সিংগাইরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের নামে নদীর বালু বিক্রি

‘সরকারি দল করি, ব্যবসাটা করতে দিন’

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২২, ০৫:০২

উপজেলার দক্ষিণ চারিগ্রাম ও উত্তর জামশাতে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে উদ্ধারকৃত জমিতে গৃহহীনদের জন্য হচ্ছে আরো দুইটি আশ্রয়ণ প্রকল্প। সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিপন দেবনাথ গত সপ্তাহে এ অভিযানের নেতৃত্ব দেন। এর পর দিন থেকেই শুরু করা হয় কালীগঙ্গা নদীতে ড্রেজারের মাধ্যমে জায়গা ভরাটের কাজ। কিন্তু দেখা গেছে, সরকারি কাজের এ সুযোগ নিয়ে নদীতে ড্রেজার বসিয়ে জাহাজে বালু তুলে নদীপথে পাচার করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত আশ্রয়ণ প্রকল্পে সামান্য কিছু ফেললেও চলছে বালু বিক্রির মহোত্সব। বিক্রির উদ্দেশ্যে বালু স্তূপ করার দৃশ্যও দেখা গেছে বিভিন্ন স্থানে। 

চারিগ্রাম সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সাজেদুল আলম বলেন, আশ্রয়ণের দোহাই দিয়ে বিভিন্ন স্থানে নদীর বালু বিক্রি হচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করতেও সাহস পায় না। ফসলি জমি, বাজার, বাড়িঘর ও পাকা রাস্তা আগেই ভেঙে গেছে। এখন নতুন করে ভাঙনের আশঙ্কা রয়েছে। গত বছর ভাঙন ঠেকাতে সরকারিভাবে বরাটিয়া বাজারের কাছে প্রায় ৫০ লাখ টাকার জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছিল। সেখান থেকেই এবার বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।

একই কথা বললেন অ্যাডভোকেট রাকিবুল ইসলামসহ নদীর পাড়ের বাসিন্দারা। খোরসেদ আলম, পাপুল ও ইস্রাফিল জানান, ‘ইউপি চেয়ারম্যানসহ আমরাই এখানকার বালু দিচ্ছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন এখান থেকেই বালু উত্তোলন করতে। অন্যত্র বিক্রি করা হচ্ছে না। আপনারা আমাদের দেখবেন, আমরাও আপনাদের দেখব।’ আবার পরক্ষণেই তারা বলেন, ‘সরকারি দল করি, ব্যবসাটা করতে দিন।’ একই দৃশ্য উত্তর জামশার আশ্রয়ণ প্রকল্পে। সেখানে সামান্য কিছু বালু ফেলা হয়েছে। গ্রামবাসী জানান, বিভিন্ন স্থানে বালু বিক্রি করা হচ্ছে। 

জামশা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সিদ্দিক মোল্যা ও থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি মহিদুর রহমান বলেন, ‘সরকার নদী শাসনের জন্য কাজ করছে। কালীগঙ্গা নদীভাঙন ঠেকাতে দুই পাশেই স্থায়ীভাবে বাঁধ দেওয়ার লক্ষ্যে ৬০০ কোটি টাকা একনেক অনুমোদন দিয়েছে। ডিসেম্বর কিংবা জানুয়ারির শুরুতেই কাজ শুরু হবে। এছাড়া ভাঙন ঠেকাতে গত বছর কালীগঙ্গার পাড়ে অস্থায়ীভাবে মাটিকাটা বাজারে ৩৮ লাখ, বালুরচরে ৬০ লাখ এবং বরাটিয়া বাজারে ৬০ লাখ টাকার জিও ব্যাগ ফেলা হয়। এখন নতুন আওয়ামী লীগরা আশ্রয়ণ প্রকল্পের দোহাই দিয়ে ব্যবসা করছে। নদীর পাড়ের মানুষ অসহায় হয়ে আমাদের কাছে আসছে। বালু উত্তোলন করে ব্রিজের দুই পাশে স্তূপ করে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছে। ’ ছাত্রলীগ নেতা আফজাল শেখ বলেন, এসব কাজে বাধা দিলে তারা হুমকি দিয়ে বলেন, এখানে বড় বড় নেতা এবং প্রশাসনের লোক জড়িত রয়েছে। এখানকার ভূমি নায়েব আলী আজমের মদতেই এসব হচ্ছে।

বালু ব্যবসায়ী আরিফ মেম্বার বলেন,‘ ইউএনওর নির্দেশ মেনেই সঠিকভাবে মাটি ফেলা হচ্ছে। তিনি একটু এদিক সেদিক করতে বলেছেন খরচ ওঠানোর জন্য। তবে ঐভাবে বাইরে বিক্রির কথা বলেননি।’ একই কথা বললেন, গাজী রাকিবুল হাসান। তারা বলেন, ‘বালুর যে স্তূপ দেখছেন তা এখানকার বালু নয়। মাওয়া ঘাট থেকে কিনে এখানে রেখেছি ব্যবসার জন্য। ’ তবে এ ব্যাপারে প্রতিবেদন তৈরি না করার জন্য অনুরোধ জানান তারা ।

নদীর বালু এদিক সেদিক করে খরচ ওঠানোর কথা প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিপন দেবনাথ বলেন, ‘এমন কথা বলা হয়নি। এছাড়া বরাটিয়া এলাকায় যেখানে চর পড়েছে সেখান থেকেই বালু কাটার কথা বলেছি। বালু বিক্রি করা নিষেধ করা হয়েছে। তবে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে খতিয়ে দেখা হবে।’ এদিকে জামশা ভূমি অফিসের নায়েব আলী আজমের কাছে অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান। বলেন, ‘আমি আরিফ মেম্বারকে বলব আপনার সঙ্গে দেখা করতে।’ চারিগ্রামের নায়েব আবুল বাশার বলেন, জনগণ নদীর বালু কাটা বন্ধ করে দেওয়ায় এক দিন বালু ফেলা বন্ধ ছিল । তাই আশ্রয়ণ প্রকল্পে কম মাটি ফেলা হয়েছে।’

ইত্তেফাক/ইআ