১২ বছরের শিকলবন্দি জীবন থেকে মুক্তির অপেক্ষায় জাহিদ

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২২, ১৪:৪১

রংপুর নগরীতে এক যুগেরেও বেশি সময় ধরে শিকলে বাঁধা প্রতিবন্ধী জাহিদের জীবন। প্রথম দেখাতেই মনে হবে সুস্থ যুকব জাহিদ। তার কাছে গেলেই বোঝা যায় অন্য মানুষের মতো স্বাভাবিক জীবন নয় তার। তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে শিকল বন্দি থাকার পর রবিবার (২৮ আগস্ট) সকালে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদিকে, চিকিৎসাব্যয় বহন করবে জেলা সমাজ সেবা অধিদপ্তর। 

নগরীর ২ নম্বর ওয়ার্ডের শুকানচকি অভিরাম গ্রামে মানসিক ভারসাম্যহীন জাহিদের বাড়ি। গ্রামের ভ্যানচালক দিনমজুর ইউনুস আলী ও জাহানার বেগম দম্পতির তিন ছেলের মধ্যে প্রথম ছেলে জাহিদ। প্রতিবেশীরা জানান, জাহিদ ছোট থেকেই আশপাশের মানুষের ক্ষতি করে। এ কারণে বাধ্য হয়ে পরিবারের লোকজন তার পায়ে শিকল পরিয়ে রাখেন। গত ১২ বছর ধরে শিকলবন্দি করে রাখা হয়েছে তাকে।

জাহিদের মা জাহানারা বেগম বলেন, ‘মানুষের ক্ষতি করলে তারা নালিশ করে নানা কটু কথা শুনায়। তাই জাহিদকে বাধ্য হয়ে বেঁধে রেখেছি। ছেলে মানুষের ঘরবাড়ি, ফসল নষ্ট করে ফেলে। দিনে এলাকার ঘড়-বাড়ির বেড়া নষ্ট করে ফেলে, স্থানীয়দের দেখলে মারামারি করে।এছাড়া নিজের ঘর-বাড়িও তছনছ করে ফেলে। ছেলের পাগলামির কারণে বাধ্য হয়ে পায়ে শিকল পরিয়ে রাখতে হয়।’

জাহিদের বাবা দিনমজুর ইউনুস আলী বলেন, ‘ওর বয়স যখন ৩ বছর, তখন বুঝতে পারি ছেলে অন্যদের মতো সুস্থ নয়। অনেক কবিরাজি চিকিৎসা করিয়েছি। সর্বশেষ পাবনার পাগলা গারদে নিয়ে যাই কিন্তু জাহিদের বয়স কম থাকায় সেখানেও তাকে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করানো যায়নি। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডাক্তার দেখানোর পর অর্থের অভাবে আর যেতে পারিনি। সেসময় চিকিৎসক জানিয়েছিলেন চিকিৎসা চললে সুস্থ হয়ে যাবে জাহিদ।’

জাহিদের পরিবার জানায়, এলাকাসীর কথায় প্রথমে কয়েক বছর বিভিন্ন কবিরাজ ও কথিত পীরের বাড়িতে গিয়ে ঝাড়ফুঁক ও তাবিজ দিয়েছে। কিন্তু কোনো পরিবর্তন না হওয়ায় রংপুরের বেশ কয়েকজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে দেখানো হয়েছে। কয়েক বছর চিকিৎসা করা হয়েছে। অন্তত ২২ শতাংশ জমি বিক্রি করতে হয়েছে জাহিদের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে। কিন্তু গত ১২ বছরের বেশি সময় ধরে সব চিকিৎসা বন্ধ করতে বাধ্য হয় পরিবার। 

বাবা ইউনুস আলী অর্থের অভাবে আর ছেলের চিকিৎসা চালাতে পারেননি। জাহিদের বাবা বলেন, ‘কিছু দিন আগে ছেলের চিকিৎসার জন্য ভিটাবাড়ি বিক্রি করে চিকিৎসা করা হয়েছিল। তাও শেষ হয়ে গেলো। এখন বাড়ি ছাড়তে হবে। এদিকে ছেলেকে শিকল পরাতে কষ্ট হয়। কিন্তু শিকল না পরালে সে আমাদেরও মারধর করে। তার চিকিৎসা করাতে গিয়ে আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি। তার জন্য একটা থাকার ঘর পর্যন্ত নেই। এখন আর চিকিৎসা করানো সম্ভব নয়।’

রংপুর সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর বলেন, ‘পরিবার বাধ্য হয়ে শিকল পরিয়ে রেখেছে নিজেদের সন্তানের পায়ে। এদের চিকিৎসায় সরকার ও বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিৎ। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে সাহায্য দেওয়া হয়।’

রংপুর জেলা সমাজ সেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আব্দুল মতিন বলেন, ‘অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূল স্রোতধারায় নেওয়ার যে চিন্তা-চেতনা, তা বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার। জাহিদকে আজ সকালে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করার জন্য ভর্তি করে দেওয়া হয়েছে। তার প্রতিবন্ধী ভাতা করে দেওয়া হয়েছে। জাহিদকে চিকিৎসার জন্য পাবনা মানসিক হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্ত বয়স ১৮ বছর না হবার কারণে তাকে ভর্তি করা সম্ভব হয়নি। জাহিদের সব চিকিৎসাখরচ সমাজ সেবা অধিদপ্তর দিবে।’

ইত্তেফাক/মাহি