‘অপরাধী হলে বিচার করুন, তবুও তাদের ফিরিয়ে দিন’

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২২, ০৬:২৭

আমাদের প্রিয়জনরা অপরাধী হলে তাদের বিচার করুন। তবুও ফিরিয়ে দিন। আর কতকাল আমরা তাদের অপেক্ষায় থাকব। তারা বেঁচে আছে কি মরে গেছে আমরা তাও জানি না। মরে গেলে অন্তত লাশের এক টুকরো অংশ দিন, যা দিয়ে আমরা দাফন করতে পারব। হাত তুলে দোয়া করব আমার প্রিয়জন মরে গেছে।

বুকভরা কষ্ট নিয়ে কথাগুলো আক্ষেপ আর বলছিলেন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে আসা বিভিন্ন সময়ে ‘গুমের’ শিকার হওয়া লোকজনদের পরিবারের স্বজনরা। মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর শাহবাগে জড়ো হয়েছিলেন তারা। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষ্যে স্বজনদের ফিরে পাওয়ার দাবিতে স্বজনদের আকুতি ও কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছিল শাহবাগ চত্বর।

‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত এই মানববন্ধন ও সমাবেশে সংগঠনের সমন্বয়ক আফরোজা ইসলাম আঁখির সভাপতিত্বে গুমের শিকার পরিবারের স্বজনরা ছাড়াও নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমাদুর রহমান মান্না, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তাবিত আউয়াল ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর বক্তব্য রাখেন। মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন ২০১৩ সালের ১১ ডিসেম্বরে গুমের শিকার সুত্রাপুরের ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সেলিম রেজা পিন্টুর বোন রেহানা বানু মুন্নি। তিনি বলেন, আমি আমার ভাইকে ফেরত চাই। সে যদি কোন অপরাধ করে থাকে তবে তার বিচার করা হোক। কিন্তু তাকে গুম করে রাখার অধিকার রাষ্ট্রের নেই। সে কোনো আইন অমান্য করলে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হোক।

২০১৯ সালের ১৯ জুন মিরপুরের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে বাসায় ফেরার পথে র‍্যাব গুমের শিকার ইসমাইল হোসেন বাতেনকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় দাবি করে তার মেয়ে আনিসা হোসেন বলেন, আজ তিন বছর তিন মাস হলেও এখন পর্যন্ত আমার বাবার কোনো সন্ধান পাইনি। তাকে খুঁজে পেতে দেশের এমন কোন জায়গা নেই যেখানে আমরা আবেদন করিনি। র‍্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ হওয়ায় পুলিশ কমিশনার আমাদের আবেদনটা পড়েও দেখেননি। আমি কি আমার বাবাকে খুঁজে পাব না ?

২০১৬ সালের ৯ আগস্ট রাতে রাজধানীর মিরপুরের ডিওএইচএসের একটি বাসা থেকে ব্যারিস্টার আরমানকে তুলে নিয়ে যায় সাদা পোশাকে কিছু লোক। আরমানের মা ও স্ত্রী ছাড়াও স্বজনরা এসেছিলেন এই মানববন্ধনে। আরমান হকের মা আয়েশা খাতুন বলেন, প্রতি মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সদস্যরা বাসায় আসে। বাচ্চারা ভয়ে আর বাসায় থাকতে চায় না। পড়াশোনাও করতেও পারছে না। আরমানের দুই মেয়ে (যাদের বয়স ৯ ও ১০ বছর) ঘুমালেও দুঃস্বপ্ন দেখে তাদের রাস্তায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে, ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, মারধর করা হচ্ছে। পুলিশ এসে বারবার জানতে চায় আপনার ছেলে কোথায়। তাদের বারবার বলার চেষ্টা করি, আপনারাই তার খোঁজ দেবেন সে কোথায় আছে।

গুমের শিকার কুষ্টিয়ার আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন সেতুর স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস জিনিয়া বলেন, আমার স্বামী আজ থেকে সাত বছর আগে ১৫ আগস্ট ফুল দিতে এসে গাজীপুরের একটি রিসোর্ট থেকে নিখোঁজ হয়ে যায়। তখন থেকে আর খোঁজ মেলেনি। প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করব তাকে খুঁজে বের করতে নির্দেশ দিন, আমরা তাকে ফিরে পেতে চাই। এছাড়াও মানববন্ধনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, যতগুলো আয়নাঘর আছে সেগুলো আমরা এক দিন ভেঙে ফেলব। মানবাধিকার কর্মী নুর খান লিটন বলেন, যারা গুম হয়ে ফিরে এসেছেন তাদেরকে এমন ভীতিকর অবস্থার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, তারা এখন আর একটি শব্দও উচ্চারণ করতে চান না। সমাবেশে আরো শতাধিক আপনজন হারানো পরিবারের স্বজনরা অংশ নেন।

‘ইচ্ছা করে বাবার হাত ধরে স্কুলে যেতে’

২০১৩ সালে ‘গুম’ হয়ে যাওয়া বংশাল থানা ছাত্রদল সহসভাপতি মোহাম্মদ সোহেলের আট বছরের মেয়ে সাফা তার বাবাকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে যখন বিএনপি অফিসের সামনে কাঁদছিল উপস্থিত নেতাকর্মীদের চোখেও ছিল অশ্রু। সাফা ফুপিয়ে কাঁদছিল আর বলছিল, ‘জন্মের পর বাবাকে দেখিনি। স্কুলে বন্ধুরা তাদের বাবার হাত ধরে স্কুলে আসে, মেলায় যায়। আমি কখনো বাবার আদর পাইনি। আমারও ইচ্ছা করে বাবাকে জড়িয়ে ধরতে, বাবার হাত ধরে স্কুলে যেতে। সরকারের কাছে আমার একটাই দাবি, আমার বাবাকে ফিরিয়ে দিন।’

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষ্যে নয়া পল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত পৃথক মানববন্ধনে গুম হওয়াদের পরিবারের সদস্যরা বক্তব্য রাখেন। ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ বিএনপি এই মানববন্ধনের আয়োজন করে। যখন গুম হওয়াদের ছোট বাচ্চারা কান্নাকাটি করছিল তখন এক শোকাচ্ছন্ন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সাফার মতো আরো অনেক শিশু তাদের বাবাকে ফেরত দিতে আহ্বান জানায়।

এই মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আবদুস সালাম প্রমুখ।

ইত্তেফাক/ইআ