রোববার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২২ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী, প্রতিরোধে প্রচার থাকলেও নেই কার্যকর ব্যবস্থা

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:৫৯

রাজধানীসহ সারা দেশে প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। গত আগস্ট মাসে ৩ হাজার ৫২১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের এই এক সপ্তাহেই ডেঙ্গুতে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ২১৬ জন।

ডেঙ্গুকে দৃশ্যমান শত্রু হিসেবে উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, ডেঙ্গু মশাবাহিত একটি রোগ। ডেঙ্গু থেকে রক্ষা পেতে হলে এডিস মশা নিধন করতে হবে। মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করতে হবে। এক্ষেত্রে অবহেলা করা হলে সামনে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রচারণা থাকলেও নেই কার্যকর ব্যবস্থা। এক্ষেত্রে সারা দেশের সিটি করপোরেশনগুলো ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বলে মনে করছেন অধিকাংশ মানুষ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেন, এডিস মশা নিধন ও ডেঙ্গুর উৎসস্থল ধ্বংসে জন সচেতনতা বৃদ্ধি করতে না পারলে সামনে বড় বিপদ আসবে।

বাংলাদেশে ২০১৯ সালে ডেঙ্গু সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। সেই বছর আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়ালেও ২০২০ সালে ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেকটা কম ছিল। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, ডেঙ্গু গৃহপালিত মশার কামড়ে হয়। নগরীর চার পাশের ময়লা-আবর্জনার স্তূপ থাকায়, নোংরা ড্রেন পরিষ্কার না করায় চলতি বর্ষা মৌসুমে মশার প্রজনন বেড়ে গেছে। করোনার মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। অথচ নগরীকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখলে এবং মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করলেই মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু নগরী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা যাদের দায়িত্ব তারা কি তাদের সেই কর্তব্যকাজ সঠিকভাবে করতে পারছেন? সিটি করপোরেশনকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার পাশাপাশি জনগণেরও সচেতন হতে হবে। জমাটবদ্ধ স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা হয়। তাই ঘরের আশপাশে পানি জমাটবদ্ধ অবস্থায় রাখা যাবে না। এডিস মশা ঘরের ভেতরেই থাকে। দিনের বেলায় কামড়ায়। তাই এখন থেকে সকলকে সচেতন হতে হবে।

গ্রাফিক্স: ইত্তেফাক

দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ২৭৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তবে এ সময়ে ডেঙ্গুতে কারো মৃত্যু হয়নি। এ নিয়ে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮৯ জনে। বুধবার সারাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের নিয়মিত ডেঙ্গু বিষয়ক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। রাজধানীর আজিমপুর, পুরান ঢাকা, যাত্রাবাড়ী, মানিকনগর, খিলগাঁও, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, মহাখালী, গুলশান ও উত্তরা এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে নতুন ভর্তি হওয়াদের মধ্যে ১৯৬ জনই ঢাকার বাসিন্দা। এই সময়ে ঢাকার বাইরের হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ৮৩ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি থাকাদের মধ্যে ৭০৬ জনই ঢাকার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি আছেন। আর ঢাকার বাইরে রয়েছেন সর্বমোট ১৮৩ জন রোগী। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত হাসপাতালে সর্বমোট ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন ৭ হাজার ৬৭৬ জন। এর মধ্যে ঢাকায় ৬ হাজার ২৪৪ জন এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় সর্বমোট রোগী ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৪৩২ জন। ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৬ হাজার ৭৫৬ জন। তাদের মধ্যে ঢাকায় ছাড়প্রাপ্ত রোগীর সংখ্যা ৫ হাজার ৫২৫ জন এবং ঢাকার বাইরে সর্বমোট ছাড়প্রাপ্ত রোগী এক হাজার ২৩১ জন। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে সারা দেশে মাত্র ১২৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়। এরপর ফেব্রুয়ারি মাসে ২০ জন, মার্চ মাসে ২০ জন এবং এপ্রিল মাসে ২৩ জন ভর্তি হয়। মে মাস থেকে সংক্রমণ কিছুটা ঊর্ধ্বগামী হতে থাকে। ঐ মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় ১৬৩ জন। জুন মাসে ৭৩৭ জন, জুলাই মাসে ১ হাজার ৫৭১ জন এবং গত আগস্ট মাসে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫২১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে রাজধানীতে আক্রান্তের হার বেশি। তিনি বলেন, এডিস মশা নিধন করতে হবে। একই সঙ্গে এডিস মশার উৎসস্থল ধ্বংস করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। এক ব্যক্তি একাধিক বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তার জন্য ঝুঁকি বেশি। তাই এখন থেকেই সবার সচেতন হতে হবে। অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু জ্বর হলো ব্যাকবোন ফিভার। ডেঙ্গু হলে প্রচণ্ড মাথাব্যথা হয়, সারা শরীরে র‍্যাশ ওঠে ও ১০৩-১০৫ ডিগ্রি তাপমাত্রার জ্বর আসে। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। জ্বর হলে শুধু প্যারাসিটামল ওষুধ খেতে হবে। এসপিরিন জাতীয় কোনো ওষুধ খাওয়া যাবে না। প্রচুর পানি খেতে হবে। একই সঙ্গে সিভিসি পরীক্ষা করিয়ে দেখতে হবে। প্লাটিলেট যদি ১ লাখের নিচে নেমে আসে তাহলে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, বর্তমানে যে আবহাওয়া দেশে বিরাজ করছে, সেটা ডেঙ্গুর মৌসুম। হঠাৎ বৃষ্টি আবার গরম। বাসা বাড়ি ও আশপাশে স্বচ্ছ পানি জমাট বেধে এডিস মশার জন্ম হচ্ছে। এডিস মশার উৎসস্থল ধ্বংস করতে না পারলে সামনে ভয়াবহ বিপদ আসবে। সময় থাকতে সচেতন হতে হবে। ডেঙ্গু এখন সারা বছর হলেও এই সময়টাতেই বেশি হয়। মশা নিধনের উদ্যোগ নিতে হবে। এ ব্যাপারে জনগণকেও সচেতন করতে হবে।

ইত্তেফাক/ইআ