বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ইউপি চেয়ারম্যানের প্রতারণার শিকার এমপি-ডিআইজিসহ ৩০০ মানুষ 

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৯:৩৭

অল্প টাকায় গাড়ি কিনে সেই গাড়ি ভাড়ায় খাঁটিয়ে মাসে ৭০ হাজার টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখাতেন তিনি। কম বিনিয়োগে বেশি টাকা আয়ের লোভে পরে অনেকেই নিজের সর্বস্ব বিনিয়োগ করেন সেখানে। প্রথম দুই-এক মাস প্রতিশ্রুত লাভের টাকা দিয়ে আস্থা অর্জন করলেও পরে আর টাকা দিতেন না। এভাবে প্রতারণা করে প্রায় ৩০০ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সংসদ সদস্য (এমপি), পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি), পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছেন। যার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ উঠেছে, তিনি হলেন কুমিল্লার মেঘনার মানিকাচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন (৪৩)। 

ঢাকার মুগদা থানার একটি মামলার সূত্র ধরে গতকাল বৃহস্পতিবার কুমিল্লার মেঘনা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাকে গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য জানিয়েছে ডিবি।

ঢাকা ট্রেড সেন্টারে নিজের একমাত্র উপার্জনের অবলম্বন দোকান ৩৫ লাখ টাকায় বিক্রি করে ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা গাড়ি কেনার জন্য বিনিয়োগ করেন মুন্সিগঞ্জের ভুক্তভোগী মো. সায়েম। চেয়ারম্যান জাকিরের সঙ্গে তার চুক্তি হয় মাসে ৭০ হাজার টাকা পাবেন। এক মাস পেয়েও ছিলেন, কিন্তু তারপর থেকেই মাসিক ভাড়ার টাকা আর পাননি। এরপর ঘুরে ঘুরে কিস্তি তো দূরের কথা, আসল টাকা কিংবা গাড়ি কোনোটাই ফেরত পাননি সায়েম। টাকার জন্য চাপ দিলে সাড়ে ৭ লাখ টাকার একটা চেক ধরিয়ে দেয় আমাকে। বাকি টাকা চাইলে মামলার হুমকি দেয়।’

একই গাড়ি প্রতারক জাকির ২৫ জন ক্রেতার কাছে বিক্রি করেছেন উল্লেখ করে আরেক ভুক্তভোগী সোহেল মোল্লা বলেন, ‘পুলিশ প্রশাসন ও কয়েকজন সংসদ সদস্যও এই জাকির চেয়ারম্যানের ক্লায়েন্ট। এসব মানুষ দেখেই আমরা সাধারণ মানুষ আস্থা নিয়ে তার সঙ্গে রেন্ট-এ-কার ব্যবসায় যুক্ত হয়েছিলাম।’

সোহেল মোল্লার মতো আরও অনেকেই মিন্টো রোডে এসেছেন। অন্তত পাঁচজন ভুক্তভোগী বলেন, ‘পুলিশের অনেক এসআই, ওসি দেখে আমরা আস্থা পাই। বেশি মুনাফার লোভে সেখানে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে গাড়ি কিনি। গাড়ি কেনার পর কয়েক দফায় কিছু টাকা পাই। বাকি টাকা আজকে দিচ্ছি, কালকে দিচ্ছি করে আর দেয় নাই ওই প্রতারক।’

শুক্রবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘অভিযুক্ত জাকির বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে গাড়ি কিনতে পুরো টাকা নিলেও সেটি ডাউন পেমেন্টে কিনতেন। ভাড়ায় খাটানোর কথা বলে চুক্তির পর কয়েক মাস ঠিকমতো অর্থ পরিশোধ করতেন তিনি। তবে কয়েক মাস পর থেকে তিনি টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিতেন। তাঁর প্রতারণার ফাঁদে পড়ে এভাবে অনেকেই ভুক্তভোগী হয়েছেন।

ডিবি জানায়, জাকির ২০০৮ সালে ঢাকায় এসে গাড়িচালনার প্রশিক্ষণ নেন। পরে তিনি ঢাকায় লেগুনা চালানো শুরু করেন। দুই বছর লেগুনা চালানোর পর তিনি একটি গাড়ি কেনেন। কুমিল্লায় তাঁর সঙ্গে পুলিশের এক কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠতা হয়। ওই কর্মকর্তা তাঁকে একটি গাড়ি কিনতে ভাড়া দেন। ধীরে ধীরে তাঁর সঙ্গে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের পরিচয় হয়। এই সখ্যের সূত্র ধরেই অল্প দামে গাড়ি কিনে ভাড়ায় খাটানোর প্রলোভনের ফাঁদে পান দেন অনেকেই। তাঁদের একটি বড় অংশ পুলিশ কর্মকর্তা। এ ছাড়া তিনজন এমপিও কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন।

ডিবি কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন ব্যক্তিকে ফাঁদে ফেলে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হন জাকির। কুমিল্লায় তিনতলা বিলাসবহুল বাড়ি তৈরি করেছেন। ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় জমি কিনেছেন। ঢাকায় তাঁর একাধিক ফ্ল্যাটও রয়েছে। সম্পদের মালিক হওয়ার পর তিনি কুমিল্লায় স্থানীয় পর্যায়ে যুবলীগের পদ বাগিয়ে নেন। একপর্যায়ে তিনি ইউপি চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হন।

ইত্তেফাক/এনএ