রোববার, ০২ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আগামী বছর থেকে বিশ্বমন্দার আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক

  • বড় অর্থনীতির দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি দ্রুত নেমে যাচ্ছে
  • নীতি সুদ হার বাড়ানোয় ঋণ প্রবাহ কমে যাবে
আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৮:০৫

আগামী বছর থেকে বিশ্বমন্দার আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নীতি সুদহার বাড়াচ্ছে। আর এর ফলে ২০২৩ সালের মধ্যে মন্দার লক্ষণগুলো আরো তীব্র হচ্ছে। সুদ হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি আগে কার্যকর হলেও এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সুদ হার এত বৃদ্ধির প্রবণতা বিগত ৫০ বছরেও দেখা যায়নি। এর ফলে বিনিয়োগের জন্য ঋণ প্রবাহ কমে যাবে, কারণ ঋণের খরচ বাড়বে। সেই সঙ্গে পণ্যের খরচ আরো বাড়িয়ে দেবে। ফলে অর্থনীতির গতি কমে মন্দায় রূপ নিতে পারে। বিশ্বব্যাংকের এই বিশ্লেষণ এমন এক সময়ে আসল যখন আগামী সপ্তাহের মধ্যে আরেক দফা নীতি সুদহার বাড়াতে যাচ্ছে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ও যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ব্যাংক অব ইংল্যাল্ড। বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দেশগুলো দফায় দফায় নীতি সুদহার বাড়িয়ে যাচ্ছে।

‘বিশ্ব মন্দা কি আসন্ন’ শিরোনামে বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ১৯৭০ সালের পর এবার অর্থনীতির গতি সবচেয়ে কমে গেছে। বিশ্বের সর্ব বৃহত্ অর্থনীতির দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ইউরোপের প্রবৃদ্ধি দ্রুত নেমে যাচ্ছে। এর প্রভাবে আগামী বছর মন্দায় রূপ নিতে পারে। নীতি সুদহার বাড়ানোর বিষয়ে বিশ্বব্যাংক বলছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি এতটা বেড়েছে, যা বিগত ৪০ বছরেও দেখা যায়নি। করোনার প্রকোপ কমতে শুরু করার পর বিশ্ববাজারে চাহিদা বাড়তে থাকে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম অনেক বেড়েছে। এই প্রভাব সামলাতে চাহিদায় লাগাম টানতে নীতি সুদহার বাড়ানো হচ্ছে। সুদহার বাড়ানোর প্রবণতা অর্থনীতির গতি কমিয়ে দিচ্ছে।

এবার পরিস্থিতি ভিন্ন যে কারণে:
অর্থনৈতিক সংকটে নীতি সুদহার কতটা কার্যকর সে বিষয়ে এক বিশ্লেষণ দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০০৭ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা না হলেও সেসময় বড় সংকট তৈরি হয়েছিল। মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক লেম্যান ব্রাদার্স ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে। এর পরেই অর্থনৈতিক সংকট বড় হয়ে সকলের সামনে আসতে শুরু করে। একে একে আরো কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে পড়লে সংকট ঘনীভূত হয়। ঐ ঘটনার এক মাস পর ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, কানাডা, সুইডেন এবং সুইজারল্যান্ড একত্রে সুদহার কমানোর ঘোষণা দেয়। যাতে করে ঋণ চাহিদা বাড়ে এবং অর্থনীতি ঘুড়ে দাঁড়াতে শুরু করে। এর ফলে আর্থিক সংকটের তীব্রতা কমে এসেছিল এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপও কমে এসেছিল। মন্দার আশঙ্কা থাকলেও পরিস্থিতি সামলানো গেছে। ১৯৭০ সালের আগে বিশ্বে যে মন্দা পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল সেগুলো বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, ঐ সময়ে মূলত প্রবৃদ্ধি অনেক কমে গিয়েছিল যার লক্ষণ এখন দেখা যাচ্ছে।

এবার মন্দা পরিস্থিতি ভিন্ন:
ত্রিশের দশকের মহামন্দা পরিস্থিতি উত্তরণে বিভিন্ন দেশ বাজার অর্থনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে। এর সুফলও পাওয়া যায়। সেসময় বেসরকারি খাতগুলোকে সরকারিভাবে বিভিন্ন সহায়তা দিতে শুরু করে যার প্রভাবে বাজার ঘুড়ে দাঁড়ায়। নীতি সহায়তা দেওয়ায়, মানুষে চাহিদা তৈরি হয় এবং উত্পাদিত পণ্যের বাজার তৈরি হয়। এবার করোনা পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর প্রায় সব দেশই সরকারিভাবে ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। স্থবির অর্থনীতি স্বাভাবিক রাখতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল সব দেশে অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি করে। সাধারণ মানুষের হাতে অর্থ থাকায় সেসময় সামগ্রিক চাহিদা টিকে থাকে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করায় এবার নীতি সহায়তা তুলে নিচ্ছে সবাই। ফলে সামগ্রিকভাবে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। করোনার পর ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে অস্বাভাবিক বেড়েছে জ্বালানিসহ নিত্যপণ্যের দাম। সরকারি সহায়তা তুলে নেওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে। আর্থিক নীতি ও মুদ্রানীতি আরো কঠোর করা হচ্ছে। সুদহার বাড়ানোর পাশাপাশি ভর্তুকি কমানোর প্রভাবে অর্থনীতির গতি কমে যাচ্ছে।

বিশ্বমন্দা ঠেকানো সম্ভব কি না:
এমন পরিস্থিতিতে ২০২৩ সাল নাগাদ বিশ্বমন্দার যে আশঙ্কা করা হচ্ছে সেটি এড়ানো সম্ভব কি না সে বিষয়ে বিশ্লেষণ দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অর্থনীতি যে গতিতে চলছে তাতে করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি অবস্থায় অর্থনীতির সংকোচন বা মন্দা আসন্ন। যাকে এক কথায় ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বলা হয়। করোনা পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারলেও এখন বিশ্বের প্রায় দেশ আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারেনি। অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার বাড়ানোর যে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে সেগুলো সমন্বিতভাবে করতে হবে। হটাত্ নেওয়া এই উদ্যোগ ধাপে ধাপে নিলে অর্থনীতিও সহনীয় হবে। নীতি সহায়তাগুলো হটাত্ তুলে না দিয়ে বাজার চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় রেখে করতে হবে। মধ্য মেয়াদে একটি কাঠামোর আলোকে নীতি সহায়তা সাজাতে হবে। শ্রমবাজার, নিত্যপণ্য এবং বাণিজ্যের গতির সঙ্গে নীতিগুলো সমন্বয় করতে হবে।

ইত্তেফাক/এসটিএম