শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আলামিন হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার ৫

কড়াইল বস্তির ৮ কোটি টাকার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ নিতেই খুন

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২২, ০৪:০৪

রাজধানীর কড়াইল বস্তির ৪০ হাজার ঘরে মাসে চাঁদাবাজি হয় ৮ কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে বস্তির চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ এবং একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের কড়াইল ইউনিটে নতুন কমিটিকে কোণঠাসা করে রাখার চেষ্টার কারণে গত বুধবার রাতে বস্তিতে দুই পক্ষের সংঘর্ষে আলামিনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে হামলায় নারীসহ ছয় জন আহত হন। আর মসজিদের ভেতরে কোপানো হয় আলামিনের ভাই নাসিরকে। বৃহস্পতিবার এ ঘটনায় বনানী থানায় ২২ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন আলামিনের মেজো ভাই জুয়েল সরকার। মামলায় পুলিশ পাঁচ জনকে গ্রেফতার করেছে।

কড়াইল বস্তির লোকজন জানায়, স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর দীর্ঘদিন ধরে বস্তির নিয়ন্ত্রক। নতুন কমিটি আসায় তারাও বস্তির নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া ছিলেন। ওয়ার্ড কাউন্সিলর কৌশলে তার কর্মীদের মাঠে নামিয়ে নতুন কমিটিকে কোণঠাসা করে রাখার কারণে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। নিহত আলামিনের স্ত্রী রিতা আকাতার বলেন, দলাদলির কারণে তার স্বামী হত্যার শিকার হয়েছেন। প্রতিপক্ষরা এখন মামলা তুলে নিতে হুমকি দিচ্ছে।

মামলার বাদী জুয়েল সরকার বলেন, ‘আমার চাচাতো ভাই জসীম উদ্দীন রিপন কড়াইল থানা আওয়ামী লীগের ১ নম্বর ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী ছিলেন। তাকে বাদ দিয়ে গত ২২ জুলাই কমিটি ঘোষণা করা হয়। এ নিয়ে মোহাম্মদ আলী, নুরুসহ ঐ গ্রুপের সঙ্গে বিরোধ চলে আসছিল। ১৫ আগস্ট শোক দিবসের অনুষ্ঠানেও আমার ভাইদের ওপর হামলা করা হয়। ’

এলাকাবাসী জানান, ইউনিট আওয়ামী লীগের কমিটি দেওয়াকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনা ঘটলেও এর পেছনে রয়েছে এলাকার নিয়ন্ত্রণ। আলামিন ও তার ভাই নাসির ১৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মফিজুর রহমানের অনুসারী। আর হামলাকারীরা আজাদ নামের আরেক জনের অনুসারী। দীর্ঘদিন ধরে কাউন্সিলর বস্তির চাঁদাবাজি নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। বস্তি থেকে প্রতি মাসে প্রায় কোটি টাকা উঠে সবই কাউন্সিলরের লোকজন উঠায়।

রাজধানীর অন্যতম অপরাধের আখড়া হিসেবে পরিচিত কড়াইল বস্তিতে প্রতি ঘরে এক মাসে প্রতিটি লাইটের জন্য ১০০ টাকা, ফ্যানের জন্য ১০০ টাকা, টেলিভিশনের জন্য ২০০ টাকা, ফ্রিজের জন্য ৩০০ টাকা দিতে হয়। গ্যাসের প্রতিটি চুলার জন্য ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা দিতে হয়। আর পানির লাইন ব্যবহার করতে প্রতিটি পরিবারকে ৫০০ টাকা গুনতে হয়। পানির জন্য একটি পরিবারকে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা গুনতে হয়। এ হিসাবে কড়াইল বস্তির ৪০ হাজার পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ২ কোটি টাকা আদায় করে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সদস্যরা। আর ঘরভাড়া বাবদ প্রতিটি ঘর থেকে দেড় হাজার টাকা করে আদায় করা হয়। এ খাত থেকে বস্তিতে ঘর স্থাপনকারি মালিক এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের আয় প্রায় ৬ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে কড়াইল বস্তিতে মাসে চাঁদাবাজি হয় ৮ কোটি টাকা। চাঁদাবাজির ভাগের টাকা বিভিন্ন গ্রুপের হাতে চলে যায়।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মফিজুর রহমান বলেন, এ হামলার পেছনে রাজনৈতিক কোনো না কোনো নেতার ইন্ধন রয়েছে। না হলে এত বড় ঘটনা ঘটত না। কোন নেতার ইন্ধনে ঘটেছে, তা আমি জানি। যেহেতু আমি রাজনীতি করি, তাই তার নামটা বলতে পারছি না। বনানী থানার ওসি নূরে আজম মিয়া বলেন, আলামিন হত্যার ঘটনায় পাঁচ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা রিমান্ডে রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে কিছু তথ্যও মিলেছে। বাকিদের গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ইত্তেফাক/ইআ