রোববার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

রহিমা বেগমকে উদ্ধার: স্বস্তি ফিরেছে গ্রেফতার হওয়া ৬ পরিবারে

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৮:২৯

খুলনার নিখোঁজ রহিমা বেগমকে পুলিশ ফরিদপুরের বোয়ালমারী থেকে সুস্থ শরীরে উদ্ধার করার পর স্বস্তি ফিরে এসেছে রহিমা বেগমের মেয়ের দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার হওয়াদের ৬ পরিবারের মধ্যে। 

তারা দাবি করছেন, রহিমা বেগমের আত্মগোপন ছিল পুরোটাই নাটক। তাদের হেনস্থার জন্যই রহিমা বেগম স্বেচ্ছায় আত্মগোপন করেছিলেন। রহিমা বেগমের এই আত্মগোপনের পেছনে তার ছয় সন্তানদেরও ইন্ধন রয়েছে। বিশেষ করে তার মেয়ে মরিয়ম মান্নান, মাহমুদা আক্তার ও ছেলে মিরাজ ওরফে মো. সাদী। 

প্রতিবেশীদের দাবি, রহিমা বেগম এবং তার মেয়ে মরিয়ম মান্নান, মাহমুদা আক্তার ও ছেলে সাদী ভীষণ উচ্ছৃঙ্খল। এলাকায় তারা মামলাবাজ হিসেবে পরিচিত।

রবিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে নগরীর সোনাডাঙ্গা থানার ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার থেকে রহিমা বেগমকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কার্যালয়ে নেওয়া হয়। 

রহিমা বেগম।

সেখানে পিবিআই’র পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা রহিমা বেগমকে সুস্থভাবে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সৈয়দপুর গ্রাম থেকে উদ্ধার করেছি। তিনি ভালো আছেন। আমরা তাকে নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছি। এরপর তার পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে কথা বলবো। তারপর অধিকতর তদন্ত শেষ বলতে পারবো তিনি কী স্বেচ্ছায় চলে গিয়েছিলেন না; এর সঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্যরা জড়িত কিনা অথবা এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা আছে কিনা।’

দুপুর ১টার একটু আগে পিবিআই কার্যালয়ে আসেন মরিয়ম মান্নানসহ তারা তিন বোন। তিনি তাৎক্ষণিক সাংবাদিকদের বলেন, আমার মাকে সুস্থ অবস্থায় ফিরে পেয়েছি এটাই বড় কথা। এই ঘটনায় নিরাপরাধী অন্যদের নামে কেন মামলা দেওয়া হলো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ওরা আমাদের পরিবারকে বিভিন্ন সময়ে হুমকি দিয়েছে, নির্যাতন করেছে সেই সন্দেহের জায়গা থেকে তাদের নামে মামলা করা হয়েছে।’

রবিবার সকালে নগরীর কুয়েট রোডের মহেশ্বরপাশা উত্তর বণিকপাড়ার খামারবাড়ি এলাকার ৩৫ নম্বর রহিমা বেগমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দুইতলা একটি বাড়ি। গেট পেরিয়ে ইট ইট বিছানো পথে বাড়ির ভেতর গেলে দেখা যায়, বাড়ির নিচ তলায় দু’টি পরিবার ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন।

রহিমা বেগমের ছবি হাতে মেয়ে মরিয়ম মান্নান।

রহিমা বেগমের বাড়ির ভাড়াটিয়া মুজিবর রহমান হাওলাদার বলেন, প্রতিবেশী কারও সঙ্গেই রহিমা বেগমের পরিবারের সদস্যদের কোনো সম্পর্ক নেই। রহিমা বেগমের মেয়ে মরিয়ম মান্নান ভীষণ উগ্র প্রকৃতির। তার অত্যাচারে এলাকার মানুষ টিকতে পারছে না। কথায় কথায় সে লোকজনকে মামলা দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়।

ঐ বাড়ির ভাড়াটিয়া আকলিমা বেগম জানান, রহিমা বেগম এ বাড়িতে থাকেন না। তিনি তার দুই মেয়ে ও ছেলেকে নিয়ে নগরীর বয়রা এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করেন। তবে মাসে এক-দুদিন তার বর্তমান স্বামী বেল্লাল ঘটক নিয়ে এসে থেকে যান। ২৭ অক্টোবর যে দিন রহিমা বেগম নিখোঁজ হয়েছিলেন, তার আগের দিনও তিনি বেল্লাল ঘটককে নিয়ে এ বাড়িতে এসেছিলেন। পরের দিন ছিল শনিবার। ঐ দিন রাত ১১টার দিকে দুইতলা থেকে নেমে এসে বেল্লাল ঘটক আমাদের কাছে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তোমরা রহিমাকে দেখেছ কিনা।’ এরপর অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া যায়নি। বেল্লাল ঘটকই প্রথম সবাইকে জানিয়েছে, রহিমা বেগম নিখোঁজ হয়েছে।

তিনি বলেন, রহিমা বেগম নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই আমরা খুব আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম। পুলিশ এসে শুধু আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। আমার ভাই মনির হাওলাদারকে পুলিশ ধরে নিয়ে দুই দিন জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। একমাস ধরে আমরা খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিলাম। 

রহিমা বেগমের নিখোঁজ হওয়ার পর তার মেয়ে আদূরীর দৌলতপুর থানায় দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার হয়ে গত ৪ সেপ্টেম্বর থেকে খুলনা কারাগারে বন্দি রয়েছেন প্রতিবেশী মো. মহিউদ্দীন তার ভাই গোলাম কিবরিয়া এবং আরেক প্রতিবেশী নূর আলম জুয়েল।

গোলাম কিবরিয়ার স্ত্রী আয়েশা বলেন, রহিমা বেগমের সতীনের কাছ থেকে তাদের বাড়ির ২ কাঠা জমি একজন মহুরি কেনেন। সেই মহুরির কাছ থেকে আমার স্বামী গোলাম কিবরিয়া কিনে নেন। এরপর থেকেই রহিমা বেগম ও তার ছেলে-মেয়েরা আমাদের মিথ্যা মামলাসহ বিভিন্নভাবে হয়রানি করে আসছেন। তাদের হয়রানির শিকার প্রতিবেশী সকলেই। তাদের সবাইকে এলাকার লোকজন মামলাবাজ হিসেবে চেনে। ভয়ে তাদের সঙ্গে এলাকার কেউ কথা বলে না। 

তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমার স্বামী ও ভাসুরকে মিথ্যা মামলা দিয়ে ফাঁসানো হয়েছে। আমাদের সমাজের কাছে ছোট করা হয়েছে। আমরা রহিমা বেগম এবং তার মেয়ে মরিয়ম মান্নান, ছেলে মিরাজসহ এ ঘটনার পেছনে যারা জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। আর যারা মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার হয়েছে অবিলম্বে তাদের মুক্তি চাই।

রহিমা বেগম।

রহিমা বেগমের মেয়ে আদুরীর মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে বন্দি নূর আলম জুয়েলের স্ত্রী সুমি বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, রহিমা বেগমের পরিবারের সদস্য খুব উচ্ছৃঙ্খল। এর আগেও রহিমা বেগম নিজের হাত নিজে কেটে আমাদের নামে মামলা দিয়েছে। এবার নিজে আত্মগোপন করে তার মেয়েকে দিয়ে আমার স্বামীর নামে মিথ্যা মামলা করেছেন। এখন আমার স্বামী কারাগারে বন্দি। আমার এক ও দুই বছরের সন্তান তার বাবার জন্য কান্নাকাটি করছে। আমরা রহিমা বেগম ও তার মেয়ে মরিয়ম মান্নানের কঠোর শাস্তি চাই। কেন, তারা আমাদের নামে মিথ্যা অপবাদ দিলো। 

মো. আওরঙ্গজেব খান দুলু, মৌসুমী আক্তার রহিমাসহ রহিমা বেগমের প্রতিবেশীরা জানান, রহিমা বেগম ও তার ছেলে-মেয়েরা এলাকায় মামলাবাজ বলে পরিচিত। তারা সবাই উচ্ছৃখল, কেউ তাদের ভালো বলে না। তারা এলাকাকে জর্জরিত করে দিয়েছে।

এলাকাবাসীরা জানায়, রহিমা বেগমের প্রথম স্বামীর নাম মান্নান হাওলাদার। বাড়ির কাছে ফুলবাড়ি গেটে তিনি কবিরাজী করতেন। এই স্বামীর পক্ষে পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। প্রথম স্বামী মারা যাওয়ার পর বেল্লাল ঘটক রহিমা বেগমের এক মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেন। এরপর রহিমা বেগমের সঙ্গে তার ঘনিষ্টতা হয়। তিন-চার বছর আগে এই বেল্লাল ঘটককেই রহিমা বেগম আবার বিয়ে করেন।

গত ২৭ আগস্ট রাত আনুমানিক ১০টার দিকে খুলনা মহানগরীর মহেশ্বরপাশার উত্তর বণিকপাড়ার নিজ বাসা থেকে টিউবওয়েলে পানি আনতে নিয়ে নিখোঁজ হন রহিমা বেগম। এরপর আর ঘরে ফেরেননি তিনি। স্বামী ও ভাড়াটিয়ারা নলকূপের পাশে ঝোপঝাড়ে তার ব্যবহৃত ওড়না, স্যান্ডেল ও বালতি দেখতে পান। সেই রাতে মাকে খুঁজতে আত্মীয়-স্বজন, আশপাশসহ সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ করেন সন্তানরা।

ইত্তেফাক/এএএম