শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

হতাশার মধ্যে আশার আলো!

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:৩০

দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির শ্লথ গতির পেছনে রয়েছে নানা কারণ। সেই কারণগুলো চিহ্নিত করে নেওয়া হয়েছে ব্যবস্থা। শুধু ব্যবস্থা নিয়েই বসে থাকেনি, করা হয়েছে সার্বক্ষণিক মনিটরিংও। সেই মনিটরিংয়ের সুফল মিলেছে মামলা নিষ্পত্তির হারে। যা বিচার বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে হতাশার মধ্যে আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে। অধস্তন আদালত সংক্রান্ত হাইকোর্টের মনিটরিং কমিটির এক প্রতিবেদনে এই মামলা নিষ্পত্তির হার বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সম্প্রতি সেই রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর কাছে।

হাইকোর্টের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ছয় মাসে দেশের আট বিভাগে দায়েরকৃত মামলার বিপরীতে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারকরা নিষ্পত্তি করেছেন প্রায় সাত লাখ মামলা। বিভাগগুলোতে গড় নিষ্পত্তির হার ৯০ দশমিক ৯০ ভাগ। গত বছরের একই সময়ে এই নিষ্পত্তির হার ছিল ৫৯ দশমিক ৫০ ভাগ। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় নিষ্পত্তির হার বেড়েছে প্রায় ৩২ ভাগ।

বিচারাঙ্গণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি বছরই মামলা জট বাড়ছে। এই জট বাড়ার কারণে এক ধরনের হতাশা ভর করে বিচারপ্রার্থী জনগণের মধ্যে। এখন উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের নিয়ে গঠিত মনিটিরিং কমিটির নিরবিচ্ছিন্ন নজরদারির কারণে মামলা নিষ্পত্তি বৃদ্ধি পাওয়ায় সুফল পাচ্ছেন বিচারপ্রার্থী জনগণ। কারণ মামলার বিচার বিলম্বিত হলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হন মামলার পক্ষগণ। সে কারণে বিচারপ্রার্থী জনগণকে দ্রুত বিচার পাইয়ে দেওয়া সম্ভব হলে বিচার বিভাগের ওপর জনগণের আস্থা বাড়বে।

দেশের ২৩ তম প্রধান বিচারপতি হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী চলতি বছরের শুরুতে মামলা জট নিরসনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এর মধ্যে দেশের আট বিভাগের অধস্তন আদালতের মামলা নিষ্পত্তি মনিটরিংয়ের জন্য গঠন করা হয় কমিটি। প্রতিটি বিভাগের মামলা মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় একজন করে বিচারপতিকে। কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত আট বিচারপতি বিভিন্ন পর্যায়ের অধস্তন আদালতের বিচারকরদের সঙ্গে বৈঠক করেন। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে গিয়ে বিচারকরা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হন তা তুলে ধরেন বিচারপতিদের কাছে। সেইসব সমস্যার সমাধানে নানা নির্দেশনা দেন বিচারপতিরা। সেই নির্দেশনা বিচার কাজে প্রয়োগ করেন অধস্তন আদালতের বিচারকরা। একইসঙ্গে কে কতটি মামলা নিষ্পত্তি করছেন তার একটি রিপোর্ট হাইকোর্টে পাঠান তারা। যদি কোনো বিচারক দ্রুত মামলা নিষ্পত্তিতে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করতে ব্যর্থ হন তখন সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারপতি ওই বিচারকদের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলে সমাধানের পথ বাতলে দিচ্ছেন। যা প্রতিফলিত হচ্ছে অধস্তন আদালতের বিচার কাজে। এসব কারণেই সুফল মিলছে মামলা নিষ্পত্তির হারে।

মনিটরিং কমিটির প্রতিবেদন
প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের আট বিভাগে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা দায়ের হয়েছে ৭ লাখ ৪৭ হাজার ৪৭৬টি। এর মধ্যে ঢাকায় ২ লাখ ৬১ হাজার ৬২৬টি, চট্টগ্রামে ১ লাখ ৩২ হাজার ৫০৮টি, খুলনায় ৮৪ হাজার ৭৫৯টি, বরিশালে ৪৪ হাজার ৬৫৬টি, সিলেটে ৩৯ হাজার ১৯৭টি, রংপুরে ৫৩ হাজার ৬৭৩টি ময়মনসিংহে ৪৭ হাজার ৯০৪টি ও রাজশাহীতে ৮৩ হাজার ১৫৩টি নতুন মামলা দাখিল হয়েছে। দায়ের কৃত এই মামলার মধ্যে ঢাকায় ২ লাখ ২৫ হাজার ৬০৮টি, চট্টগ্রামে ১ লাখ ২৯ হাজার ৯২৬টি, খুলনায় ৭৪ হাজার ৬৯৪টি, বরিশালে ৪০ হাজার ৯১১টি, সিলেটে ৩৭ হাজার ৬৮৩টি, রংপুরে ৫২ হাজার ৮৪৬টি, ময়মনসিংহে ৫১ হাজার ৮১১টি ও রাজশাহীতে ৭৩ হাজার ৬৮৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। অর্থাৎ গত ছয় মাসে দায়েরের বিপরীতে ৬ লাখ ৮৬ হাজার ৯৫২টি মামলা নিষ্পত্তি করেছেন বিচারকরা। গত বছরের একই সময়ে আট বিভাগে নতুন মামলা দায়ের হয়েছে ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৯৮১টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ৩ লাখ ৯০ হাজার ৩১১টি। অর্থাৎ দায়েরের বিপরীতে নিষ্পত্তির হার ৫৯ দশমিক ৫০ ভাগ। 

দুটি বছরের প্রথম ছয় মাসের তুলনামূলক পরিসংখ্যান হতে দেখা যাচ্ছে, নতুন মনিটরিং কমিটি গঠিত হওয়ার পর বর্তমান কমিটির সভাপতিগণের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধায়ন, নিরবিচ্ছিন্ন মনিটরিং ও গতিশীল নেতৃত্বে আট বিভাগে মোট মামলা নিষ্পত্তির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ৩২ দশমিক ৪০ ভাগ।

শনিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে মামলা জটের পরিসংখ্যান তুলে ধরে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিচার পাওয়ার জন্য প্রতিদিন লাখ লাখ বিচারপ্রার্থীকে আদালতে ধরণা দিতে হয়। এতে যে কেবল তাদের সময় ও অর্থ অপচয় হচ্ছে তা নয়, মূল্যবান কর্মঘণ্টাও নষ্ট হচ্ছে। যেসময়ে তাদের উৎপাদনের কাজে থাকার কথা, সেসময় আদালতের বারান্দায় ঘুরেঘুরে বিচার পাওয়ার প্রহর গুণতে হচ্ছে। আমি আশা করছি, বিচারকগণ এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেবেন এবং জনগণকে দ্রুত ন্যায়বিচার প্রদান করে তাদের বিচার পাওয়ার দুর্ভোগ লাঘব করবেন।

মনিটরিং কমিটির কঠোর নজরদারির ফলে মামলা নিষ্পত্তির হার বৃদ্ধি বিচারপ্রার্থী জনগণের বিচার পাওয়ার সময় কমে আসছে বলে মনে করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মেহেদী হাসান চৌধুরী। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এই কমিটি তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখে মামলা জট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেবেন সেই প্রত্যাশা করি।

মনিটরিং কমিটিতে যারা
মনিটরিং কমিটিতে ঢাকা বিভাগের দায়িত্বে বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম, খুলনা বিভাগে বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, বরিশাল বিভাগে বিচারপতি জাফর আহমেদ, চট্টগ্রাম বিভাগে বিচারপতি মো. কামরুল হোসেন মোল্লা, সিলেট বিভাগে বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান, রংপুর বিভাগে বিচারপতি শাহেদ নূরউদ্দিন, ময়মনসিংহ বিভাগে বিচারপতি মো. জাকির হোসেন এবং রাজশাহী বিভাগে বিচারপতি মো. আখতারুজ্জামানকে দায়িত্ব দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। 

ইত্তেফাক/কেকে