ঘিওরে পানির অভাবে পাট জাগ দিতে কৃষকদের ভোগান্তি

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২২, ১৬:১০

খালে-বিলে পানি না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পরেছেন মানিকগঞ্জ ঘিওরের পাট চাষিরা। বর্ষার ভরা মৌসুমেও পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়াসহ বর্ষার পানি খাল-বিলে-চকে না ওঠায় চরম বিপাকে পড়েছেন তারা। পরিপক্ব হবার পরও পানির অভাবে পাট কেটে জাগ দিতে না পেরে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ঘিওরের কৃষকরা। তাই বাধ্য হয়ে দূরবর্তী ক্ষুদ্র জলাশয়, ডোবা ও পুকুরে পাট জাগ দিতে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিক খরচের চেয়ে বেশি খরচ হওয়াসহ পাটের গুনগত মান কমে যাচ্ছে।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার ৭ ইউনিয়নে চলতি বছর পাটের আবাদ বৃদ্ধির পাশাপাশি ফলনও হয়েছে আশাতীত। ভাল ফলন স্বত্বেও কৃষকদের মুখে দু:চিন্তার ছাপ ফুটে উঠেছে। নদী ও মাছ চাষের পুকুর ছাড়া কোথাও পাট জাগে ফেলার মতো মিলছে না প্রয়োজনীয় পানি। কোনো উপায় না পেয়ে কৃষকরা পাট কেটে ক্ষেতেই ফেলে রাখছেন। পানি না থাকায় রোদে নষ্ট হচ্ছে এসব কাঁচা পাট। অনেকেই ট্রাকে করে নিয়ে একস্থান থেকে অন্যস্থানে পাট জাগ দিচ্ছেন। পাট ছোট ছোট জলাশয়ে কাদাযুক্ত হাঁটু পানির মধ্যে পাট জাগ দিচ্ছেন। এতে পানি পচে দুর্গন্ধ বের হওয়ার পাশাপাশি রোগ জীবাণু বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

এদিকে স্থানীয় কৃষি বিভাগের পর্যাপ্ত প্রচারের অভাবে বিকল্প পদ্ধতি 'রিবন রেটিং' সম্বন্ধেও ধারণা নেই প্রান্তিক কৃষকদের। তাই সনাতন পদ্ধতিতে পাট জাগ দিতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ভালোভাবে জাগ দিতে না পারায় পাটের গুণগত মান ভালো হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। 

স্থানীয়রা জানান, বর্ষা মৌসুমের এই সময় খাল-বিল-বিস্তীর্ণ চকে পানিতে থৈ থৈ করার কথা থাকলেও এবারের চিত্র ভিন্ন। গত সপ্তাহে মাঝারি বৃষ্টিপাত হওয়ায় উপজেলার প্রান্তিক কৃষকরা তাদের সোনালী আঁশ পাট কাঁটা শুরু করেছেন। এরই মধ্যে কোন কোন চাষি পাট জাগ দিতে শুরুও করেছেন। খালে বিলে বা ছোট জলাশয়ে সামান্য জমাট বাঁধা পানিতে পাট-জাগ দিচ্ছেন তারা। আবার অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে শ্যালো মেশিন ও মোটরের পানি দিয়ে পাট জাগ দিতে গিয়ে বাড়তি খরচ করছেন বলে জানান। এ অবস্থায় চাষ বৃদ্ধি ও ভালো ফলন হলেও লাভের জায়গায় লোকসান গুনতে হবে বলে জানান এ অঞ্চলের পাট চাষিরা।

ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরী ইউনিয়নের গোয়ালডাঙ্গী গ্রামের কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, প্রয়োজনীয় পানি না পেয়ে নিচু জায়গায় জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে পাট জাগ দিয়েছি। এতে পাটের আঁশ কালো রঙের ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে।

ঘিওর সদর ইউনিয়নের রাধাকান্তপুর গ্রামের কৃষক মোন্নাফ মোল্লা বলেন, প্রতি বিঘা জমিতে পাট চাষে ১৫ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। এবার অতিরিক্ত খরা ও অনাবৃষ্টির কারণে বিঘাপ্রতি সাত থেকে সাড়ে সাত মণ পাট উৎপাদন হয়েছে। বর্তমান পাটের মূল্য জাতভেদে মণ প্রতি তিন হাজার টাকার ওপরে। কিন্তু জমি থেকে এক কিলো মিটার দূরে ভ্যানে বহন করে নিয়ে পাট জাগ দিয়েছি। আবার ভ্যানে করে বাড়িতে এনেছি।  খরচ বেশি হয়েছে।

বালিয়াখোড়া ইউনিয়নের বাষ্টিয়া গ্রামের কৃষক রফিক মিয়া জানান, বর্ষার পানি না থাকার কারণে সড়কের খাদে জমা বৃষ্টির পানিতে পাট জাগে ফেলতে হচ্ছে। কম পানিতে জাগ দেওয়া পাটের আঁশ কালো ও চটা-চটা হয় বলে তা কম দামে বিক্রি করতে হয়। পাটের ফলন এবার ভালো হলেও প্রয়োজনীয় পানির অভাবে পাট জাগ দিয়ে আঁশ ছাড়ানো খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। 

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর উপজেলায় ৩০৭ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। যা গত বছরের চেয়ে ১৩ হেক্টর বেশি। সাধারণত আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাসের মধ্যে পাট কেটে জাগ দেওয়া হয়। এরই মধ্যে আবাদকৃত অর্ধেক পাট কাটা হয়েছে। বাজারে বিক্রি হচ্ছে মানভেদে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা মণ দরে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শেখ বিপুল হোসেন বলেন, গতবছর ভালো দাম পাওয়ায় চলতি বছর কৃষকরা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে পাটের আবাদ করেছেন। ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু এবার বর্ষায় পানি আসেনি জনপদে, তেমন বৃষ্টিপাতও হয়নি। তাই কৃষকদের পাট জাগ দিতে কষ্ট পোহাতে হচ্ছে। কারণ এই এলাকায় বেশির ভাগ কৃষক পানিতে ডুবিয়ে সনাতন পদ্ধতিতে পাট জাগ দেন। পানি না থাকলেও রিবন রেটিং পদ্ধতিতে পাটের আঁশ ছাড়ানো যায়। পাট কাটার পর আঁশ ছাড়িয়ে অল্প পানিতে বেশি জাগ দেওয়া যায়। এ পদ্ধতিতে জাগ দেওয়া আঁশের গুণগত মান অনেক ভালো থাকায় বাজারে এর দামও বেশি পাওয়া যায়। পানির অভাবে কৃষকদের রিবন রেটিং পদ্ধতিতে পাট জাগ দেওয়ার জন্য প্রান্তিক কৃষক পর্যায়ে প্রচার প্রচারণা করা হচ্ছে।
    

 

ইত্তেফাক/এআই