শনিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২২, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

৩ বছরেও অজানা হত্যার কারণ-খুনির পরিচয়

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৯:৩৭

কক্সবাজারের উখিয়ার আলোচিত ফোর মার্ডারের ৩ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৯ সালের এই দিনে (২৬ সেপ্টেম্বর) উখিয়ার রত্নাপালং ইউনিয়নে ১নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব রত্নাপালং বড়ুয়া পাড়ায় খুন হন শাশুড়ি, বৌ, ছেলে ও ভাইয়ের মেয়ে। হত্যার তিন বছরে দুদফা তদন্তকারী সংস্থা ৫ বার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হলেও জানা যায়নি কে বা কারা, কেনই বা খুন করেছে। তবে, একদিন প্রকৃত খুনিদের চেহারা উন্মোচিত হবে এ বিশ্বাসে এখনো প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন নিহতের স্বজনরা।

সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৮টায় রত্নপালং বড়ুয়াপাড়ার রুকেন বড়ুয়ার (নিহতদের বসত বাড়ি) দালান বাড়ির পূর্ব পাশের উত্তরের কক্ষ থেকে রুকেন বড়ুয়ার মা সুখি বড়ুয়া (৭০) ও পশ্চিম পাশের উত্তর কক্ষ থেকে স্ত্রী মিলা বড়ুয়া (২৫) এবং একই পাশের মধ্যম কক্ষ থেকে ছেলে রবিন বড়ুয়া (৫) ও ভাইঝি সনি বড়ুয়ার (৬) গলাকাটা মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় পুলিশ ছাদ থেকে নিচে নেমে মৃতদেহগুলো উদ্ধার করে। ওই ঘটনায় নিহত মিলা বড়ুয়ার বাবা শশাস্ক বড়ুয়া সেদিন রাতেই উখিয়া একটি হত্যা মামলা দায়ের করে (নম্বর-৪৭/১৯)। এরপর উখিয়া থানার এক এসআই, পরিদর্শক (তদন্ত), তারপর পিবিআইয়ের দুই পরিদর্শক এবং এক পুলিশ সুপার মামলাটি তদন্ত করছেন। কিন্তু এখনো হত্যাকারীকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।

এবিষয়ে উখিয়া আদালতে সাধারণ নিবন্ধ অফিসার (জিআরও) এএসআই আল আমিন বলেন, ‘তিন বছরে ওই মামলার তেমন অগ্রগতি নেই। মামলাটি অগ্রগতি বলতে শুধু এজাহার। তদন্ত কর্মকর্তা কয়েকবার আবেদন করে রিমান্ড আবেদন, রক্ত সংগ্রহ, ৯ জনের সন্দেহভাজনের ডিএন পরীক্ষা করেছেন। এর বাইরে ১৪ বার ধার্য তারিখ ছিল। করোনার কারণে মামলাটি আদালতের কার্যক্রম কিছুদিন বন্ধ ছিল নতুবা আরো নতুন তারিখ যোগ হতো। ৯ জনের ডিএনএ রিপোর্ট আদালতে জমা থাকলেও তাদের সাথে আলামত থেকে সংগ্রহ কৃত ডিএনএর মিল নেই। এই মামলার পরবর্তী শুনানি তারিখ ২৮ নভেম্বর।’

এজাহার মতে, খুনের ঘটনার রাতে ২৫ সেপ্টেম্বর রাত ৯টা ১৭ মিনিটে নিহত মিলা বড়ুয়া তার বাবা শশাঙ্ক বড়ুয়ার সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেছিলেন।

এবিষয়ে শশাঙ্ক বড়ুয়া বলেন, ‘আমার সঙ্গে মেয়ে পারিবারিক বিষয়ে কিছু কথা বলেছিল। এসময় তার মধ্যে কোনো ধরনের ভীতি দেখা যায়নি। তাই আমার ধারনা ২৫ সেপ্টেম্বর রাত ৯টা ১৭ মিনিটের পর থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর ভোর ৬ টার মধ্যে যেকোন সময়ে ফোর মার্ডারের ঘটনা ঘটেছে।’

সুরতাহাল প্রতিবেদন তৈরিকারী ও মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা উখিয়া থানার তৎকালীন এসআই মো. ফারুক হোসেন বলেন, ‘এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ভবনটির দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। খুনী খুন করার পর  সিঁড়ি বেয়ে দোতলার ছাদে উঠে তারপর সেখান থেকে গাছ বেয়ে পালিয়ে যায়। আমরাও ঘটনার দিন ছাদ থেকে নিচে নেমেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘মিলা বড়ুয়ার ব্যবহৃত পেটিকোট, যৌনরস, নখের অগ্রভাগ, জিন্স প্যান্ট, আকিজ বিড়ির খোসা, টেবিলের ওপর থাকা কাটা আপেলের অর্ধেক, ১টি ছুরি, গেঞ্জি, রক্তমাখা প্লাস্টিকের প্যাকেট, প্লাস্টিকের কভার আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়। তবে মামলাটি চাঞ্চল্যকর হওয়ায় ঘটনার কয়েকদিন পরেই এর তদন্তের দায়িত্ব নেন উখিয়া থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) নুরুল ইসলাম মজুমদার।’

এবিষয়ে নুরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, ‘২০১৯ সালের ৯ অক্টোবর ওই হত্যার সাথে জড়িত সন্দেহে নিহতের প্রতিবেশী উজ্জল বড়ুয়া ও রিপু বড়ুয়া নামের দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়। ১৬ অক্টোবর তাদের ১ দিনের রিমান্ডে আনি। এরপর ১২ ডিসেম্বর পরকীয়ার গুঞ্জন শুনে এবং নিহত মিলা বড়ুয়ার স্বামীর জিডির প্রেক্ষিতে তাঁর দুলাভাই অসীম বড়ুয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৬ ডিসেম্বর তাকে ১ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য আদালতকে অবহিত করা হয়েছে।’  

এদিকে চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডটির বিষয়ে পুলিশের অগ্রগতি তেমন না হওয়ায় পরে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) হস্তান্তর করা হয়। এরপর এটি তদন্তভার পান পিবিআই ইনস্পেক্টর পুলক বড়ুয়া। তিনি ধৃত আসামীদের জেলগেইটে ফের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। বাদী, নিহতের আত্নীয়স্বজন, নিহত মিলা বড়ুয়া স্বামী রুকেন বড়ুয়াসহ অনেকের সঙ্গে কথা বলেন। জব্দ কৃত আলামতগুলো ফরেনসিক ও ডিএনএ  প্রতিবেদনের জন্য প্রেরণ করা হয়। এরপর তিনি বদলী হয়ে গেলে এর দায়িত্ব পান একই সংস্থার আরেক ইন্সপেক্টর ক্যশৈনু।

এবিষয়ে ইন্সপেক্টর ক্যশৈনু বলেন, ‘আমি অনেকদিন আগে কক্সবাজার থেকে চলে এসেছি। বর্তমানে কি অবস্থা জানি না। তবে আমি ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা থাকার সময় নিহতের পরিবারের দাবী ও আমার প্রাথমিক তদন্তে সন্দেহের তালিকায় থাকা ৯ জনের রক্তের নমুনা ডিএনএ সংগ্রহ করি। কিন্তু ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহকৃত আলামতের ডিএনএ রিপোর্টের সাথে কারো রিপোর্ট মিলেনি।’

আদালত থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, তদন্ত কর্মকর্তাদের তিনদফায় ভিন্ন আবেদনের প্রেক্ষিতে, উজ্জল বড়ুয়া, রিপু বড়ুয়া, নিহত মিলা বড়ুয়ার দুলাভাই অসীম বড়ুয়া, অন্তর বড়ুয়া, অসীম বড়ুয়া, বাবুল বড়ুয়া, আনন্দ বড়ুয়া নিতু, ভাগ্যধন বড়ুয়া ও সোমান্দ বড়ুয়া প্রকাশ টমটম চালক লুধা বড়ুয়ার ডিএন এ পরীক্ষা করা হয়। পরে ২০২১ সালেরর ২ মার্চ জাতীয় ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির এসআই মো. মাসুদ রাব্বি সবুজ স্বাক্ষরিত ওই ৯ জনসহ আলামতের ডিএনএ প্রতিবেদন আদালতে জমা হয়।

নিহত মিলা বড়ুয়ার স্বামী রুকেন বড়ুয়া বলেন, ‘ঘটনার তিন বছর হয়ে গেলেও এখনো আমি জানতে পারিনি আমার মা, বৌ, সন্তান ও ভাইঝিকে কে বা কারা খুন করেছে। কেনই বা খুন করেছে। আমি তদন্ত সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এলাকায় চোর, ডাকাতের উপদ্রব বেশি। ঘটনার দিন আমার বসত বাড়ি থেকে একটি স্বর্ণের চেইন দুই জোড়া কানের দোলসহ প্রায় ৭০ হাজার টাকার মালামাল লুট হয়েছে। সেদিন বাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকায় আমার মায়ের কক্ষের টর্চ লাইটটি জ্বলছিল। বয়স্ক মানুষ সারারাত হয়ত টর্চের আলো এদিক সেদিক মারছিল। একারণে খুনিরা আমার মায়ের চোখে লাথি মারে। মৃত্যুর সময় তার চোখ কালো এবং ফোলা ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি আবার বিয়ে করেছি বছর দেড়েক আগে। এ ঘরে একজন ছেলে সন্তান আছে। ফেলে আসা অতীতকে ভুলতে বিয়ে করলেও আমাকে সেই খুনের ঘটনা এখনো তাড়িয়ে বেড়ায়। আমি খুনীদের চেহারাটা দেখতে চাই। জানতে চাই কি অন্যায় করেছিল আমার মা, আমার ছেলে, আমার বৌ এবং আমার ভাইঝি। জানি না আমার এই আশা পূরণ হবে কিনা।’

পিবিআই কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার মো. সরওয়ার আলম বলেন, ‘এটি একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা। এর তদন্তের দায়িত্ব আমি নিজে পালন করছি। আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এটি সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছেন। এটি নিয়ে কথা বলার সময় এখনো আসেনি।’

ইত্তেফাক/এইচএম