রোববার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে অনিয়ম 

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২:৩০

একজন শিক্ষকের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন থাকে ‘এমপিওভুক্ত’ হওয়া। আর সেই শিক্ষকরাই স্বেচ্ছায় এমপিও প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন। অথচ ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের এক তদন্তে মিলছে ভিন্ন তথ্য। 

তদন্তে দেখা গেছে, শিক্ষকদের ‘জোরপূর্বক’ এমপিও প্রত্যাহারে সই নেওয়া হয়েছে। স্বাক্ষর নেওয়ার সময় জোর করার পাশাপাশি নানা কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করা হয়েছে। দেওয়া হয়েছে নানা প্রলোভনও। স্থানীয় সংসদ সদস্যের ভয়ে শিক্ষকরা প্রতিবাদ না করে স্বেচ্ছায় স্বাক্ষর করেছেন। আর এই আবেদনের কপি জমা দেওয়া হয়েছে শিক্ষা অধিদপ্তরে। এমপিও প্রত্যাহার হয়েছে এমন একজন তথ্য দিয়েছে, টানা ছয় বছর ধরে তাকে টাকা তুলতে দেওয়া হয়নি। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন এই তদন্ত করেন। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার নির্দেশনার আলোকে তিনি এ তদন্তকাজ পরিচালনা করেন। 

তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮৩ সালে এমপিওভুক্ত হয়। ঐ সময়ে ৪৫ জন শিক্ষক কর্মচারী এমপিওভুক্ত হন। এর পরে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। তদন্তে উঠে আসে, শিক্ষক-কর্মচারীরা ২০১৫ সালের ১৫ জুন পর্যন্ত নিয়মিত এমপিওর অংশ পান। এরপর ২০১৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত এমপিওর অংশ পান না। এরপর শুধু এপ্রিল মাসে এই ভাতা পান। এরপর থেকে এই এমপিওর অংশ আর পাননি শিক্ষকরা। স্কুল কর্তৃপক্ষ বলছে, শিক্ষকরা স্বেচ্ছায় এমপিও প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন। এ কারণে আর টাকা নেন না শিক্ষক-কর্মচারীরা। তবে তদন্তে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য। শিক্ষকরা তদন্ত কমিটির কাছে বলেছেন, তাদের বেতনের এমপিও অংশ প্রদান না করায় অন্যান্য চাপে ও চাকরি রক্ষার্থে এবং আর্থিক সুযোগ-সুবিধা প্রদানে প্রতিষ্ঠানের আশ্বাসের ভিত্তিতে বাধ্য হয়েই এমপিও প্রত্যাহারে সম্মত হন তারা। এমপিওভুক্ত ৪৪ জন শিক্ষক একই মত দিয়েছেন। তারা তাদের এমপিও ফিরে পেতে সরকারের কাছে আকুতি জানিয়েছেন। 

এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ২০১৬ সালে এমপিও প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিলেও সরকার তা গ্রহণ করেনি। সরকারের খাতায় প্রতিষ্ঠানটি এখনো এমপিওভুক্ত। এজন্য এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বাবদ প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ টাকা দিচ্ছে সরকার। টাকা তুলতে না দেওয়ায় সেই টাকা আবার ফেরত যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এমপিও প্রত্যাহারের আবেদনের পর প্রতিষ্ঠানটিকে একটি ট্রাস্টের অধীনে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এজন্য গভর্নিং বডির বর্তমান সভাপতি রাশেদা আখতারকে চেয়ারম্যান এবং অধ্যক্ষকে সদস্যসচিব করে ৯ সদস্যের ‘মনিপুর উচ্চমাধ্যমিক ও কলেজ ট্রাস্টি’ বোর্ডের বিষয়ে সরকারের রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস থেকে রেজিস্ট্রারও করা হয়েছে। তবে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড এর অনুমোদন দেয়নি।

তদন্ত কমিটির কাছে ফরহাদ হোসেন জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটির পাঁচটি ক্যাম্পাসের ৭৩৯ জন শিক্ষক রয়েছেন। এর মধ্যে মাত্র ৬৯ জন এমপিওভুক্ত। অধিকাংশ শিক্ষক- কর্মচারীর এমপিও না থাকায় বাড়িভাড়া, মেডিক্যাল ভাতা ও উৎসব ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সঙ্গে তাদের বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। এতে শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ বিরাজ করছে। এ কারণে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে এমপিও প্রত্যাহার হয়। এমপিও প্রত্যাহারে বাধ্য হয়ে স্বাক্ষর করা শিক্ষকরা জানিয়েছেন, স্বাক্ষর করা না হলে আমাদের চাকরিচুত করা হবে এবং মামলা দিয়ে হয়রানি করা হবে। চাকরি রক্ষার্থে আমাদের কাছে এর বিকল্প কিছু ছিল না। 

তারা জানান, সবাইকে একই ধরনের লেখা কাগজ সামনে দিয়ে বলা হয়, ‘স্বাক্ষর করো, নইলে চাকরি হারাবে, মামলা খাবে।’ এছাড়া এমপিও প্রত্যাহার হলে বাড়তি বেতন বোনাস দেওয়া হবে। ‘ফরহাদ হোসেনের অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ অবৈধ’—ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের  তদন্তেও এটি প্রমাণিত হয়েছে। তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়, ২০২৩ সালের জুন মাস পর্যন্ত ফরহাদ হোসেনের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। যা বিধি অনুযায়ী হয়নি। এ বিষয়ে ফরহাদ হোসেনের বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে মোবাইলে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার বলেন, বিষয়টি আগামী দুই-এক দিনের মধ্যেই মাউশিতে পাঠাব। মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ বলেন, বিধি অনুযায়ী নিয়োগ না পেলে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সিদ্ধান্তের জন্য বিষয়টি প্রয়োজনে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।  

ইত্তেফাক/ইআ