রাজধানী ঢাকা শহরের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার ‘কাওরান বাজার’। এ বাজারটির রয়েছে অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য। তবে ভিন্ন ভিন্ন পণ্যের নির্ধারিত আড়ত এ বাজারের প্রধান বৈশিষ্ট্য। রয়েছে সুবিশাল মাছের পাইকারি বাজার। সবধরনের দেশীয় ফল সব সময় পাওয়া যায় এ বাজারে। মুরগি, মাছ, শুঁটকি, সবজি, মসলা, মুদির দোকানের পণ্যসামগ্রী থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুই পাইকারি বিক্রি হয় এ বাজারে। এসব পণ্য এ বাজারে আসে সারা দেশ থেকে। এখান থেকেই আবার চলে যায় সারা দেশের ছোট-বড় শহরের বিভিন্ন বাজারে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ বাজারের ব্যস্ততা বাড়ে। সারা দেশের পণ্য হাতবদলের এই কর্মযজ্ঞ চলতে থাকে রাতভর। দেখে মনে হবে যেন, কর্মের মনমুগ্ধকর উৎসব। এ কারণে এ বাজারকে অনেকে রাতের বাজারও বলে থাকে।
- বাজারের বৈশিষ্ট্য
রাত সাড়ে ৯টার পর থেকেই আসতে শুরু করে বড় বড় ট্রাকে করে বিভিন্ন জাতের শাক ও সবজি। এসব সবজি এমনভাবে সাজানো হয় যে দেখে মনে হবে একেকটি সবজির পাহাড়। মহাজনরা আসতে থাকেন একে একে বাজারে। আর কর্মচারীরা আড়তে জ্বালান আগরবাতি। এভাবেই রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে আড়তের ব্যস্ততা। এভাবে রাত ১১টার পর দিনের চেনা এই বাজার বদলে যায় অচেনা এক আড়তে। যা দিনের সাধারণ ক্রেতাদের কাছে অচেনা এক দৃশ্য। ট্রাকবোঝাই কাঁচামালের পণ্যসামগ্রীতে ভরে উঠে কাওরান বাজার। পণ্যগুলো ট্রাক থেকে নামানো, কেনাবেচা ও পরিবহন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন অসংখ্য মানুষ। যাদের সন্ধ্যারাতে ডালিতে ঘুমাতে দেখা যায়। আড়তদার, পাইকার, ক্রেতা, বিক্রেতা, পরিবহন ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততায় সরগরম হয় পুরো এলাকা। তবে প্রতি রাতে এই বাজারে বা আড়তে কত টাকার কেনাবেচা হয় তার সঠিক হিসাব জানা যায়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, প্রতি রাতে এখানে আনুমানিক কয়েক কোটি টাকার কেনাবেচা হয়।
- ইতিহাস
অন্য সবকিছুর মতোই এ বাজারটিরও রয়েছে পৃথক ইতিহাস। জানা যায়, ১৮০০ শতাব্দীর শেষের দিকে ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে ফল এনে পাইকারি বিক্রি করতেন ‘কারওয়ান সিং’ নামের একজন মারোয়াড়ি ব্যবসায়ী। তিনিই প্রথম এই স্থানে বাজার বসান। তার কাছ থেকে ফল কিনে নিতেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। সে সময় ক্রেতারা তার নামেই ঐ এলাকাটিকে ডাকতে থাকেন ‘কারওয়ান সিংয়ের’ বাজার হিসেবে। ঐ সময় কারওয়ান সিংয়ের ফল কিনতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতেন খুচরা বিক্রেতারা। কারণ তার আনা ফলগুলো ছিল মানে ভালো। আর পাইকারি বাজারের কারণে দামেও সস্তা পেতেন ব্যবসায়ীরা। এভাবে ধীরে ধীরে মানুষ ঐ বাজারকে ডাকতে শুরু করেন কারওয়ান সিংয়ের বাজার নামে। সাত অক্ষরের নাম লোকমুখে সংক্ষিপ্ত হয়ে ‘কাওরান’ বাজার নাম পায়।
তবে এই বাজারের নাম নিয়ে ভিন্ন গল্পও রয়েছে। জানা যায়, এই এলাকায় এক সময় গরু দৌড়ের আয়োজন হতো। সেই সময় এই গরু দৌড় খুব আলোচিত ছিল। তখন ইংরেজি শব্দ ‘কাউ’ ও ‘রান’ থেকে জায়গাটির নাম হয় ‘কাউরান বাজার’। এখনো অনেকে এ বাজারকে ‘কাউরান’ বাজার বলে। আবার কেউ কেউ একে বলেন, ‘কারুণ বাজার’। তবে অনেকে বলেন, এলাকা ভেদে মানুষের উচ্চারণের তারতম্যের কারণে এই গল্পগুলো লোকমুখে তৈরি হয়েছে। তবে শুদ্ধ উচ্চারণে বা বইপত্রে এ বাজারের নাম লেখা হয় ‘কারওয়ান বাজার’।
- জমজমাট রাতের বাজার
রাত ১২টায় এ বাজারে কেউ এলে বুঝতে পারবেন না এটি আসলে রাজধানীর কোন এলাকা। রাত যত বাড়ে এখানে কাজের ব্যস্ততা তত বাড়ে। কাজ ছাড়া কাউকে অন্য আলোচনা করতে শোনা বা দেখা যায় না। কর্মব্যস্ত এই বাজার চলে রাতভর। ফল, সবজি, মাছ, মুরগি ইত্যাদি পণ্যে বোঝাই হয়ে ট্রাক আসে কাওরান বাজারে। সবজিবোঝাই ট্রাক এসে ভিড়ে এ বাজারসংলগ্ন সড়কে। শুরু হয় হাজারো মানুষের হাঁকডাক, দর কষাকষি, মালবোঝাই বস্তা উঠা-নামার পদচারণা, ব্যবসায়ী আর আড়তদারদের মধ্যে চলে লাভ-ক্ষতির হিসাব। এ এলাকার রাতই পরিণত হয় দিনে। ফল, চাল, সবজিবোঝাই ট্রাকগুলো এসে ভিড়ে পেট্রোবাংলা বিল্ডিংয়ের আশপাশে। আর মাছবোঝাই ট্রাকগুলো এসে দাঁড়ায় এফডিসি রেল ক্রসিংয়ের গলিতে। এখানে মুরগি বাজারের নাম ‘কিচেন মার্কেট’। মুরগি, হাঁস, রাজহাঁস, কবুতর, টার্কি পাওয়া যায় এ মার্কেটে। গভীর রাতে সবজি বাজার রাস্তা পর্যন্ত চলে যায়। হাজারো মানুষের ভিড়ে কাওরান বাজারে জমে ওঠে কেনাকাটার উৎসব। অনেকে এই বাজারের সবজি ফল কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। ফলে এ এলাকায় কিছু কুড়োনি নারী ও শিশুকে দেখা যায়। যারা শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করে, পারিশ্রমিকের পাশাপাশি কুড়ানো পণ্য নিয়ে ঘরে ফেরে।
- অন্যান্য পণ্যও মেলে
পাইকারি পণ্যের পাশাপাশি খুচরা পণ্যও বিক্রি হয় এ বাজারে। দিনের বিভিন্ন সময় ঘণ্টা হিসেবে বাজারের জায়গা ভাড়া হয় এখানে। এই কাওরান বাজারে আরো আছে—কামারপট্টি, ইলেকট্রনিকস পণ্য, জুতা, জামাকাপড়, কাঠের পণ্য। এসব পণ্য দিনেই চলে বেশি এবং পাইকারি-খুচরা দুভাবেই বিক্রি হয়। এসব কারণেই কাওরান বাজার ভোগ্য পণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার হিসেবে পরিচিত।
