বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

মাটির ঘরে পাঠদান, ঝুঁকিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা   

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:৩১

টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার মওলানাপাড়া ছালাফিয়া সিনিয়র মাদরাসায় এখনো আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। দীর্ঘ ৪৮ বছর ধরে ঝুঁকি নিয়ে মাটির ঘরে চলছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান। অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়ায় আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থী। 

মাদরাসা সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৪ সালে মরহুম আবদুল হাই ছালাফি মাদরাসাটি স্থাপন করেন। এরপর শর্তপূরণ সাপেক্ষে মওলানাপাড়া ছালাফিয়া সিনিয়র মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠার ১১ বছর পর ১৯৮৫ সালে এমপিওভুক্ত হয়। ওই বছরই এলাকার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি মাটির ঘর নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে এর আশেপাশে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো মাদরাসা বা স্কুল নেই। 

এই মাদরাসায় একইসঙ্গে বিজ্ঞান, মানবিক, মোজাব্বিদ ও হিফজুল কোরআন অর্থাৎ দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত চারটি শাখায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান দেওয়া হয়। ১৮ জন শিক্ষক ও ২ জন কর্মচারী রয়েছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার সীমান্তবর্তী ওই এলাকার মাদরাসাটিতে ৩৫ গজের লম্বা জরাজীর্ণ একটি মাটির ঘর। ঝুঁকি নিয়ে সে ঘরে ক্লাস করছেন শিক্ষার্থীরা। ঝড়-বৃষ্টিতে যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে এই মাটির ঘর। বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকি নিয়েই পাঠদান করাচ্ছেন শিক্ষকেরা।   

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিনিয়র শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী নেই, তবুও চারতলা ভবন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আর আমাদের পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী থাকার পরেও পাকা ভবন নেই। বসার জায়গা দিতে পারি না। উপজেলার অনেক স্কুল, কলেজে পাকা ভবন আছে, আরও হচ্ছে। আমাদের প্রতিষ্ঠানে নেই। ডিজিটাল যুগে এখনো কী শিক্ষার্থীরা মাটির ঘরে পাঠদান নিতে চায়? শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনা করে তিনি প্রতিষ্ঠান ভবন বরাদ্দ দেওয়ার দাবি করেন সরকারের কাছে। 

শিক্ষকরা বলেন, এর আগে জেলা পরিষদ থেকে টিনশেড ভবন পেয়েছি, তার একটিতে শিক্ষকদের বসার রুম, অন্যটি মেয়েদের কমন রুম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকেরা এই মাদরাসার অবকাঠামোগত অবস্থা দেখে যোগদান করতে চায় না। একাডেমিক ভবনের সমস্যার কারণেই অনেক শিক্ষক স্বল্পতা রয়েছে। 

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাছিব উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের মাদরাসা ছাড়া বর্তমান সময়ে উপজেলায় কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাটির ঘর নেই। এখানে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলাম, এইচএসসি  পরীক্ষা দেবো, এই সময়টুকুতে শিক্ষকদের মুখে শুধু শুনেই গেলাম আমাদের চারতলা বিল্ডিং হবে। কিন্তু কবে যে হবে সেটির অপেক্ষা শেষ হচ্ছে না।’

মাদরাসার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যক্ষ মো. তালিবুর রহমান বলেন, ‘মাদরাসার অবকাঠামোগত উন্নয়ন না থাকায় অনেক ছেলেমেয়ে ভর্তি হতে চায় না। বাধ্য হয়েই দীর্ঘ দিনের পুরনো মাটির ঘরেই ক্লাস নিচ্ছি। ঘরের টিনের চালে মরিচা ধরেছে, মাটির দেয়ালও ফেটে যাচ্ছে। যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। সবসময় শঙ্কায় থাকি। আমাদের একটি একাডেমিক পাকা ভবন জরুরি প্রয়োজন।’ এ ব্যাপারে তিনি সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন। 

হেলে পড়েছে মাটির একাডেমিক ভবন

এলাকাবাসী ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন দুলাল বলেন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেইে শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে। কর্তৃপক্ষের কাছে মাদরাসার অবকাঠামোগত উন্নয়নের দাবি করছি।’ 

গভর্নিং বডির সভাপতি মো. আতিকুর রহমান বলেন, ‘২০২০ সালে স্থানীয় সংসদ সদস্য এই মাদরাসার একটি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। তিনি একটি ভবন করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু এখনো পাইনি।’ 

এবিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘এই উপজেলায় শুধু একটি মাদরাসায় মাটির ঘর আছে। প্রতিষ্ঠানের শুরুতেই নির্মাণ করা হয়েছিল। মাদরাসাটি ওই দুর্গম এলাকায় শিক্ষা বিস্তারে ভালো ভূমিকা রাখছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যাও অনেক, ফলাফল সন্তোষজনক। শিক্ষার গুণগতমান আরও উন্নত করতে এই প্রতিষ্ঠানে একটি একাডেমিক পাকা ভবন জরুরি প্রয়োজন।’

ইত্তেফাক/মাহি