মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান শ্রমিক আন্দোলনে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার চা-পাতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। চা-পাতা তোলার মোক্ষম সময় এখন। কিন্তু দীর্ঘদিন পাতা না তোলার কারণে চা-গাছের কুঁড়ি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে ১৮-২০ ইঞ্চি লম্বা হয়ে গেছে কুঁড়িগুলো। যা কেটে ফেলতে হবে। সংশ্লিষ্টরা বলেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে বাগানে চায়ের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যাবে। বাগানগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে। চলতি বছর ১০০ মিলিয়ন কেজি চা-উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিটিআরআই’র একজন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, সাধারণত: গাছে কুঁড়ি বের হওয়ার ৮-১০ দিনের মধ্যে তা তুলে আনতে হয়। নতুবা স্বাভাবিক ভাবে কুঁড়ি নষ্ট হয়ে যায়। চা-একটি সংবেদনশীল কৃষি পণ্য। এটি উৎপাদনে যেমনি সুষম আবহাওয়া প্রয়োজন, তেমনি সময় মত চা-পাতা প্লাকিং এর বিষয়টিও অতি গুরুত্বপূর্ণ। এবার দেশের চা-শিল্প পড়েছে নানা সংকটে। ফলে চা বাগান মালিকসহ সংশ্লিষ্টরা উদ্বিগ্ন।
এ বছর এমনিতেই ভয়াবহ বন্যা, পরবর্তীতে লোডশেডিংয়ের কারণে দেশে চা-উৎপাদনে মারাত্মক সংকট সৃষ্টি হয়। তবে গত মাস থেকে আবহাওয়া অনুকূলে আসায় চা-উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রায় হবার আশার আলো দেখা গিয়েছিল। শ্রমিকদের লাগাতার কর্মবিরতিতে পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠেছে। গত বছর দেশে ৯৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন কেজি চা-উৎপাদন হয়। এ পর্যন্ত ৫০ মিলিয়ন কেজি চা-উৎপাদন হয়েছে কিনা সন্দেহ।
নর্থ সিলেট ভ্যালির ২২ টি বাগান পরিস্থিতির কথা জানিয়ে বাংলাদেশ টি এসোসিয়েশনের নর্থ সিলেট ভ্যালির চেয়ারম্যান নোমান হায়দার চৌধূরী ইত্তেফাককে বলেন, চায়ের কুঁড়ি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কর্মবিরতি থাকায় দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ ৮ কোটি টাকা। এই কয়দিনে অন্তত: ৮ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে দেশের চা-শিল্পে।’ চলমান সংকটের কারণে এ বছর ভরা মৌসুমে দেশের চা শিল্পে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে এই মন্তব্য করে নোমান হায়দার চৌধূরী বলেন, এবার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে বলে মনে হয় না।
টানা ১১ দিন শÌমিক ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রামের ২১ টি বাগানে পাতা না ছেঁড়ায় তা আগাছার মত লম্বা হয়ে গেছে। বড় ও শক্ত হয়ে গেছে চা গাছের পাতা। পরিপক্ক হয়ে গেছে মূল কুঁড়ি। বাগান কর্তৃপক্ষ জানায়, ২১টি বাগানে দৈনিক প্রায় ৪ লক্ষ কেজি সবুজ চা পাতা সংগÌহ হয়নি। ফলে এ পাতা গাছেই নষ্ট হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ৪ কেজি ৫০০ গ্রাম সবুজ চা পাতায় এক কেজি মেইড টি বা চা তৈরি হয়। এ হিসেবে ৪ লক্ষ কেজি সবুজ চা পাতায় ৯০ হাজার কেজি মেইড টি তৈরি হয়। নিলাম বাজারের দর অনুযায়ি এক কেজি চায়ের দাম ২২০ টাকা । এ হিসেবে চট্টগ্রামের ২১ টি বাগানেই দৈনিক ১৯ কোটি ৮ লক্ষ টাকার নষ্ট হয়। ধর্মঘটকালীন প্রায় ২২৮ কোটি ৯৬ লক্ষ টাকার চা নষ্ট হয়।
ফটিকছড়ির নেপচুন চা বাগানের জি এম কজী ইরফান উল্লাহ বলেন, এবছর চট্টগ্রামে চায়ের সুপার বাম্পার উৎপাদন হয়েছিল। কিন্তু ধর্মঘটের কারণে সব শেষ। বাগানগুলোর অপূরণীয় ক্ষতি হলো। তিনি বলেন, গাছের পাতাগুলো অনেক বেড়ে গেছে। এগুলো আর হাতে তোলা যাবে না। এছাড়া এ পাতা দিয়ে ভালো চা হবে না। মানসম্পন্ন চা উৎপাদন করতে হলে এখন গাছের ওপরের পাতা ছেঁটে অপেক্ষা করতে হবে। নতুন কুঁড়ি এলে সেগুলো হবে চা তৈরির কাঁচামাল। তবে ততদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে গেলে মৌসুম শেষ হয়ে যাবে। তাই এ বছর চা-শিল্পে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেল।’
রামগড় চা-বাগানের সিনিয়র ব্যবস্থাপক মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি যেটি হয়েছে, সেটি হলো আমরা আমাদের পুরো প্লাকিং রাউন্ড থেকে পিছিয়ে গেছি। বিপুল পরিমাণ পাতা গাছেই নষ্ট হয়ে গেছে। পরিচর্যা বন্ধ থাকায় ক্ষতিকর পোকামাকড়ও আক্রমণ করেছে বাগানে। বাংলাদেশি চা সংসদের চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাবেক চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে সারাদেশে একযোগে এত দীর্ঘদিন শÌমিক ধর্মঘটের নজির নাই। তিনি বলেন, এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চা মৌসুম গণণা করা হয়। তন্মধ্যে আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর এ তিন মাস ভরা মৌসুম। আগস্টের ক্ষতি পুষিয়ে উঠতেই চা মৌসুম থাকবে না। চট্টগ্রাম চা শÌমিক ইউনিয়নের চট্টগ্রাম ভ্যালির সভাপতি নিরঞ্জন নাথ মন্টু বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে টানা এতেদিন শ্রমিক ধর্মঘট হয়নি। এতে চা শিল্পের বড় ধরণের ক্ষতি হওয়ার কথা স্বীকার করেন তিনি।
হবিগঞ্জের মাধবপুর সংবাদদাতা শংকর পাল সুমন জানান, গত ১১ দিনে চা পাতা সংগ্রহ না করায় মাধবপুরের সুরমা, তেলিয়াপাড়া, জগদীশপুর, নোয়াপাড়া ও বৈকুন্ঠপুর ৫টি চা বাগানে প্রায় ৮ কোটি টাকার কাঁচা চা পাতা নষ্ট হয়েছে।

