২০১৯ সালে কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের পর ধর্মশালার বাইরে লাদাখের প্রত্যন্ত হিমালয় অঞ্চলে প্রথম সফর করেন দালাই লামা। তবে এটি লাদাখে তার প্রথম সফর নয়। সফরের পর কিছুটা বেদনার সুরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা আবার দেখা করব’।
তিব্বতের সঙ্গে লাদাখের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। লাদাখের প্রথম রাজা ছিলেন পশ্চিম তিব্বতের একজন শাসক। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন তিনি তিব্বতের শেষ রাজার সরাসরি বংশধর। লাদাখ এবং তিব্বতের মধ্যে সম্পর্ক সবসময় সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিল না।অনেকে ডোগরা রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় সরাসরি যুদ্ধ করেছে। কিন্তু শত্রুতার চেয়ে এই অঞ্চলগুলিতে বেশিরভাগ সময় শান্তি বজায় ছিল। কয়েক শতাব্দী ধরে, লাদাখিরা পশ্চিম সীমান্তে সুরক্ষা, ব্যবসা এবং শান্তির জন্য কাফেলার দিয়ে লাসাকে শ্রদ্ধা পাঠায়।
দালাই লামার প্রতিষ্ঠান গ্যাডেন ফোড্রাংয়ের পঞ্চম দালাই লামার সময় ক্ষমতায় আসার পর তিনি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রচার বৃদ্ধি করেন। যেটি এর আগে শুধুমাত্র মধ্য তিব্বতের চারপাশে সীমাবদ্ধ ছিল। তিনি সালে ১৬৭৯ সালে লাদাখি রাজ্যের বিরুদ্ধে একটি সামরিক অভিযান শুরু করেন এবং নাগারি অঞ্চলকে সংযুক্ত করেন। তিনি তার ধর্ম প্রচারও প্রসারিত করেন এবং তার সম্প্রদায়ের প্রচার শুরু করেন। লাদাখ সবসময়ই মধ্য তিব্বতে শিক্ষিত হওয়ার জন্য নব শিক্ষার্থীদের পাঠিয়েছে। মধ্য তিব্বতে ধর্মীয় শিক্ষা অতুলনীয়। গেলুগ সম্প্রদায়ের সেরা তিনটি মঠের মধ্যে ড্রেপুং এবং গাডেন দীর্ঘদিন ধরেই উজ্জ্বল পণ্ডিত তৈরি করে আসছে।
পঞ্চম দালাই লামার সামরিক অভিযানের চেয়ে বর্তমান দালাই লামার ধর্মীয় প্রচার এবং সামাজিক সম্প্রীতি লাদাখে অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছে। ইতিহাসবিদ সেরিং শাক্যে বলেন, বর্তমান দালাই লামা ৭০ এর দশকের শেষের দিকে পায়ে হেটে এবং ঘোড়ায় চড়ে দুর্গম হিমালয় অঞ্চলে যাতায়াত করতেন।তখন নয়াদিল্লির রাস্তা এরকম উন্নত ছিল না।দালাই লামার গেলুগ সম্প্রদায় হিমালয় অঞ্চলে একটি বড় উপস্থিতি রয়েছে। প্রাক্তন গাদেন ত্রিপা, তিব্বতি স্কুলের গেলুগপা অর্ডারের প্রধান, রিজং রিনপোচে লাদাখির এবং মাথোর রাজপরিবার থেকে এসেছেন। দালাই লামার আপন ভাই এনগারি রিনপোচের নিজস্ব পৃষ্ঠপোষকতায় প্রচুর মঠ রয়েছে।
দালাই লামার সঙ্গে বৌদ্ধ লামা এবং মঙ্গোলিয়ায় ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূ বকুলা রিনপোচের খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ১৯৫৬ সালে সালে দালাই লামার ভারত সফরকে সফল করার জন্য তিনি প্রয়োজনীয় সবকিছু করেন। কুশো বকুলা তখন জুনিয়র মন্ত্রী হিসেবে নয়াদিল্লিতে কাজ করছিলেন। তিনি সোনম ওয়াংচুক রচিত তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, তিনি ধর্মশালার উদ্দেশ্যে নয়াদিল্লি ত্যাগ করেন। দালাই লামার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করে দিল্লিতে ফিরে যান। বকুলাও দালাই লামার প্রথম লাদাখ সফর সফল করেছিলেন। তিনি তখন মঙ্গোলিয়ার রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
দালাই লামা ২০১৭ সালে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে অরুণাচল প্রদেশের তাওয়াং সফর করেন। তখন চীনারা বেইজিংয়ে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত বিজয় গোখলেকে তলব করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানাতে বলে। এর কারন হিসেবে তারা জানায়, দালাইলামা ভারত ও চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নষ্ট করার চেষ্টা করছে। অরুণাচল নতুন দিল্লির সরাসরি অধীনে ছিল এবং বেইজিংয়ের ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কিছু অনুমতি নেই। তারা অরুণাচলকে দক্ষিণ তিব্বতের অংশ। চীনের উদ্দেশ্য ছিল অরুণাচলের তাওয়াংকে ষষ্ঠ দালাই লামার জন্মস্থান হিসেবে জোর করে প্রমাণ করা। দালাই লামার লাদাখ বা অরুণাচল প্রদেশের সফর কখনোই চীনের পুরনো ক্ষতে আঘাত করার জন্য হয় না। তবে এবার এটি চীনের ‘সূক্ষ্ম খোঁচা’ বহন করেছে। এর কারণ ২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকার সংঘর্ষ।
লাদাখে বৌদ্ধধর্ম অধ্যয়ন করার জন্য তার নিরন্তর বার্তা জনগণের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। সম্প্রতি তাকে দেওয়া ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ মানববন্ধন সংবর্ধনা দেওয়া হয়। প্রতি বছর, যখনই দালাই লামা লাদাখ যান তিনি সব সময় বিভিন্ন তীর্থস্থান পরিদর্শন করেন। লাদাখ বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন তিব্বতি স্কুলের আবাসস্থল দালাই লামার প্রতি এত বেশি শ্রদ্ধা দেখিয়েছে। দালাই লামার প্রতি তাদের রয়েছে ভক্তি এবং অতুলনীয় বিশ্বাস।
চীনাদের কাছে তিনি একজন বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। যাকে বলা হয় ‘ভিখুদের পোশাকে নেকড়ে’ অথবা ‘বিভাজনবাদী’। কিন্তু লাদাখিদের কাছে তিনি একজন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। এমনকি তিনি লাদাখি না হলেও তার সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এবং ধর্মের দ্বারা আঞ্চলিক সীমানাকে একত্র করে রেখেছেন। দালাইলামা জম্মু হয়ে লাদাখের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সময় তার হোটেলে উপস্থিত সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘ভারত ও চীন দুটি জনবহুল দেশ এবং প্রতিবেশী। খুব শিগগিরই আলোচনা এবং কূটনৈতিক উপায়ে দুই দেশের সমস্যা সমাধান করতে হবে... তবে সামরিক শক্তির ব্যবহার সেকেলে হয়ে গেছে।’ চীন তার নিজের জনগণের বিরুদ্ধে নৃশংস মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। অর্থ ও সম্পদ লুট করছে। তবুও তিনি উভয় দেশের ভালোর জন্য বাস্তবসম্মতভাবে কথা বলেছেন। দালাইলামার এই চরিত্রই তাকে সত্যিকার অর্থে অকৃত্তিমতার মূর্ত প্রতীক করে তুলেছে। এমনকি একজন প্রতিপক্ষের কাছেও প্রিয় এবং শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি করে তুলেছে। এমনকি লাদাখের প্রত্যন্ত হিমালয় অঞ্চলের বাইরেও তার জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে গেছে।
