রোববার, ০২ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

গ্যাস-সংকটে ধীর শিল্পের চাকা, জ্বলে না ঘরের চুলা

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:৩৬

দেশে গ্যাস-সংকট কাটছে না বরং বাড়ছে। চাহিদার এক তৃতীয়াংশের বেশি গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। শিগিগরই দূর হচ্ছে না চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি। বিদ্যমান সংকটে শিল্প উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকে নেমে এসেছে। তিন পালার (শিফট) অনেক কারখানায় এখন চলছে এক পালা। দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাস না পেয়ে অনেক গৃহস্থালিতে রান্নার চুলা জ্বলছে না।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্রম মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে এ গ্যাস-সংকট সার্বিক অর্থনীতি এবং জনজীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ঘাটতি মেটাতে স্থানীয় গ্যাসের জোগান বৃদ্ধির উপায় শিগিগরই করা যাচ্ছে না। আবার নগদ অর্থের সংকটে বিদেশ থেকে গ্যাস (এলএনজি) আমদানি বাড়ানো যাচ্ছে না বরং কমছে। গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে এবং গার্মেন্টস-টেক্সটাইলসহ অধিকাংশ শিল্প কারখানায় উৎপাদন কমায় জাতীয় উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে শিল্প ও বাণিজ্য খাতে অনেকের কাজ হারানোর বা বেকারত্ব বৃদ্ধির শঙ্কা রয়েছে।

তিতাস, কর্ণফুলী এবং জালালাবাদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানি বলছে, পেট্রোবাংলার কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছে না তারা। তাই শিল্প, বিদ্যুৎ, আবাসিক বা বাণিজ্য কোনো শ্রেণির গ্রাহকদেরকেই চাহিদার সমান গ্যাস দেওয়া যাচ্ছে না। আর পেট্রোবাংলা বলছে, স্থানীয় বা বিদেশি কোনো উৎস থেকেই এখন পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের উপায় নেই। স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধান কূপ এবং উন্নয়ন কূপ খননের কাজ জোরদার করা হয়েছে। কিন্তু তার ফল এখনই আসবে না। বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম ও মার্কিন ডলারের দর বেড়ে যাওয়ায় এই তরলীকৃত গ্যাস আমদানিও আপাতত বাড়ানো যাচ্ছে না।

দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাস না পেয়ে অনেকেই মাটির চুলা কিংবা বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করছেন।

দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহে ঘাটতি প্রায় দেড় দশকের। চলতি বছর এই ঘাটতি আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। গত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির পর ঘাটতি কিছুটা কমতে শুরু করলেও চলতি সেপ্টেম্বরে তা ফের বেড়েছে। গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় ঢাকা মহানগর, সাভার, গাজীপুর, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকার বেশির ভাগ শিল্পকারখানা দিনের অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকছে। শিল্পকারখানার মালিক ও কর্মকর্তারা বলছেন, পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ ১৫ পিএসআই (প্রেশার পার স্কয়ার ইঞ্চি) থাকার কথা থাকলেও পাওয়া যাচ্ছে তিন-পাঁচ পিএসআই। এতে কারখানা চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। সক্ষমতা অনুসারে উৎপাদনে না থাকায় তারা আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, নিটিং কারখানাগুলোর সংকট চরম আকার নিয়েছে। ঠিক সময়ে পণ্য দিতে না পারার ঝুঁকিতে থাকা রপ্তানিকারকরা ক্রয়াদেশ বাতিলের আশঙ্কা করছেন। তারা বলছেন, গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান দরকার। আর এখনকার ঘাটতি দ্রুত মেটানো না গেলে অর্থনীতি ও বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এছাড়া রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, ধানমন্ডি, হাতিরপুল, পুরান ঢাকা, শ্যাওড়া, রামপুরা, যাত্রাবাড়ীসহ অনেক স্থানে বাসাবাড়িতে দিনের একটি বড় অংশে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও গ্যাস পাওয়া গেলেও তা সরবরাহ হচ্ছে ঢিমতালে। রান্নায় বিকল্প উপায় অর্থাৎ এলপিজি, কেরোসিনের চুলা ও বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহারে সীমিত আয়ের মানুষ ইতিমধ্যে হিমশিম খেতে শুরু করেছেন।

জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, দেশে বর্তমানে দৈনিক ৪৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে ২৫০ থেকে ২৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। গত দুই-তিন বছর ধরে দৈনিক ৪১০-৪৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার ৩১০-৩৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। চলতি বছরে এ সরবরাহ ৩০০ কোটি ঘনফুট ছুঁতে পারেনি। গত রবিবার ২৭৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়।

সাভার, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ এবং ময়মনসিংহের চারটি পৃথক কারখানার উদ্যোক্তা-কর্মকর্তারা জানান, তাদের কারাখানায় চাহিদার অর্ধেক বা এক তৃতীয়াংশ গ্যাস সরবরাহ পাচ্ছেন। তাই আগে যেখানে দিনে রাতে তিন শিফটে কর্মীরা কাজ করত এখন এক শিফটে কাজ চলে। এ পরিস্থিতি বেশি দিন চললে কারখানা চালু রাখা এবং কর্মীদের বেতন দেওয়া সম্ভব হবে না। বিদেশি ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ বাতিল হয়ে যাবে বা নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়া যাবে না।

গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে এবং গার্মেন্টস-টেক্সটাইলসহ অধিকাংশ শিল্প কারখানায় উৎপাদন কমায় জাতীয় উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে।

সাভারের আরেক ব্যবসায়ী জানান, তিনি তার দুইটি কারখানার একটি ইতিমধ্যে বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি জানান, এখন বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী এলপিজি দিয়ে তাদের কারখানা চালু রাখছে। কিন্তু এটি সবার জন্য উপযোগী না হওয়ায় এবং ব্যয়বহুল হওয়ায় সিংহ ভাগ কারখানাই এলপিজি ব্যবহার করতে পারবে না।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, শিল্প কারখানায় গ্যাস-সংকট অসহনীয় হয়ে উঠেছে। দিনে ছয় থেকে ১২ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হচ্ছে মিল। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অন্য সময়েও উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) মো. কামরুজ্জামান বলেন, গ্যাসের চাহিদা এবং সরবরাহে ঘাটতি আছে। সরবরাহ বৃদ্ধির চেষ্টা করছে সরকার। আগামী মাস থেকে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হবে। শীতের সময় বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা কমিয়ে শিল্পে বাড়ানো হবে। এছাড়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের পরিমাণ সামনে বাড়ছে। তখনও শিল্পে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে বলে আশা করি।

ইত্তেফাক/ইআ