বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

শিগগিরই তাইওয়ানে হামলা চালাবে না চীন!

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৭:৩৪

ইউক্রেন যুদ্ধের পর এই মুহূর্তে বিশ্ব চিন্তিত চীন ও তাইওয়ানের মধ্যকার উত্তেজনা নিয়ে। অনেকেই আশঙ্কা করেছেন যে, শিগিগরই চীন তাইওয়ানে হামলা চালাতে পারে। যদিও তার সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। আবার চীন তাইওয়ানে হামলা চালালে তাইপে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে ব্যাপারটা সেরকমও কিন্তু নয়। ইতিমধ্যে তাইওয়ান কিছু পালটা জবাব দেওয়ার মাধ্যমে তার প্রমাণ রেখেছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রও তাইওয়ান ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। মূলত মার্কিন কংগ্রেসের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির বিদায়ি সফরকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা শুরু হয় এবং ক্রমেই তা বাড়ছে।

ব্রিটেন ভিত্তিক সংবাদ ম্যাগাজিন দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, তাইওয়ান যুদ্ধ হবে মূলত চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আমেরিকা এবং চীন কখন যুদ্ধের মতো বিপজ্জনক খেলার মুখোমুখি হবে? জবাব হচ্ছে-২০৪৯ সাল। এই সময় চীন জাতির পুনর্জাগরণ হবে এবং বিশ্বমানের সেনাবাহিনী তৈরি হবে। ২০৩৫ সালেও হতে পারে হামলা। এই সময়ের মধ্যে চীনের জাতীয় প্রতিরক্ষা এবং সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন শেষ করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে সরকারের। ২০২৭ সালেও হামলা হতে পারে বলে মনে করছেন মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রধান। তার মতে, চীন তাইওয়ানে হামলার অজুহাত খুঁজছে।

নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গে লেখা এক নিবন্ধে ব্লুমবার্গের কলামিস্ট এবং মার্কিন নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অ্যাডমিরাল জেমস স্ট্যাভরিডিস লিখেছেন, চীন খুব দ্রুত তাইওয়ানে হামলা চালাবে না। তার মতে, অন্তত ১৮ মাসের মধ্যে হামলার সম্ভাবনা নেই বলে মনে হয়। তিনি চীনের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে স্ট্যাভরিডিস মনে করেন, দ্রুত হামলার সম্ভাবনা নেই। তিনি এর পাঁচটি কারণ উল্লেখ করেছেন। 

প্রথমত : ইউক্রেন যুদ্ধই চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে থামিয়ে দেবে। তিনি হয়তো নিজেকেই প্রশ্ন করবেন যে, রাশিয়ার মতো আমার জেনারেল ও অ্যাডমিরালদের ভূমিকাও যদি এরকম হয়! শি জিনপিং হয়তো রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়েছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে তারা অলিম্পিক গেমসের সময় মিলিত হয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট পুতিন হয়তো মনে করেছিলেন, এই যুদ্ধ হবে খুবই তীক্ষ, সংক্ষিপ্ত এবং পশ্চিমা বিশ্ব গুছিয়ে নেওয়ার বা একত্রিত হওয়ার আগেই ইউক্রেন রাশিয়ার দখলে চলে যাবে। 

দ্বিতীয়ত, তাইওয়ানের নাগরিকদের নিয়ে চীনের ভাবনা। তারা কী যুদ্ধ চালিয়ে যাবে না কি গুটিয়ে নেবে নিজেদেরকে? কারণ, জরিপ সবসময় নির্ভরযোগ্য নয়। তবে বর্তমানে তাইওয়ান যে ধরনের ইঙ্গিত দিচ্ছে তাতে তাইওয়ান ছেড়ে দেবে না। কারণ ছেড়ে দিলে তাইওয়ান আর দেশ হিসেবে কারো কাছে পরিচয় দিতে পারবে না। অধিকন্তু এটা চীনের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং চীন সেখানে সেনাবাহিনী মোতায়েন করবে। ইতিমধ্যে চীনা ড্রোন লক্ষ্য করে গুলি চালানো এবং চীনের কাছে একটি অপরিচিত ড্রোন ভূপাতিত করেছে। আবার তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট সাই ইং-ওয়েনও ইউক্রেন প্রেসিডেন্টের মতো কঠোর। পরাজয় স্বীকার করার মতো নেত্রী নন। আবার তাইওয়ানে পর্বত এবং জঙ্গল রয়েছে। এখানে আক্রমণ করা খুব সহজ নয়। সমুদ্রপথেই হামলা চালাতে হবে। 

তৃতীয়ত, চীন দেখেছে যে, ইউক্রেনে হামলার পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে কীভাবে পশ্চিমা বিশ্ব ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে রুশ অর্থনীতিতে ধস নামতে শুরু করেছ। রাশিয়া হয়তো গ্যাস বন্ধ করে ইউরোপকে ভোগানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু রুশ অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে জ্বালানিসংকট সামাল দিতে ইইউ মস্কোর বাইরে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। 

চতুর্থত, সামনে চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির সম্মেলন। এবারও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তৃতীয় মেয়াদে পাঁচ বছর থাকার চেষ্টা করছেন এবং করবেন। এই সময়ে তিনি এমন কিছু করবেন না, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষুব্ধ হয়। তিনি চাইবেন না যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সংঘাত বাধুক। কারণ তাইওয়ানে হামলার অর্থ চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বেধে যাওয়া। তাছাড়া ইউক্রেন যুদ্ধের পর তাইওয়ান যুদ্ধ বেধে গেলে চীনে উত্পাদন ব্যবস্থায় বিপর্যয় নেমে আসবে যার ফল ভোগ করতে হবে গোটা বিশ্বকে। 
পঞ্চমত, চীনের সামরিক এবং রাজনৈতিক নেতারা সম্ভব বুঝতে পেরেছেন যে, পুরোদমে যুদ্ধ করার মতো সক্ষমতা চীনের এখনো গড়ে ওঠেনি। তাদের সামরিক সক্ষমতা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের থেকে পিছিয়ে। অ্যাডমিরাল জেমস স্ট্যাভরিডিসের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের একটা যুদ্ধ বাধবে এবং সেটা ২০৩৪ সালেও হতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র এখনো সামরিক, কূটনীতিক, অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে এগিয়ে। ফলে চীন এখনই সংঘাত চাইবে না। তার মতে, এটা ঠিক যে, সময় বয়ে যাচ্ছে। কয়েক বছরের মধ্যে একটা যুদ্ধের সম্ভাবনাও নিকটবর্তী হচ্ছে।

 

 

ইত্তেফাক/ইআ