মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ইংল্যান্ডের ‘রাজকাহিনি’

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৩:২৫

‘এক যে ছিল রাজা, তার ছিল এক রানি’—শৈশবে রূপকথার বই যে উত্তেজনাকর রোমাঞ্চ মনে ছড়িয়ে দিত, তাকে নেহাত গল্প বলেই মনে হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে যে এমন রাজা-রানি রয়েছে, তা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা বুঝতে শিখেছি। বইয়ের পাতায় পড়া সেই রাজা-রানির ঘোড়ায় ডানা নেই, তারা জনগণের জীবন দেখতে রাতের অন্ধকারে বাইরেও আসেন না। বরং তাদের জীবনযুদ্ধ রাজ্য দখলে ভরপুর। তবে, ব্রিটিশ রাজতন্ত্র এবং রাজপরিবার যেন বিশ্বের মানুষের কাছে স্বপ্নের জগতের মানুষ। বইয়ের পাতার মতোই বর্ণিল এই রাজতন্ত্রের ইতিহাস। প্রায় হাজার বছর ধরে তাদের শাসন চলে আসছে। মতান্তরে ১২০৯ বছর! আর এর মধ্যে পেরিয়ে গেছে ৩৭টি প্রজন্ম! তাদের নিয়ে মানুষের আগ্রহের কমতি নেই। এই রাজপরিবারের ফ্যাশন, তাদের অন্দরমহলের ঘটনা বাইরের জগতের কাছে আগ্রহের শীর্ষে থাকে সব সময়। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর আবারও নতুন করে ব্রিটিশ রাজপরিবারের নানা কাহিনি বিশ্বের মানুষের মুখে মুখে ফিরছে।

যেভাবে শুরু: ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের শুরুটা ইংল্যান্ডে, যা রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের শুরুর দিকে গ্রিক ও কার্থেজিয়ানরা ইংল্যান্ডে প্রথম আসার দাবি করেন। তবে ইতিহাসবেত্তারা বলছেন, প্রথম ইংল্যান্ড আবিষ্কৃত হয়েছিল জুলিয়াস সিজারের সময়। খ্রিস্টপূর্ব ৫৫ এবং ৫৪ সালের দিকে দুই বার অভিযান চালান তিনি। প্রতিবারই ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি সমস্ত সৈন্যও হারাতে হয়েছিল তাকে। পরবর্তী সময়ে আরেক রোমান যোদ্ধা আউলাস প্লাওটিয়াস ৪৩ সালের দিকে ইংল্যান্ড জয় করেন। তার হাত ধরেই ইংল্যান্ড রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।

৪১০ সালের দিকে ইংল্যান্ডে রোমান সাম্রাজ্যের অবসান হয়ে রাজতন্ত্র শুরু হয়। যার নেতৃত্ব ছিল অ্যাংলো-স্যাক্সনরা। এটা ছিল ‘হেপ্টারকি’ শাসনামল। এই শাসনব্যবস্থায় ইংল্যান্ডকে সাতটি স্বাধীন রাষ্ট্রে ভাগ করা হয়। এগুলো হলো—কিংডম অব নর্থামব্রিয়া, ওয়েসেক্স, মার্সিয়া, ইস্ট-অ্যাংলিয়া, এসেক্স, কেন্ট ও সাসেক্স। পরবর্তী ৪০০ বছর হেপ্টারকি শাসনব্যবস্থা চালু ছিল। এই সময়ে স্বাধীন সাত রাজ্যের রাজা পর্যায়ক্রমে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিলেন ওয়েসেক্সের রাজা এগবার্ট। তিনি ওয়েসেক্স ছাড়াও কেন্ট, সাসেক্স ও সারে নিয়ন্ত্রণ করতেন। তিনি তার ছেলে ইথেলওয়াফকে সারের দায়িত্ব দিয়ে তাকে উপরাজা বানান।

১০৬৬ সালে হেপ্টারকি ব্যবস্থার অবসান ঘটে। তখন উইলিয়াম দ্য কনকারার নিজেকে পুরো ইংল্যান্ডের একক রাজা হিসেবে ঘোষণা করেন। ইংল্যান্ডের ছোট ছোট রাজতন্ত্রগুলো উচ্ছেদ করে তিনি একক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। অবশ্য উইলিয়ামের আগে ইথেলওয়াফ ইংল্যান্ডে একক কর্তৃত্ব সৃষ্টি করেছিলেন। ৯২৭ সালে তাকে ইংল্যান্ডের প্রথম রাজা হিসেবে অন্য রাজারা মেনে নিয়েছিলেন। তার শাসনকাল ইংল্যান্ডের রাজনীতি ও ইতিহাসের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একসময় পুরো বিশ্বে যে সুবিশাল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ছিল, তার বীজ বপন করেছিলেন তিনি। ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ভিত্তি রচনার শেষ কাজটুকু করে নরম্যানরা। ১০৬৬ সালে নরম্যানরা ইংল্যান্ড জয় করলে উইলিয়াম দ্য কনকারার ইংল্যান্ডের একক রাজা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ইংল্যান্ড বিজয়ের পর তিনি সাতটি রাজ্য নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন, যা এখনো ইউনাইটেড কিংডম বা যুক্তরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত।

উইলিয়াম দ্য কনকারারের শাসনকালের ১০০ বছর পর ইংল্যান্ডের ক্ষমতায় আসে টুডররা। তার সময়ে ইংল্যান্ড, ওয়েলস এবং আয়ারল্যান্ডকে নিয়ে সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে। এরপর বিভিন্ন রাজ্যের রাজাদের মধ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজা হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এই প্রতিযোগিতা থেকেই স্কটল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমস ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজা হন, যিনি ষষ্ঠ জেমস নামেও পরিচিত। ১৭১৪ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য হ্যানোভারিয়ানদের অধীনে চলে যায়।

এর পাঁচ প্রজন্ম পর রানি ভিক্টোরিয়ার জন্ম হয়। তিনি ছিলেন স্যাক্সে কোবার্গ রাজপরিবারের প্রিন্সেস ভিক্টোরিয়া এবং ডিউক অব কেন্ট এডওয়ার্ডের মেয়ে। রানি ভিক্টোরিয়া তার চাচাতো ভাইকে বিয়ে করার ফলে হাউজ অব স্যাক্সে কোবার্থের সৃষ্টি হয়, যা ‘স্যাক্সে কোবার্থ গথা’ নামে পরিচিত। পরবর্তী সময়ে ১৯১৭ সালে জার্মানির সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর পর রাজা পঞ্চম জর্জ রাজপরিবারের নাম পরিবর্তন করে হাউজ অব উইন্ডসর রাখেন। ইংল্যান্ডের উইন্ডসর শহরের নামানুসারে এমন নামকরণ। বর্তমান ব্রিটিশ রাজপরিবারের সরকারি নামও হাউজ অব উইন্ডসর।

রূপকথার রাজা-রানির মতোই বর্ণিল বাস্তবের এই রাজপরিবারের ইতিহাস

ক্ষমতার পালাবদলের নিয়ম: ব্রিটিশ রাজপরিবারের কোনো রাজা বা রানি যদি মারা যান, তাহলে তার সন্তানের মধ্যে যিনি বড় তিনি ক্ষমতায় বসবেন। রাজা ষষ্ঠ জর্জের মৃত্যুর পর তার মেয়ে দ্বিতীয় এলিজাবেথ সিংহাসনে বসেন। এর আগে রাজা ষষ্ঠ জর্জ তার বাবা পঞ্চম জর্জের পর রাজা হন। এর আগে সিংহাসনে ছিলেন রাজা পঞ্চম জর্জের মা রানি ভিক্টোরিয়া। বাবা-মায়ের ছেলে সন্তান না থাকায় রানি ভিক্টোরিয়া ও দ্বিতীয় এলিজাবেথ সিংহাসনে বসতে পেরেছেন। কারণ আগে রাজপরিবারের নিয়মানুসারে—উত্তরসূরিদের মধ্যে যদি ছেলেসন্তান থাকে এবং সে যদি বয়সে মেয়েদের চেয়ে ছোটও হয়, এরপর তিনিই সিংহাসনে বসবেন! কিন্তু ২০১৫ সালে প্রিন্স উইলিয়ামের মেয়ে প্রিন্সেস শার্লোটের জন্মের পর এই আইনের পরিবর্তন করা হয়েছে। এর ফলে প্রিন্সেস শার্লোট তার ভাই প্রিন্স লুইসের আগে সিংহাসনে বসতে পারবেন, যদি তার তেমন সুযোগ হয়। বর্তমানে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের পর তার ছেলে চার্লস রাজা হয়েছেন। এরপরে সিংহাসনে বসতে পারবেন প্রিন্স উইলিয়াম। প্রিন্স উইলিয়ামের পরে সিংহাসনের দাবিদার তার ছেলে প্রিন্স জর্জ, প্রিন্সেস শার্লোট এবং প্রিন্স লুইস। সেই হিসেবে প্রিন্স হ্যারির ব্রিটিশ সিংহাসনে বসার কোনো সম্ভাবনা নেই।

Rajkahini

রাজপরিবারের আয়: ব্রিটিশ রাজপরিবারের জৌলুস দেখে তাদের যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে ধনী পরিবার মনে হতে পারে। কিন্তু রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সম্পদের মোট অর্থমূল্য ছিল ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। তিনি মূলত দুই ধরনের উত্স থেকে আয় করতেন। প্রথমত, রানি প্রতি বছর করদাতাদের থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি অংশ পেয়ে থাকেন। দ্বিতীয়ত, রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ বিভিন্ন ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে অর্থ আয় করে থাকেন। ল্যানচেস্টারে রানির জমিদারি রয়েছে। সেখান থেকে আয় করেন। কর্নওয়ালে রাজপরিবারের জমিদারি রয়েছে। ব্রিটিশ রাজপরিবারের যেসব সদস্য বিভিন্ন পূর্ণকালীন দায়িত্বে থাকেন, তারা অন্য কোনো উপায়ে অর্থ আয় করতে পারেন না। যদি তারা সেটি করতে চান, তাহলে তাদের রাজপরিবারের পদবি ত্যাগ করতে হবে।

ইত্তেফাক/এসটিএম