রোববার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

জন্মদিনে শেখ হাসিনাকে দু’ফোঁটা চোখের জল 

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৭:২৬

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে জন্মদিনের সশ্রদ্ধ শুভেচ্ছা জানাই। মনে পড়ে, হাই স্কুলে পা দিয়েই ‘জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো’ শ্লোগানটি কণ্ঠে তুলে নিয়েছিলাম। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে প্রথম দেখি। আমাদের স্টেশনে রেলগাড়ির দরোজায় হ্যান্ড-মাইকে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। বই-খাতা হাতে সেই ট্রেনে উঠে পড়ি এবং সেদিনই দুপুরে জগন্নাথগঞ্জ ঘাটে সুউচ্চ মঞ্চে গাঁদা ফুলের মালায় আচ্ছাদিত বঙ্গবন্ধুকে আবার দেখি। যমুনা নদীতে স্টিমারে করে তাঁর চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখি। 

১৯৭৩ সালে ছাত্রলীগের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনি, ‘ছাত্রলীগের ইতিহাস, বাঙালির ইতিহাস’। তারপর একটি সাদা গাড়িতে করে চলে যাওয়ার সময় হাস্যোজ্জ্বল বঙ্গবন্ধুকে শেষবার দেখি! বাঙালির ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! ১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশ নিপতিত হয় গভীর অন্ধকারে। বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ধারায় ফিরিয়ে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধকে চিরতরে ধ্বংস করা। বিদেশে অবস্থান করায় সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুইকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে আমি প্রথম দেখি ১৯৮১ সালের ১৭ মে ঢাকা বিমানবন্দরে; আনন্দে-অশ্রুতে-বৃষ্টিতে আর মানুষের হৃদয় নিঙড়ানো ভালোবাসায় সিক্ত কান্নাকাতর ও গভীর বেদনার্ত শেখ হাসিনাকে। সেদিন মুক্তির নতুন বারতা নিয়ে দেশে ফিরে আসেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বর্ষণসিক্ত লক্ষ জনতার সমাবেশে সেদিনের ভাষণে তিনি বলেছিলেন: ‘...আমি আপনাদের বোন হিসেবে, কন্যা হিসেবে এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে... বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চাই, বাঙালি জাতির আর্থ-সামাজিক তথা সার্বিক মুক্তি ছিনিয়ে আনতে চাই।’ জাতির পিতা হত্যার বিচারের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন সেদিন। অতঃপর পাথর ছড়ানো পথে পথে তাঁর সংগ্রামী জীবনের নবযাত্রা। 

সেই পথে কত বাধা-বিপত্তি, প্রাসাদ-ষড়যন্ত্র, কারানির্যাতন, বিদেশে থেকে মাতৃভূমিতে ফিরতে না-দেওয়ার চক্রান্ত, অসংখ্যবার হত্যাচেষ্টা শেখ হাসিনাকে দমাতে কী করেনি মুজিববিরোধী-স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি? কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দমবার ও মাথা নোয়াবার নেত্রী নন। পিতার মতোই যা কিছু তাঁর দেশ ও মানুষের মঙ্গলের জন্যে প্রয়োজনীয় তাই নিয়ে সর্বক্ষণ ভাবেন এবং কঠিন পরিশ্রম ও একাগ্র নিষ্ঠায় তা বাস্তবে রূপদান করেন। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সামরিক দুঃশাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে এনে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির সরকারের নেতৃত্বদান; বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার; চার জাতীয় নেতা ও বুদ্ধিজীবী হত্যা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে বাঙালি জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেছেন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দেশকে এখন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করেছেন এবং বাংলাদেশকে পৃথিবীর বুকে উন্নয়নের মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। উচ্চশিক্ষার ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন। বৃত্তি ও বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে নারী শিক্ষায় অংশগ্রহণ অভাবিতভাবে বৃদ্ধি করেছেন। নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে রাজনীতি-প্রশাসন-বিচারবিভাগ, সেনা-নৌ-বিমান ও আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনীতে তাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করে সারা বিশ্বে অনুকরণীয় নজির সৃষ্টি করেছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বয়স্কদের বর্ধিত হারে ভাতার ব্যবস্থা করেছেন; জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা কার্যক্রমের সম্প্রসারণ করেছেন; সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় হতদরিদ্র মানুষের জন্যে বিধবা ভাতা; প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্যে উপবৃত্তির ব্যবস্থা করেছেন; তৃতীয় লিঙ্গের অসহায় মানুষদেরকে উন্নয়ন কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং কৃষির যান্ত্রিকীকরণ-আধুনিকীকরণ করে খাদ্যে-আমিষে-পুষ্টিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছেন। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় দেশের আনাচে-কানাচে বনজ-ফলজ-ঔষধি গাছ লাগিয়েছেন। আগামী একশ বছরের জন্যে ডেল্টা পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছেন। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে শেখ হাসিনা।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পররাষ্ট্র নীতি-দর্শন হলো ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারোর সঙ্গে বৈরিতা নয়’। পররাষ্ট্র নীতিতে সেই দর্শন অনুসরণ করে বিশ্বের বিবদমান পরাশক্তিসমূহ এবং প্রতিবেশীসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার কূটনৈতিক সাফল্য ঈর্ষণীয়। উন্নত দেশসমূহের সহায়তায় আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি ও অবকাঠামোতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটিয়ে তিনি বাংলাদেশে ডিজিটাল বিপ্লব সাধন করেছেন। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রেরণ করেছেন। পায়রা-সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ও রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছেন। কর্ণফুলি নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু টানেল, ঢাকায় মেট্রোরেল, সারা দেশে নতুন নতুন রেলপথ, অ্যালিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, রামপাল ও মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বহু মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন করে চলেছেন। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের জন্যে কোভিড-১৯ ভ্যাক্সিন নিশ্চিত করেছেন। ১৯৯৬ সালে প্রথম ক্ষমতায় এসে ভারতের সঙ্গে ৩০ বছরের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি করেছেন। ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির আলোকে ২০১৫ সালের আগস্টে ছিটমহলবাসীর দীর্ঘ দুঃসহ জীবনে মুক্তির স্বাদ এনে দিয়েছেন। এই ২০২২-এর সেপ্টেম্বরের ভারত সফরে কুশিয়ারা নদীর পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করেছেন। প্রতিবেশী দেশসমূহের জন্যে বাংলাদেশি পণ্যের ফ্রি ট্রানজিটসহ সকল পথে সংযুক্তির বিস্তার ঘটিয়েছেন। ২০১৭ সালের ৩০শে অক্টোবর শেখ হাসিনার উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের ইউনেস্কো কর্তৃক ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টার’-এ হেরিটেজ ডকুমেন্ট হিসেবে অন্তর্ভুক্তি আমাদের জন্যে পরমগৌরবের। তিনি হাজার বছরের আবহমান বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে ১৮৭৬ সালের ব্রিটিশ কালাকানুন অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন বাতিল করেছেন।

একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি অর্জন; পয়লা বৈশাখ উদযাপন, বাউল-সংগীত, জামদানি ও শীতলপাটিকে ইউনেস্কোর ‘ওয়ার্ল্ড ইনটেঞ্জিবল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’র তালিকাভুক্তিকরণের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে বাঙালি সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ উন্মুক্ত ও অবারিত করেছেন। জননেত্রী শেখ হাসিনা বর্তমান বিশ্বের একজন সৎ ও সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে অসংখ্য পুরস্কার-পদক ও সম্মাননায় ভূষিত হয়ে আমাদেরকে গৌরবান্বিত করেছেন।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমাদের অহংকার পদ্মা সেতু। এখন সবাই বলে শেখ হাসিনার স্বপ্নের পদ্মা সেতু। এই কারণে তাঁর ছোটোবোন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানা, শেখ হাসিনার পুত্র-কন্যা সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুলসহ পুরো পরিবার নিদারুণ অপমান সহ্য করে; দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে; বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করে; নিজের দেশের জনগণের টাকায় সারা বিশ্বের অন্যতম বিস্ময় স্বপ্নের পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ করে দিয়েছেন রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। তাই আমি বলি শেখ হাসিনার সাহস ও প্রজ্ঞার প্রতীক এই পদ্মা সেতু। 

আমাদের এই প্রমত্তা পদ্মা নদী পাড়ি দিতে গিয়ে কতো সন্তান তাদের পিতা-মাতা হারিয়েছেন; পিতা-মাতা হারিয়েছেন তাঁদের সন্তানদের। দুইপারে অসংখ্য কৃষকের কতো উৎপন্ন শস্য ও খাদ্যপণ্য ডুবে পঁচেগলে নষ্ট হয়ে গেছে। কতো মানবিক ও সামাজিক সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অগণিত মানুষ। অসুখ-বিসুখে, আনন্দ-উৎসবে বাড়ি ফিরতে গিয়ে কতো মানুষের ফেরিঘাটে যাতনাময় রাত ও দিন কাটাতে হয়েছে।

আজ ‘শেখ হাসিনার পদ্মা সেতু’ দিয়ে ছয় মিনিটে পৃথিবীর দ্বিতীয় ও বাংলাদেশের শীর্ষ খরস্রোতা নদী পদ্মা পাড়ি দিচ্ছে লক্ষ-কোটি মানুষ। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মোংলা ও পায়রা বন্দর, কালনী সেতু, রূপসার ওপর দেশের দীর্ঘতম রেলসেতু সব মিলিয়ে পরিবহন, যোগাযোগ, পর্যটন, কলকারখানা-শিল্প-প্রতিষ্ঠান স্থাপনের অপার সম্ভাবনার আনন্দে প্রত্যেক বাঙালি আজ আকাশে উড়ছে। জয়তু পদ্মা সেতু। জয়তু শেখ হাসিনা।  

শেখ হাসিনা।

আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগে অজপাড়াগাঁয়ে জন্ম নেওয়া আমার শৈশব-কৈশোরে গ্রামের মানুষের ঘরের কষ্টের কথা কল্পনা করলে বেদনায় দুচোখ পানিতে ভরে যায়। বিশেষ করে বর্ষাকালে ঝড়-বাদলে গাঁয়ের গরিব ভূমিহীন মানুষকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ছন-খড়-কলাপাতার জোড়াতালি দেয়া চালের নিচে কাকভেজা হয়ে ঠাণ্ডায় কাঁপতে দেখেছি।

আজ থেকে ৫০ বছর আগে ১৯৭২ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লক্ষ্মীপুর জেলার চর পোড়াগাছা গ্রামে একটি আশ্রয়ণ প্রকল্প উদ্বোধন করে অসহায় ভূমিহীন মানুষের জন্যে পুকুরসহ বাড়ি-ঘরের ব্যবস্থা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সেই আদর্শ গ্রামের সকলেই এখন সচ্ছল। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা ‘দেশে একজন মানুষও গৃহহীন, ভূমিহীন থাকবে না’ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ১৯৯৭ সাল থেকে অদ্যাবধি দেশের পাঁচ লক্ষের অধিক পরিবারের জন্যে দুই শতক জমির ওপর ঘরবাড়ি তৈরি করে দিয়েছেন।

গণমানুষের নেত্রী শেখ হাসিনার মমতামাখা হৃদয়ের ভালোবাসায় আজ তারা এসব গুচ্ছগ্রামের পুকুরে মাছ, আঙিনায় সবজি, টিউবওয়েলের সুপেয় পানির ব্যবস্থাসহ নানান রঙের পাকা ঘরবাড়িতে বসবাস করছেন; সঙ্গে স্কুলে পড়ালেখা আর খোলা চত্বরে ছুটোছুটির আনন্দ নিয়ে শিশুদের বেড়ে উঠতে দেখে এখন আবার আনন্দে দুচোখ জলে ভরে যায়।

করোনার বৈরী সময়ে কৃষি-শিল্প-স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতিখাতে বিপুল পরিমাণ প্রণোদনা ও বরাদ্দ দিয়ে জনমানুষের জীবন ও দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছেন; অনেক উন্নত দেশ এমনকি চীনের চেয়েও অধিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হয়েছেন। দেশের দরিদ্র-অসহায় মানুষের মুখে খাদ্য তুলে দিয়েছেন; নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্যে ন্যায্যমূল্যে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী সহজলভ্য করেছেন। আমাদের দেশের কবি-শিল্পী-সাংবাদিক-সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের সাধ্যমতো সহায়তা প্রদান করেছেন। এভাবে ক্লান্তিহীন ও নিরলসভাবে আমাদের নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করে জাতির পিতার স্বপ্নের সফল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছেন।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার মহত্ব ও মানবিক গুণাবলীর ওপর দু-এক কথা আমাকে বলতেই হবে। তাঁর বিনয়ী-মিষ্টি স্বভাবে দেশে-বিদেশে সকলেই মুগ্ধ।বঙ্গবন্ধুর মতোই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের রোগে-শোকে-বিপদে-আপদে তাঁর দয়াদ্রচিত্ত যেভাবে ব্যাকুল হয়ে ওঠে, রাষ্ট্রের উচ্চাসনে বসা কারও কাছ থেকে তা আশা করা তো দূরে থাক কল্পনা করাও দুঃসাধ্য। শুধু রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নয় ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ট্রাস্ট’-এর তহবিল থেকে দলের অসংখ্য নেতা-কর্মীর সন্তানদের পড়ালেখা করিয়ে মানুষ করেছেন; অনেক পরিবারের ব্যয়ভার নিয়মিত বহন করছেন। কবি-লেখক-শিল্পী-সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের চিকিৎসা করানো; অসুখে অর্থ, ফলমূল-পথ্যাদি পাঠানো; কেউ মৃত্যুবরণ করলে বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের সান্ত্বনা দেওয়া থেকে শুরু করে দাফন-সৎকারসহ সকল ব্যবস্থা নিজে তদারকি করা; পত্রিকায় খবর পড়ে অসহায় ভিক্ষুক-ভিখিরিনীকে সহায়তা দেওয়া; গোপনে বহুজনকে নিয়মিত অর্থ সহায়তা করে যাওয়া; হত-দরিদ্র ও বিপদগ্রস্ত মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করা প্রভৃতি তাঁর নিত্যদিনের মানবিক কাজের অংশ।

এছাড়া জৈববৈচিত্র রক্ষায় তাঁর দায়িত্ববোধ ও প্রাণিকুলের প্রতি মায়া-মমতা অতুলনীয়। কিছুদিন পূর্বে গণভবনে গিয়ে দেখেছি বাংলাদেশের অনেক প্রজাতির বনের পাখিদের অভয়াবাস করে দিয়ে তাদের যার যেমন খাবার-দাবার-শুশ্রূষা প্রয়োজন সেভাবে সব ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেখলেই তারা কৃতজ্ঞতায় সমস্বরে আনন্দধ্বনিতে প্রাঙ্গণ মুখরিত করে তোলে।

পরিবারের সঙ্গে শেখ হাসিনা (ডানে)।

এখন সারা বিশ্বময় বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উদযাপিত হয়। জন্মদিন উদযাপিত হয় বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, শেখ কামাল ও শেখ রাসেলের। আনন্দের বদলে সেসব জন্মদিনে আমাদের বুক বেদনায় ভরে ওঠে। গণমানুষের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু তাঁর জ্যেষ্ঠকন্যা শেখ হাসিনার জন্মের সময় কাছে ছিলেন না। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ডাকে দেশের প্রয়োজনে কলকাতায় গিয়েছিলেন; বিয়ের সময় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলেন।

শেখ হাসিনার প্রথম সন্তান জয়-এর জন্মের সময় মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ও প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের অন্ধকার কারাপ্রকোষ্ঠে বন্দি ছিলেন। জয়-এর জন্মের সময় বর্বর পাকবাহিনী অবরুদ্ধ বঙ্গমাতাকে হাসপাতালে কন্যার পাশে উপস্থিত হতে দেয়নি। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি ও মানুষের জন্যে উৎসর্গীকৃত বঙ্গবন্ধু পরিবারের এমন জীবনকথা আমরা কি কখনো একটু গভীরভাবে ভেবে দেখি? 

প্রায় প্রতিদিনই জননেত্রী শেখ হাসিনার দরদি কণ্ঠে এ কথা শুনে ব্যথিত ও মুহ্যমান হই যে, তিনি বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্যে পিতার মতোন নিজের জীবন উৎসর্গ করতে সর্বদা প্রস্তুত। তিনি তো সকল কিছু উৎসর্গ করেছেন দেশের জন্যে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের জন্যে, আমাদের জন্যে। এই সেপ্টেম্বর মাসেই জন্ম বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানারও। আমরা তাহলে কী দিতে পারি শেখ হাসিনাকে; শেখ রেহানাকে? একটু শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, শুভকামনা; দেশের কল্যাণে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর দেওয়া দায়িত্ব পালন করা; সর্বোপরি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতিতে সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে তাঁর হাতকে শক্তিশালী করা। তাই, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ ও বাঙালি সংস্কৃতির অস্তিত্বের প্রতীক আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, সফল রাষ্ট্রনায়ক ও সবার সুহৃদ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ছিয়াত্তরতম জন্মদিনে তাঁর দীর্ঘায়ু, সুস্থতা, নিরাপত্তার জন্যে এবং তাঁকে আজীবন দেশসেবার সুযোগ দেওয়ার জন্যে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি।

বাংলার মানুষের মুক্তিদাতা মুজিব পরিবারের অন্তহীন ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে জন্মদিনে এতটুকু কৃতজ্ঞতা ও দু’ফোটা চোখের জল ছাড়া কী আর দেবার আছে আমাদের!

লেখক: কবি ও শিক্ষাবিদ; প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ইত্তেফাক/এএএম