১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাস, পাকিস্তানের প্রদেশ খাইবার পাখতুনখাওয়া থেকে বহিরাগত পশতুন উপজাতিরা অতর্কিত হামলা চালায় কাশ্মিরে। এতে হাজার হাজার মানুষ গণহত্যার শিকার হয়। ক্রমশ পুরো উপত্যকা জুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এই বহিরাগত উপজাতি গোষ্ঠীগুলোর গণহত্যার শিকার হয় বারামুল্লার প্রায় ১১ হাজার মানুষ। কাশ্মির উপত্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর এই বারামুল্লা। জম্মু ও কাশ্মিরের তখনকার রাজা ছিলেন হরি সিং। তিনি ভারতীয় সরকারকে বহিরাগতদের হাত থেকে কাশ্মিরকে রক্ষা করার জন্য অনুরোধ জানান।
১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর রাজা হরি সিং একীভূতকরণ দলিলে স্বাক্ষর করেন। ভারতীয় স্বাধীনতা অধিনিয়ম ১৯৪৭ এর অনুবিধির অধীনে এই দলিল স্বাক্ষরের বিনিময়ে হরি সিং ভারতের অধিরাজ্যে তার রাজ্যের অন্তর্ভুক্তিতে সম্মত হন। এরই প্রেক্ষিতে ২৭ অক্টোবর থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের কার্যক্রম শুরু করেন এবং মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে বহিরাগত আক্রমণকারীদের বিতাড়িত করতে সক্ষম হোন। তখন থেকেই জম্মু ও কাশ্মির ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠে এবং ভারতীয় সরকার জম্মু ও কাশ্মিরের নাগরিকদের বহিরাগত শক্তি থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন।
কিন্তু পাকিস্তান বারবার চেষ্টা করেছে জম্মু ও কাশ্মিরের ভূখণ্ড দখলের এবং পাকিস্তানের এ কার্যক্রম কাশ্মিরে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ভারতের চেষ্টাকে বারবার বাঁধা প্রদান করছে। পাকিস্তানের বারবার যুদ্ধবিরতি আইন লঙ্ঘন এবং সন্ত্রাসী অর্থায়নের মতো কার্যকলাপের জন্য এটি এখনো এফএটিএফ (আর্থিক পদক্ষেপকারী কর্মী বাহিনী) এর ধূসর তালিকায় রয়েছে।
৫ আগস্ট, ২০১৯ সালে, ভারত সরকার সংবিধানের সুদূরপ্রসারী ব্যবস্থার মাধ্যমে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের অধীনে জম্মু ও কাশ্মির রাজ্যকে প্রদত্ত বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে দেয়। ৩৭০ ধারা বাতিলের পর কাশ্মির ইস্যুতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দ্বন্দ্ব নতুন গতি পায়। এমনকি এ ঘটনার তিন বছর পরেও পাকিস্তান এ ইস্যুতে প্রতারণামূলক মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ডিএফআরএসি এর বিশেষ রিপোর্টে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, কিভাবে ৩৭০ ধারা বাতিলের ইস্যুকে কেন্দ্র করে ভারতের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বিদ্বেষমূলক তথ্য ছড়িয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। সেই ধারাবাহিকতায় গত ৫ আগস্ট সারা বিশ্বে পাকিস্তান দূতাবাসগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ইয়ুম-ই-ইস্তেহসাল (শোষণ দিবস) পালনের বিষয়টি টুইট করেছে।
এছাড়া পাকিস্তান সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা ভারতকে লক্ষ্য করে পোস্ট দেওয়ার পাশাপাশি ভুল তথ্য দিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে। এ লক্ষ্যে তারা মিথ্যে কিছু দাবি তুলে ধরেছে।
দাবি-১: ভারত ৬০ লাখ হিন্দুকে কাশ্মিরের বাসিন্দা বানিয়েছে।
মুশাল মল্লিকের একটি পোস্টে বলা হয়েছে, ভারত সরকার ৬০ লাখ ভারতীয় জনগণকে বাসস্থান দিয়েছে। দৈনিক নয়া-ই-ওয়াক্ত ও এই একই দাবি করেছে। তারা টুইট করেছে, "কাশ্মিরিদের বাস্তুহারা করে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে এবং ৬০ লাখ কাশ্মিরি হিন্দুকে বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে।"
কিন্তু বাস্তবে, ভারতশাসিত জম্মু ও কাশ্মির নতুন গতিতে অগ্রসর হচ্ছে। যেসব মানুষ বাসস্থানের সুযোগ পেয়েছে তাদের মধ্যে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মিরের এবং ছাম্বের বাস্তচ্যুত ব্যক্তিদের ৪১,৮৮৪ পরিবার রয়েছে, পশ্চিম পাকিস্তানি উদ্বাস্তুদের ৫,৭৬৪ পরিবার, সীমান্ত এলাকার ৩,৫০,০০০ পরিবার এবং কাশ্মিরি অভিবাসীদের ৪৪ হাজার পরিবার রয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছরের উপরে জম্মু ও কাশ্মিরে বসবাসরত যেকোন ব্যক্তি আবাসিক সার্টিফিকেট অনলাইনে আবেদন করতে পারবে। ভারতীয় সরকার ঐ স্থানে বসবাসরত ব্যক্তিদের ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষেই বাসস্থানের সুবিধা দিচ্ছে। তাছাড়াও আবাসিক সুবিধা দেয়ার অর্থ হলো বাসস্থান দেয়া, কাশ্মিরিদের রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দেয়া নয়।
দাবি-২: জম্মু ও কাশ্মিরে মুসলমানদের সংখ্যালঘুতে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে ২০১৯ সালের ৫ আগস্টের পদক্ষেপটি নিয়েছিল মোদি সরকার।
একজন ব্যবহারকারী টুইট করেন, ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট এ অন্যায় পদক্ষেপের মাধ্যমে পুরো বিশ্বের সামনে ভারত একটি অত্যাচারী ও আগ্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ৫ আগস্ট ইতিহাসে একটি কালো দিন কারণ এই দিনে ভারত অধ্যুষিত জম্মু ও কাশ্মিরের মুসলমানদের সংখ্যালঘুতে রূপান্তরিত করার জন্য মোদি সরকার এ পদক্ষেপ নেয়।
কিন্তু বাস্তবে কাশ্মিরে জনসংখ্যার কোনো পরিবর্তন নেই। তিন বছর পরেও কাশ্মির উপত্যকা এখনো একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য। আসলে, ৯০ সদস্যবিশিষ্ট বিধানসভার মধ্যে কাশ্মিরে ৪৭ টি এবং জম্মুতে ৪৩ টি আসন রয়েছে। ২০১৪ সালের হিসাবমতে, কাশ্মির একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা যেখানে ৯৭.১৬% মুসলমান রয়েছে। কাশ্মিরের প্রতিনিধিত্ব বেশি মানে এ অঞ্চলে মুসলিম প্রতিনিধিত্বও বেশি।
এ অবস্থায় সরকার কাশ্মিরের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলকে সংখ্যালঘুতে পরিণত করতে চাইছে এ দাবি সঠিক নয়।
দাবি-৩: ২০১৯ সালের ৫ আগস্টের পর জম্মু ও কাশ্মির অঞ্চলে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেড়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের অনেকের দাবি, ৩৭০ ধারা বাতিলের কারণে জম্মু ও কাশ্মিরে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেড়েছে। একজন টুইটার ব্যবহারকারী ৫ আগস্ট ইয়ুম-ই-ইস্তেহাল ট্যাগের সাথে একটি ছবি শেয়ার করে বলেন, ২০১১,২০১২,২০১৩,২০১৪,২০১৫ এবং ২০১৯ এর তুলনায় হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৫ আগস্ট,২০১৯ এর পর।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, কাশ্মির জোন পুলিশের তথ্যানুযায়ী, ৩৭০ ধারা বাতিলের পর কাশ্মিরে আইন শৃঙ্খলার ঘটনায় কোনো সামরিক সৈন্য এবং পুলিশ/এস এফ কেউই নিহত হন নি। তাছাড়াও অফিসিয়াল তথ্য মোতাবেক, আইন শৃঙ্খলার এবং সন্ত্রাসবাদের ঘটনায় মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা ৫ আগস্ট, ২০১৯ এরপর কমেছে।
দাবি-৪: কাশ্মিরে ভারতীয় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়নি।
অনেক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের দাবি, কাশ্মিরের কোথাও ভারতীয় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়নি। একজন ব্যবহারকারী লিখেন যে, ৩৭০ ধারা বাতিলের তিন বছর পরেও ভারতের কাছে কাশ্মিরের অবস্থান একই আছে যা নব্বইয়ের দশকে ছিল। কাশ্মিরের কোন চূড়া, কোন বিল্ডিং কিংবা কোত্থাও ভারতীয় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়নি।
কিন্তু বাস্তবে, ৩৭০ ধারা বাতিলের পর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে/ঘটনায় কাশ্মিরে ভারতীয় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।
গত বছরই পুলওয়ামায় বুরহান ওয়ানির বাবা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। এই বছর কাশ্মিরের বারামুল্লায় ১০৮ ফুট উচ্চতার জাতীয় পতাকা বসানো হয়েছে।
ডিএফআরএসি কাশ্মির ইস্যুতে পাকিস্তানের অপপ্রচার তুলে ধরেছে। অনেক বিদ্বেষ ছড়ানোর পোস্টে কাশ্মির যুব ফোরামের স্বাধীনতার ইচ্ছার লোগোটি যথেচ্ছাভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এ প্ল্যাটফর্ম মূলত নিয়ন্ত্রণ করে পাকিস্তান। ৫ আগস্টকে ইয়ুম-ই-ইস্তেহাল (শোষণের দিবস) হিসেবে ঘোষণা করে পাকিস্তান ভারতবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে।
এই উদ্দেশ্য পূরণ করতে পাকিস্তান সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছে। পাকিস্তানি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর বিদ্বেষমূলক এবং মিথ্যাতথ্যপূর্ণ পোস্ট করা হয়েছে। ভারত সরকার কাশ্মিরি মুসলমানদের প্রতি অন্যায় করছে মূলত এ মিথ্যাকে সত্যরূপে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে পাকিস্তান। যেখানে এ অঞ্চলের ৩০% এরও বেশি অমুসলিমদের জন্য পাকিস্তানের কোনো মাথাব্যথা নেই।
