রোববার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আলোচনায় তিন ইউএনও

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৮:০১

পৃথক তিনটি ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনায় তিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। ফুটবল খেলার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দলকে ট্রফি বিতরণ না করে সবার সামনে ট্রফি আছড়ে ভেঙেছেন বান্দরবানের আলীকদমের ইউএনও মেহরুবা ইসলাম। এছাড়া বগুড়া সদরের ইউএনও সমর কুমার পালের বিরুদ্ধে এলজিইডির চতুর্থ শ্রেণির এক কর্মচারীকে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় এসএসসির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ইউএনও দীপক কুমার দেব শর্মাকে কারণ দর্শাও (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

  • টুর্নামেন্টের ট্রফি আছড়ে ভাঙলেন ইউএনও

ইত্তেফাকের আলীকদম সংবাদদাতা প্রশান্ত দে জানান, ফুটবল খেলার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে শুক্রবার খেলোয়াড় ও উপস্থিত জনতার সামনে চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দলের ট্রফি ভেঙে ফেলেন বান্দরবানের আলীকদমের ইউএনও মেহরুবা ইসলাম। ওইদিন সন্ধ্যার দিকে উপজেলার চৈক্ষ্যং আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে এ ঘটনা ঘটে। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে ইউএনওকে নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। এঘটনায় শুক্রবার বিকাল থেকে ফেসবুকে ইউএনওর বিরুদ্ধে স্থানীয়দের কেউ কেউ ক্ষোভ জানাচ্ছেন।

ট্রফি ভাঙার প্রতিবাদ জানিয়ে আলীকদম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কালাম শুক্রবার তার ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘ইউএনও মেহরুবা ইসলাম আলীকদমের জনগণকে অসম্মান করেছেন।’ তাকে আলীকদম থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি।

ইউএনওর প্রত্যাহার চেয়ে গতকাল শনিবার বিকালে আলীকদমে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। আলীকদম সেনানিবাস মোড়ে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কালাম বলেন, ‘ইউএনও কর্তৃক খেলার ট্রপি ভাঙ্গা ঠিক হয়নি। ইউএনও মানসিক ভারসাম্যহীন। তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যাহার করতে হবে। নইলে আলীকদম অচল হওয়ার আশঙ্কা আছে।’

 বান্দরবানের আলীকদমের ইউএনও মেহরুবা ইসলাম।

স্থানীয় লোকজন ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আলীকদম উপজেলার চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের মাংতাই হেডম্যান পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে ‘আবাসিক স্বাধীন যুব সমাজ’- এর উদ্যোগে ‘জুনিয়র একাদশ’ বনাম ‘রেপারপাড়া বাজার একাদশ’ ফুটবল টিমের শুক্রবার ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হয়। এতে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ইউএনও মেহরুবা ইসলাম। 

খেলা শেষে পুরস্কার বিতরণের আগে ইউএনও মেহরুবা ইসলাম বক্তব্য রাখেন। এসময় তিনি বলেন, ‘খেলায় হার-জিত থাকবে। এতে কারো মন খারাপের কারণ নেই।’ উপস্থিত জনসাধারণের কাছে খেলার ফলাফলে সন্তুষ্ট কিনা জানতে চাইলে কয়েকজন খেলার ‘ফলাফল মানি না’ বলাতে ইউএনও ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ‘আপনারা যতদিন পর্যন্ত সহনশীল না হতে পারবেন, ততদিন ট্রফিগুলো আমানত হিসেবে থাকবে। আরেকটি ম্যাচ হলে তারপর  দেব।’ এরপর তিনি খেলার চ্যাম্পিয়ন এবং রানার্সআপ কাপ (ট্রফি) ভেঙে ফেলেন। এ সংক্রান্ত ভাইরাল হওয়া ভিডিওতেও ইউএনও-কে ট্রফি উপরে তুলে টেবিলে আছাড় মারতে দেখা যায়।

ইউএনওর বক্তব্যের সময় উপস্থিত সবাই ‘না না’ বলতে থাকেন। এরপর ‘যদি ট্রফি না থাকত, আমরা  খেলতাম না? ...আমি ট্রফিটা ভেঙে এখন খেলা শুরু করব’ বলেই ট্রফি দুটি আছড়ে ভেঙে ফেলেন তিনি।

এব্যাপারে ইউএনও মেহেরুবা ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘খেলা শেষে পুরস্কার বিতরণের সময় হঠাৎ একজন এসে বললেন যে, তিন গোল চার গোল তারা মানে না। তখন আমি বললাম, খেলা আবার হবে কিনা। তখন এটা নিয়ে পেছন থেকে খুব আওয়াজ শুরু হলো। কয়েকজন বললো তারা ট্রফি নেবে না, এ ট্রফি যতদিন থাকবে একটা আক্রোশ থাকবে। তারা বলল, ট্রফি ভেঙে ফেলা হোক। পরে আমি বললাম, তাহলে ঠিক আছে আপনারা মেডেলগুলো নিয়ে যান।’

বান্দরবানের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ইয়াসমিন পারভীন তিবরীজি সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনাটি দুঃখজনক। এরকম আচরণ করার কথা নয়। বিতর্ক থাকলে ট্রফি না ভেঙে নিজের হেফাজতে রেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারতেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

  • এলজিইডির নৈশপ্রহরীকে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দিলেন বগুড়া সদরের ইউএনও

বগুড়া সদরের ইউএনও সমর কুমার পালের বিরুদ্ধে এলজিইডির চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নৈশপ্রহরী আলমগীর হোসেন শেখকে (৪৫) পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেই সঙ্গে পেটানোর পর ওই কর্মচারীকে গলা ধাক্কা দিয়ে উপজেলা পরিষদ থেকে বের করে দেন বলে জানা গেছে। এসময় উপজেলা প্রকৌশলী মাহবুবুল হকও সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে ভুক্তভোগী জানিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকে বগুড়া সদর উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সে তাকে মারধরের এ ঘটনা ঘটে। রাত সাড়ে আটটার দিকে আলমগীরকে উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় উদ্ধার করে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আলমগীরের বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলায়।

এদিকে ইউএনওর বিরুদ্ধে কর্মচারীকে মারধরের অভিযোগ তদন্তে শুক্রবার কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) সালাহউদ্দিন আহমেদকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। তবে কমিটিকে কোনো সময় বেঁধে দেওয়া হয়নি।

বগুড়া সদরের ইউএনও সমর কুমার পাল

হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আলমগীর হোসেন সাংবাদিকদের জানান, পারিবারিক বিষয় নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে তার ঝগড়া হয়। এর জের ধরে ইউএনওর কাছে তার স্ত্রী মৌখিক অভিযোগ করে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাত্রিকালীন ডিউটি পালন করতে গেলে ইউএনও আনসার সদস্যদের ডেকে বলেন, ‘এই ব্যাটা আনসার, ওকে ধরে নিয়ে আয়।’ আলমগীর বলেন, “এরপর আনসাররা আমাকে ধরে নিয়ে গেল। আনসাররা মোটা লাঠি নিয়ে গেল। দোতলায় ইউএনও কার্যালয়ের অন্ধকার কক্ষে আমাকে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। আমি ইউএনওকে বললাম, ‘স্যার, আমি কিছু করিনি, আমি আপনার স্টাফ, আমার মেয়ে-জামাই আসুক, চেয়ারম্যান আসুক।’ ইউএনও স্যার গালি দিয়ে বললেন, ‘তুই আমাকে চিনিস, তোর বউ এসে কমপ্লেন দেয়। এরপর ইউএনও স্যারের বডিগার্ড ও আনসার সদস্য আমার হাত ধরে থাকেন। ইউএনও স্যার লাঠি দিয়ে পেটাতে শুরু করেন। কাকুতি-মিনতি করলাম, স্যার, আপনার পায়ে ধরি। কোনো কিছু শুনলেন না। মেঝেতে ফেলে গরুর মত পেটালেন। হাত-পা  ভেঙে দেওয়ার পর আমার অফিসের ইঞ্জিনিয়ার স্যার এসে চাবি কেড়ে নিলেন। এরপর দুজন অটোচালককে  ডেকে আমাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে উপজেলা পরিষদের বাইরে ফেলে দিতে বললেন। মসজিদের সামনে গিয়ে জ্ঞান হারাই।”

এ বিষয়ে ইউএনও সমর কুমার পাল বলেন, ‘এলজিইডির নৈশপ্রহরী আলমগীর স্ত্রীকে নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে পরিষদের ভেতরে রাত যাপন করেন। নানা ঝামেলা করেন। পরিষদের পরিবেশ নষ্ট করে ফেলেছেন। বৃহস্পতিবার স্ত্রীকে অসুস্থ অবস্থায় পরিষদের বারান্দায় ফেলে তিনি পালিয়ে যান। পরে তার স্ত্রীকে উদ্ধার করে মেয়ের বাড়িতে পাঠানো হয়। বৃহস্পতিবার বিকালে আলমগীর উপজেলা পরিষদে এলে তাকে ডাকেন। উল্টাপাল্টা কথা বলায় তাকে বের করে দিয়েছেন। বের করে দেওয়ার পর কারও ইন্ধনে নাটক করছেন আলমগীর।’ মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে ইউএনও বলেন, ‘এটার পেছনে একটা গ্যাং আছে। ইউএনওকে বিতর্কিত করার জন্য কিছু লোক আছে, তারা সুযোগ নিচ্ছে এবং তাকে দিয়েই এটা করাচ্ছে।’

  • এসএসসির প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ভূরুঙ্গামারীর ইউএনওকে কারণ দর্শানোর নোটিশ

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় এসএসসির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ইউএনও দীপক কুমার দেব শর্মাকে কারণ দর্শাও নোটিশ দেওয়া হয়েছে। গত বুধবার করা শোকজে তিন কর্মদিবসের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে।

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর ইউএনও দীপক কুমার দেব শর্মা।

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, বিধি মোতাবেক ইউএনও পরীক্ষার ব্যাপারে চিঠি ইস্যু করেছেন। তারপরও কোনো গাফিলতি আছে কি-না, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ওই ঘটনায় ইউএনওর কাছে জবাব চাওয়া হয়েছে। জবাব পেলে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।

 

ইত্তেফাক/ইআ