বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

হাসপাতালের ফ্রিজে পঁচা রক্ত, অভিযানের আগেই পালিয়ে গেলো মালিক

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:৩৭

সারাদেশে অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৯৬ ঘণ্টার জরুরি অভিযান আজ বৃহস্পতিবার শেষ হচ্ছে। অভিযানে কর্মকর্তারা সরেজমিন গিয়ে দেখেন, খোদ রাজধানীর অলিগলি, পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠেছে বেসরকারী হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এদের ৯০ ভাগেরই লাইসেন্স ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এসব অবৈধ হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার নামে অপচিকিৎসা ও রোগী মারার চিকিৎসা চলছে। হাসপাতালের ফ্রিজে পাওয়া গেছে পঁচা রক্ত। এছাড়া রক্ত পরীক্ষায় ব্যবহৃত রি-এজেন্ট মেয়াদোত্তীর্ণ। 

জরুরী চিকিৎসায় স্থানীয় প্রাইভেট ক্লিনিক, ডায়গনিস্টিক সেন্টার বা হাসপাতালে গেলেই রোগীকে অনেক সময় রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হয়। এসময় রোগীর স্বজনদের রক্ত পঁচা কি না তা যাচাই করার বা দেখার সময়  এবং সুযোগ থাকে না। চিকিৎসকদের উপর আস্থা রেখেই রোগী সেবা গ্রহণ করে থাকেন। কিন্তু জরুরী মুহুর্তে রোগীকে যে রক্ত দেয়া হচ্ছে তা যদি হয় পঁচা, তাহলে ভাবুন তো কেমন হবে? গতকাল অভিযানের আগেই পালিয়ে যায় অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকরা। সাধারণ মানুষ বলেন, দেশের চিকিৎসা সেবা কোথায় গেছে ভাবতে অবাক লাগে। খোদ রাজধানীতে যেখানে কেন্দ্রীয় প্রশাসন নাকের ডগায় কিভাবে তারা মানুষ মারার এই প্রতিষ্ঠান চালু রাখার সাহস পায়? 

অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অভিযান।

রাজধানীসহ সারাদেশে চিকিৎসা সেবার নামে অপচিকিৎসা ও মানুষ মারার প্রতিষ্ঠান চালু রাখতে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এসব অবৈধ প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের মালিক স্থানীয় এক শ্রেণীর রাজনৈতিক নেতা, সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার, টেকনিশিয়ানসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিভিন্ন সময় বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ করা হলেও তা কাজে আসেনি। পরদিনও তা চালু হয়ে গেছে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা প্রভাবশালী। স্বাস্থ্য প্রশাসনকে তারা পাত্তা দেয় না। ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে তাদের সখ্যতা থাকে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতারা একাকার হয়ে অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক চালাচ্ছেন। রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকলেও অবৈধ ব্যবসার ক্ষেত্রে তারা ঐক্যবদ্ধ। স্বাস্থ্য প্রশাসনের সঙ্গে আঁতাত করেই তারা তাদের রমরমা বাণিজ্য করে আসছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য), সিভিল সার্জন কার্যালয় ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তারা নিয়মিত মাসোহারা পেয়ে থাকেন অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মালিকের কাছ থেকে। অধিকাংশ বিভাগীয় পরিচালক ও সিভিল সার্জনরা ঠিক মতো মনিটরিং করেন না। তবে কোন কোন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সরকারি হাসপাতালের রোগী ভাগিয়ে নেওয়া বন্ধ রেখেছেন। তারা পারলে অন্যরা কেন পারবেন না? এ প্রশ্ন সবার। অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও রোগী ভাগিয়ে অবৈধ হাসপাতালে পাঠানোর সাথে জড়িত। আবার কোন কোন টিএইচও নিজেই সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত। কারণ তারা কমিশন পায়। 

অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অভিযান।

লালমনিরহাটের কালিগঞ্জে একটি অবৈধ হাসপাতাল ক্যান্সার চিকিৎসা সেবা চালু করেছে। অথচ ক্যান্সারের মতো এমন সাব স্পেশালাইজড বিষয়ে সেখানে চিকিৎসা সেবা দেওয়া কী করে সম্ভব? সেখানে কোন ব্যবস্থা নেই, তারপরও সেখানে ক্যান্সারের চিকিৎসা। এখানে চিকিৎসা নিয়ে কিছুদিন পর রোগীরা মারা যায়-এমন তথ্য দিয়েছেন এলাকাবাসী। প্রত্যেক উপজেলায় এমপিদের সমন্বয়ে স্বাস্থ্য সেবা উন্নয়ন কমিটি আছে। কিন্তু অধিকাংশ এই নিস্ক্রিয়। তবে কোন কোন কোন এমপির এলাকায় উপজেলা পর্যায়ে আইসিইউ এর মতো আধুনিক চিকিৎসা সেবা চালু আছে। এতে এলাকার সাধারণ মানুষ উপকৃত। তবে এদের সংখ্যা কম।

গতকাল মিরপুর সাড়ে ১১ নম্বর রোডে ফেয়ার নার্সিং হোমে অভিযান চালায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি টিম। এই হাসপাতালের লাইসেন্স নেই। অভিযানের খবর টের পেয়ে আগেই হাসপাতাল বন্ধ করে পালিয়ে যান মালিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। একই এলাকায় হলি হোমে ডাক্তার-নার্স নেই। এলাকাবাসী বলেন, এখানে তো অপারেশন হয়। অভিযানের খবর পেয়ে চার জন রোগী রেখে হলি হোমের সবাই পালিয়ে যায়। মিরপুর ১১ নম্বর রোডে শেখ সেবা কেন্দ্র আছে। এটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এর লাইসেন্স নেই। আল সাফি হাসপাতালের মালিক একজন গাইনি বিশেষজ্ঞ। অথচ এই হাসপাতালে মাত্র একজন লোক আছে, যিনি সিরিয়াল লেখেন। আর কাউকে দেখতে পায়নি অভিযানের কর্মকর্তারা। এই হাসপাতাল লাইসেন্সের মেয়াদ ছয় বছর আগেই শেষ হয়েছে, নবায়ন করা হয়নি। কাফরুলের ইব্রাহিমপুরে হেলথ কেয়ার হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স নেই। অভিযানের খবর পেয়ে চার জন রোগী রেখেই সবাই পালিয়ে যান। এই হাসপাতালে প্যাথলজি পরীক্ষার রিপোর্ট দেওয়ার প্যাডে চিকিৎসকদের স্বাক্ষর পাওয়া যায়। এই ধরনের দেড় শতাধিক প্যাড অভিযানকালে উদ্ধার করা হয়। 

আগে স্বাক্ষর করা সম্পর্কে অভিযানের কর্মকর্তারা বলেন, রক্ত সংগ্রহ করে বালতিতে ফেলিয়ে দেওয়া হয়। এই ধরনের টেস্টকে বালতি টেস্ট বলে। এই হাসপাতালের ফ্রিজে রোগীর জন্য রাখা রক্তের ব্যাগটি ছিল পঁচা রক্ত। তাৎক্ষণিক যাচাই করে টিম এর সত্যতা পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, রাজধানীতে যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে ঢাকার বাইরের অবস্থা কেমন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ভূয়া প্রতিষ্ঠান কিংবা রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর রয়েছে। কিন্তু তারাও এই কাজটি ঠিক মতো করেন না। দেশে নামি-দামি হাসপাতাল ও বিশ্বমানের চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু এসব অবৈধ হাসপাতাল-ক্লিনিক জনগণকে চিকিৎসার নামে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অপরদিকে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করছে। সারাদেশে সরকারি হাসপাতালের রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দিতে হবে। সারাদেশের ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ বেসরকারি হাসপাতাল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত। 

অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অভিযান।

এদিকে ইত্তেফাকের স্থানীয় প্রতিনিধিরা সরেজমিন গিয়ে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার সিন্ডিকেট সদস্যদের কর্মকান্ড দেখতে পান। সবার চোখের সামনে রোগী ভাগিয়ে দিচ্ছে, অথচ দেখার যেন কেউ নেই। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. বেলাল হোসেন বলেন, সারাদেশে অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৯৬ ঘণ্টার জরুরি অভিযান আজ শেষ হচ্ছে। এরপর পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তবে চলমান অভিযান অব্যাহত থাকবে। স্বাস্থ্য সেবা উন্নয়ন কমিটি দেখভাল কোন কোন এলাকায় করে। তারা এই ধরনের তথ্য পান। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য সেবার ক্ষেত্রে জনগণকে আরো সচেতন করে তোলা হবে।        

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন