ধতি বা হুন্ডির মাধ্যমে ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশে প্রবেশ সীমিত হয়ে গেলে রেমিটেন্স প্রবাহ পূর্বাপেক্ষা ১০ থেকে ১৫ ভাগ বাড়বে বলে অনেকের প্রত্যাশা। শ্রীলংকার মতো অপ্রত্যাশিতভাবে রিজার্ভ রাজনীতি শুরু হয়ে গেলে সরকার প্রতিনিয়তই দলের মুখপাত্র এবং পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনের রিজার্ভের অবস্থা প্রচার করে আসছে, যাতে করে বাংলাদেশে যে একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক অবস্থা বিদ্যমান আছে এবং এদেশ যে শ্রীলংকা হওয়ার কোনো আশংকা নেই, তার একটি ধারাবাহিক প্রচারণা দেশি এবং বিদেশি সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করায় রিজার্ভ নিয়ে বিরোধী দলের যে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করার দূরভিসন্ধি বা অভিপ্রায় তার  সলিল সমাধি হয়ে গেছে। 

বিশেষ করে জ্বালানি তেলের বাজারে বিশ্বব্যাপী যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, এটার  প্রভাব বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে পড়া শুরু করলে, সরকার বিশেষ করে জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রজ্ঞা দিয়ে আগেভাগেই সরকারি প্রজ্ঞাপন এবং মিডিয়ার মাধ্যমে দেশবাসীকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দিলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ উৎপাদনে অভাবনীয় সাফল্যকে ম্লান করে দেওয়ার জন্য  বিরোধী দল  বিএনপি এবং তার মাসতুতো  ভ্রাতারা উঠে-পড়ে লাগে। গত এক যুগ ধরে বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং তার সরকার দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালনের একটি সৃষ্টিশীল পরিবেশ তৈরি করলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়, এবং বাংলাদেশ একটি সম্প্রসারণশীল অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়ে যায় এবং  বিশ্বের মধ্যে বিশেষ করে এশিয়ার একটি অনুকরণীয় দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের মূল্য বিশ্বব্যাপী ওঠানামার সাথে বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করতে যেয়ে নানা রকম ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। 

উল্লেখ্য, বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট যা সরকারের অদক্ষতার জন্য তৈরি সংকট নয় বরং জ্বালানি তেলের দাম উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বব্যাপী যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার থেকে সাময়িকভাবে পরিত্রাণ পাবার একটি উপায় হচ্ছে বিদ্যুৎ সাশ্রয় নীতি। সম্প্রতি বাংলাদেশের অভাবনীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলাফলকে পাকিস্তান তাদের দেশের রাজনৈতিক ব্যর্থতার সাথে তুলনা করে পাকিস্তানের মিডিয়া এবং বুদ্ধিজীবীরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বাংলাদেশের ২.৫ টাকার সমান ছিল পাকিস্তানের ১ রুপি। কালের পরিক্রমায়   বর্তমানে বাংলাদেশের ১ টাকা সমান পাকিস্তানের ২.৫ রুপি।    বর্তমানে পাকিস্তান কমবেশি ১০ বিলিয়ন রিজার্ভ নিয়ে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হওয়ার চাপে রয়েছে, তবে একটি দেশে স্থিতিশীল আমদানি এবং রপ্তানি বজায় থাকলে রিজার্ভের পরিমাণ যা-ই থাকুক না কেন,তা কখনোই আশংকাজনকভাবে অর্থনীতি এবং রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারেনা। একথা সকল বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। ফলে বাংলাদেশে ৪০ বিলিয়নের কমবেশি রিজার্ভ থাকার পরেও বাংলাদেশ কেন শ্রীলংকা হবে, তার কোনো সদুত্তর প্রধান বিরোধী দল তথা বিএনপি’র কাছে আছে বলে আমার মনে হয় না।

সম্প্রতি দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি  নিয়ে যে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক্স এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচলিত আছে তার অধিকাংশই মিথ্যাচারে ভরা, বিশেষ করে বাংলাদেশের একজন রিক্সাচালক প্রতিদিন গড়ে কম—বেশি এক হাজার টাকা আয় করে এবং তার মাসিক আয় গড়ে কমপক্ষে ২০ হাজার টাকা বা তার সমপরিমাণ। তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিকভাবেই দ্রব্য মূল্যের বৃদ্ধি পেয়েছে, তারপরও বাংলাদেশের নিম্নবিত্তে ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে দ্রব্যমূল্য থাকার জন্য জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রশংসার দাবি রাখেন, বিশেষ করে একজন রিক্সাচালকের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষেও ভাত-মাছ খাবার মতো বিশ হাজার টাকা বা তার সমপরিমাণ আয় উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক উন্নয়নের   একটি রোল মডেল ছাড়া আর কিছুই নয়। জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী সিদ্ধান্তে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সমর্থ হয়েছে।

সম্প্রতি বিরোধী দলগুলো দেশে যে খাদ্য ঘাটতির কথা বলছে, তা প্রাকৃতিক কারণে হয়েছে, বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে বন্যার কারণে বাংলাদেশ প্রায় ৫.৩ বিলিয়ন ডলার বা সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশের মজুদ ৪০ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ দিয়ে আগামী দিনে সামলানো সম্ভব হবে বলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে আশ্বস্ত করতে সমর্থ হয়েছেন, যার সাথে বিরোধী দলের এদেশকে অস্থিতিশীল করার প্রোপাগান্ডার কোনো বাস্তবতা নেই। তৃতীয় বিশ্বে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও কাদা ছোড়াছুড়ি   নতুন কিছু নয়, বিশেষ করে প্রচলিত পদ্ধতির মাধ্যমে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার পরেও জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে হেরে গেলে নিজেদের পরাজয়ের কারণ হিসেবে নানা রকম মিথ্যা তথ্য-উপাত্ত বা সাক্ষী তৈরি করে জনগণের সামনে তথাকথিত হলুদ মিডিয়ার সাহায্য নিয়ে যেসব প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যায়, তার সাথে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া প্রায় দুষ্কর। কখনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি,কখনো নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার দাবি, কখনো দেশি-বিদেশি পক্ষের মীমাংসার মাধ্যমে নির্বাচন করার দাবি, আবার কখনো সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করে বা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত সংবিধানকে অগ্রাহ্য করে নির্বাচনের মাঠে অস্থিতিশীলতা তৈরি করা  বিরোধী দল  বিএনপির একটি প্রচলিত স্বভাবে পরিণত হয়েছে, যার থেকে জাতিকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে হবে। 
 
সংবিধানের বাইরে গিয়ে বিরোধী দল বিএনপি'র দাবি তত্ত্বাবধায়ক  সরকার বা জাতীয় সরকার  যাই বলা অব্যাহত রাখুন না কেন - এসব অলিক  চিন্তাভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে সাংবিধানিক ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায়  আগামি নির্বাচন করে ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়ার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানানো ছাড়া দেশের জনগণের কাছে বিকল্প কোনো পথ খোলা আছে বলে আমার মনে হয় না।

লেখক: ফিকামলি তত্ত্বের জনক, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, ওয়াইল্ড লাইফ বিশেষজ্ঞ,    প্রেসিডেন্ট: ওয়ার্ল্ড ফুটবলার্স ফোরাম (WFFB), প্রধান পৃষ্ঠপোষক : বাংলাদেশ মনোবিজ্ঞান সমিতি,  সভাপতি: শহিদ সেলিম-দেলোয়ার স্মৃতি পরিষদ।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি