বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আজ আবার অভিযান শুরু 

‘অবৈধ ক্লিনিক নিয়ে চোর-পুলিশ খেলা’

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২২, ০১:০৪

সারা দেশে অলিগলিতে চিকিৎসাসেবার নামে অবাধে অবৈধ ব্যবসা করে যাচ্ছে অসংখ্য অনিবন্ধিত হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ নিয়ে অনেকটা চোর-পুলিশ খেলা চলছে। অভিযানে অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনিস্টিক সেন্টার তালাবদ্ধ করা হলেও পরদিন তা আবার চালু হয়ে যায়। এছাড়া প্রায়ই অভিযানের নামে চলে বাণিজ্য। স্বাস্থ্য প্রশাসন এগুলো বন্ধে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে। এমন অবস্থার মধ্যে অবৈধ ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে আবারও সাঁড়াশি অভিযান আজ সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে। সপ্তাহব্যাপী চলবে এই অভিযান।

এর আগে গত ২৬ মে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সারা দেশের সব অবৈধ হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংক ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বন্ধের নির্দেশ দেয়। এই নির্দেশের পর গত ২৮-৩১ মে পর্যন্ত তিন দিন স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় সারা দেশে অবৈধ প্রতিষ্ঠান বন্ধে অভিযান পরিচালিত হয়। এই অভিযানে সর্বমোট ১ হাজার ৬৪১টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছিল। অভিযানে মোবাইল কোর্ট সূত্র ও স্থানীয় ইত্তেফাকের স্থানীয় প্রতিনিধিরা জানান, বেশির ভাগ অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা এবং সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তারা কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করেন না। অভিযানে বন্ধ করে দিলে পরদিনই তা চালু করে। এগুলো দেখার যেন কেউ নেই। এসব অবৈধ ক্লিনিকে প্রায়ই ভুল চিকিৎসার ঘটনা ঘটছে। সিজার দরকার নেই, কিন্তু তারপরও সিজার হচ্ছে। নবজাতক শিশুকে টেনেহিঁচড়ে বের করা হচ্ছে। সিজার করতে গিয়ে বিভিন্ন অঙ্গহানির ঘটনাও ঘটছে। প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। অবৈধ ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলো অনেকটা কসাইখানার মতো। অনেক ক্লিনিকে বসেন ভুয়া ডাক্তার। আবার বিশেষজ্ঞ কোনো ডাক্তার থাকে না। মেডিক্যাল অফিসার আছেন। তাদের ভুল চিকিৎসায় অনেকে মারা গেছেন। এসব ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলো টাকা বেশি নিলেও সেবার মান খুবই নিম্নমানের। কোটি কোটি টাকা তারা কামিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ তাদের কিছুই করতে পারছে না। তাদের খুঁটির জোর কোথায়? 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

অবৈধ হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোকে মানুষ মারার ক্লিনিক হিসেবে আখ্যায়িত করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য), সিভিল সার্জন কার্যালয় ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তারা নিয়মিত মাসোহারা পেয়ে থাকেন অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মালিকের কাছ থেকে। অধিকাংশ সিভিল সার্জন বসে বসে টোল কালেক্ট করার কাজে ব্যস্ত থাকেন। এছাড়া এত হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিদর্শনের মতো জনবলও নেই স্বাস্থ্য প্রশাসনে। এই সুযোগে সরকারি হাসপাতালে রোগী গেলে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে। অথচ সরকারি হাসপাতালে সব ধরনের পরীক্ষা ও চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা আছে। যা অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিকে নেই। তারপরও সেখানে পাঠানো হয়। এক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালে আগত রোগীদের পাঠিয়ে ৫০ ভাগ কমিশন পান এক শ্রেণির ডাক্তার, নার্স, টেকনিশিয়ানসহ কর্মচারীরা। সরকারি হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটারসহ চিকিৎসাসেবার সকল ব্যবস্থা থাকলেও রোগীদের অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিকে পাঠিয়ে সেখানে অপারেশন করেন একই ডাক্তার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর গতকাল রবিবার দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে বলেন, তিন মাস পরও যারা অনুমোদন নেননি তাদের আর সুযোগ দেওয়া হবে না। সেবার মানের ভিত্তিতে বেসরকারি হাসপাতালকে তিন ক্যাটাগরির করার পরিকল্পনা চলছে বলে জানান তিনি।

জানা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন আছে অথচ প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সব শর্ত মানছে না, পরিস্থিতির উন্নতি করার জন্য তাদের তিন মাস সময় দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তিন মাস হয়ে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যারা নিয়ম মেনে লাইসেন্স রিনিউ বা নতুন লাইনসেন্স নেয়নি, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই নতুন এ অভিযান চালানো হবে। এ বিষয়ে ২৪ আগস্ট রাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে সারা দেশের সিভল সার্জন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়েছে বলে জানান অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. বেলাল হোসেন বলেন, অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে আজ থেকে আবারও অভিযান শুরু হবে। এর আগে অভিযান হয়েছে। কিন্তু আজ থেকে সারা দেশে অভিযান চলবে কঠোরভাবে। যেসব বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার অনিবন্ধিত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর যদি অবকাঠামো থাকে, কিন্তু হাসপাতাল পরিচালনার সব শর্ত না মানে সেক্ষেত্রে শর্ত মানার জন্য সময় দেওয়া হবে। তিনি বলেন, এর আগে অভিযান চালিয়ে প্রায় ১ হাজার ৭০০ অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ করে দেওয়া হয়। দেশে ১২ হাজার ৩০০ বৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে; তবে এর অবৈধ সংখ্যা হবে প্রায় তিন গুণ। রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত গড়ে উঠেছে এসব প্রতিষ্ঠান। বেশির ভাগের অবকাঠামো নেই। বৈধদের ৮০ ভাগেরই অবকাঠামো নেই। তারপরও চলছে। অনেকের নেই যন্ত্রপাতি, পরীক্ষানিরীক্ষার ব্যবস্থা। বিশেষজ্ঞ জনবল নেই। সিজার করতে গিয়েও রোগী মারা যাচ্ছে। রোগী ও নবজাতক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মনিরুজ্জামান ভূইয়া বলেন, অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে এই অভিযানে আমরাও থাকব। যাতে করে অবৈধদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং যারা অবৈধ আছে তারা যেন অযথা হয়রানির শিকার না হয়। আসলে আমাদের দরকার মানসিকতার পরিবর্তন। সরকারি নীতিমালা মেনে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার নির্মাণ করতে। এক্ষেত্রে চিকিৎসা সেবার নামে রোগীদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার মন-মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সরকারি বিধান না মেনে যাতে কেউ এসব প্রতিষ্ঠান করতে না পারে সেজন্য কঠোর নজরদারি থাকতে হবে।

ইত্তেফাক/ইআ