শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নার্সিং পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস

কলেজের শিক্ষক, স্টাফ ও নার্সরা প্রশ্ন বিক্রি করতেন

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২২, ০৬:০৪

কয়েক বছর থেকে নার্সিং কলেজের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে আসছিল। এসব ঘটনায় মূল হোতাসহ কেউ শনাক্ত হয়নি। কিন্তু সম্প্রতি একটি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা তদন্তে নেমে চোখ ছানাবড়া হয়ে গেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। খোদ নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ, শিক্ষক, প্রশিক্ষক, প্রশ্নপত্র প্রণয়নকারী কমিটির সদস্য ছাড়াও প্রতিষ্ঠানের স্টাফ নার্সরা লাখ লাখ টাকায় প্রশ্নপত্র পরীক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি করেন। এ কাজে সরাসরি জড়িত মহাখালীর একটি নার্সিং কলেজের কমপ্রিহেনসিভ নার্সিং ও প্যাথোলজি বিষয়ের প্রশিক্ষক ফরিদা খাতুন। তার সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন নার্গিস ও মনোয়ারা বেগম। এই দুজন ছাড়াও ইসমাইল, কোহিনুর ও আরিফুল এই প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী চক্রের সদস্য ছিলেন। তাদের গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। 

সোমবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‍্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। এর আগে রবিবার রাতে মহাখালী, ধানমন্ডি, আজিমপুরে অভিযান চালিয়ে এই চক্রের হোতা ফরিদা খাতুন (৫১), মনোয়ারা খাতুন (৫২), নার্গিস পারভীন (৪২), কোহিনুর বেগম (৬৫), ইসমাইল হোসেন (৩৮), আরিফুল ইসলামকে (৩৭) গ্রেফতার করা হয়। এসময় তাদের কাছ থেকে ফাঁসকৃত প্রশ্নপত্রের কপি এবং ৯টি মোবাইল উদ্ধার করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

তিনি জানান, গত ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত নার্সিং কলেজের ১ম বর্ষ ফাইনাল বিএসসি ইন নার্সিং (পোস্ট বেসিক) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই তা পরীক্ষাদের মধ্যে সরবরাহের প্রমাণ পাওয়া যায়। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদল ২০ আগস্ট পরীক্ষা শুরুর পূর্বে একটি নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থীদের মোবাইলে প্রশ্নপত্রের ছবি ও সাদা কাগজে হাতে লেখা প্রশ্নপত্রের ছবি উদ্ধার করে। তারই ধারাবাহিকতায় এই ছয় জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তিনি জানান, এই চক্রের মূলহোতা গ্রেফতারকৃত ফরিদা খাতুন। তিনি রাজধানী মহাখালীর একটি নার্সিং কলেজের কমপ্রিহেনসিভ নার্সিং অ্যান্ড প্যাথলজি বিষয়ের প্রশিক্ষক। প্রায় ১০ বছর যাবৎ এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রিন্টিং ও প্যাকিংয়ের দায়িত্বে থাকেন। এছাড়া গ্রেফতারকৃত ফরিদা খাতুন গত ২০ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য বিএসসি ইন নার্সিং (পোস্ট বেসিক) প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় চিকিত্সা অনুষদের ডিন কর্তৃক নির্বাচিত চার সদস্যের গোপনীয় টিমের একজন সদস্য ছিলেন।

  • যেভাবে প্রশ্ন ফাঁস করা হতো

নার্গিস ও মনোয়ারা বেগম গত ১৩ আগস্ট ফরিদা খাতুনের কাছ থেকে কমপ্রিহেনসিভ নার্সি অ্যান্ড প্যাথলজি বিষয়ের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করেন। পরে তাদের এই চক্রের সদস্য ইসমাইল প্রশ্নপত্রটি কোহিনূর বেগমের কাছে দেন। এসময় ইসমাইল প্রশ্নপত্রটি ফটোকপি করে রাখেন। তিনি ফটোকপি করে অর্থের বিনিময়ে তার ঘনিষ্ঠজনদের কাছে বিক্রি করেন। এছাড়া কোহিনূর বেগম ও আরিফ প্রশ্নপত্রটি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিক্রি করেন। প্রশ্নপত্রটি হোয়াটসঅ্যাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পৌঁছে দিতেন।

  • এই চক্রের অন্য সদস্যদের পরিচয় 

গ্রেফতারকৃত নার্গিস ও মনোয়ারা বেগম তার অন্যতম সহযোগী। তারা পরস্পর যোগসাজশে বেশ কিছুদিন ধরে শিক্ষকতার আড়ালে উক্ত প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে আসছেন। ফরিদা, মনোয়ারা, নার্গিস ১০ বছর ধরে একটি নার্সিং কলেজের প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত। তারা ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত নার্সিং কলেজসমূহের বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন কমিটি, মডারেটর ও ডিন কর্তৃক নির্বাচিত প্রশ্নপত্র প্রিন্টিং এবং প্যাকিংয়ে নিযুক্ত গোপন টিমের সদস্য ছিলেন। কোহিনুর ২০০৮ সাল হতে ঢাকার একটি সরকারি নার্সিং কলেজে নার্সিং প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরে ২০১৬ সালে অবসরে যাওয়ার পর একটি বেসরকারি নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন।

গ্রেফতারকৃত ইসমাইল হোসেন রাজধানীর একটি নার্সিং কলেজের সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত। গ্রেফতারকৃত আরিফ ঢাকার একটি নার্সিং কলেজের পোস্ট বেসিক বিএসসি ইন নার্সিং-এর প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। এই দুই জনই প্রশ্নপত্রটি ফাঁস চক্রের অন্যতম সদস্য কোহিনুর বেগমের কাছ থেকে সংগ্রহ করেন। পরে বিভিন্ন শিক্ষার্থীদের কাছে অর্থের বিনিময়ে সরবরাহ করেন। তবে আরিফ ২০১৭ সালের সিনিয়র স্টাফ নার্স নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করার অপরাধে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে বেশ কিছুদিন কারাবন্দি ছিলেন। পরে জামিনে বের হয়ে আবারও একই কাজ শুরু করেন।

ইত্তেফাক/ইআ