বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

দৈনিক ইত্তেফাকের গোলটেবিল বৈঠকে আলোচনা

বিদেশি নয়, চট্টগ্রাম বন্দরে দেশীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান

  • দেশীয় বিনিয়োগে সাম্প্রতিককালে বন্দরের সক্ষমতা বেড়েছে
  • বাংলাদেশের স্বার্থ মাথায় রেখে বিদেশী বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেবে সরকার
আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ২১:৪৭

চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির ‘লাইফ লাইন’। এই বন্দরের আয় দেশের উন্নয়নেও অবদান রাখছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা আগের চেয়ে বেড়েছে। এক্ষেত্রে মূল ভ‚মিকা রেখেছে দেশীয় বিনিয়োগ। এ পর্যায়ে এসে বন্দরকে বিদেশিদের হাতে ছেড়ে না দিয়ে দেশীয় বিনিয়োগ বাড়িয়ে উন্নয়ন কাজ এগিয়ে নিতে হবে। 

মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে দৈনিক ইত্তেফাক আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন। ‘দেশীয় বিনিয়োগে চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন’ শীর্ষক এই আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি। সিনিয়র সাংবাদিক গ্লোবাল টেলিভিশনের সিইও ও এডিটর ইন চিফ সৈয়দ ইশতিয়াক রেজার সঞ্চালনায় প্রধান আলোচক ছিলেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ শাহজাহান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) সহ-সভাপতি খায়রুল আলম সুজন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন দৈনিক ইত্তেফাকের ক‚টনৈতিক সম্পাদক মাঈনুল আলম। 

নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমরা সমুদ্রে অধিকার অর্জনের পাশাপাশি দরজা খুলে রেখেছি বিনিয়োগকারীদের জন্য। তবে বাংলাদেশের স্বার্থ ও সুবিধার বিষয়টি মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। গত কয়েক বছরে বন্দর পরিস্থিতির উন্নয়নের কথা উলে­খ করে তিনি বলেন, পরিস্থিতি এখন আগের মতো নেই। পুরোপুরি দেশীয় বিনিয়োগে বন্দরের সক্ষমতা এসেছে। বন্দর এখন ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকছে। কাস্টমসের ক্লিয়ারেন্সের পর পণ্য ছাড়ে চট্টগ্রাম বন্দর দেরি করে না। তিনি আরো বলেন, সরকার এখন পরিকল্পনার মধ্যে নেই বাস্তবায়নের মধ্যে রয়েছে। আমরা বিনিয়োগকারীদের জন্য পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছি। ২০২৬-২৭ সালে আমরা অন্যরকম একটি মেরিটাইম সেক্টর দেখতে পাব। 

দৈনিক ইত্তেফাকের গোলটেবিল বৈঠকে আলোচনা

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর এখন আধুনিক বন্দরে পরিণত হয়েছে। গত ১০ বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা উলে­খযোগ্য হারে বেড়েছে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে দেশীয় বিনিয়োগের প্রচুর সুযোগ রয়েছে। অনেক বেশি অফ ডকের প্রয়োজন রয়েছে। সেখানে দেশীয় বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করতে পারেন। সমষ্টিগত উন্নয়নে দেশীয় বিনিয়োগের ওপর জোর দেওয়া যেতে পারে।  

মূল প্রবন্ধে খায়রুল আলম সুজন বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক বন্দর হিসেবে যাত্রার পর ১৩৪ বছর পেরিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে চট্টগ্রাম বন্দর। সমুদ্রপথে আমদানি-রফতানির ৯৩ শতাংশ হ্যান্ডলিং হয় এই বন্দর দিয়ে। আর কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয় ৯৮ শতাংশ। গত পাঁচ বছরে বন্দরে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়নে বিদেশি বিনিয়োগের দরকার আছে। কারণ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এখনো আমাদের গড়ে ওঠেনি। তবে ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অবশ্যই বাংলাদেশের হাতে থাকা উচিত। অপারেশন সেক্টরে বাংলাদেশ সক্ষমতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশের দুইটি অপারেট কোম্পানি এখন দুটি দেশের বন্দর অপারেটে যুক্ত। তারা সেখানে সফলতার সঙ্গে কাজ করছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে এফবিসিসিআইর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর লাভজনক প্রতিষ্ঠান নয়, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান। সেখানে পণ্য আমদানি-রফতানির খরচটা সীমিত রাখতে হবে। তাই বিদেশি বিনিয়োগের চেয়ে দেশের বিনিয়োগ বাড়াতে জোর দিতে হবে। 

শিপ হ্যান্ডলিং এন্ড বার্থ অপারেটর এসোসিয়েশনের ফজলে ইকরাম চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অন্যতম রাজস্ব আয়কারী প্রতিষ্ঠান। উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যর্থ হলে সেক্ষেত্রে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট কবীর আহমেদ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর আজকে যে অবস্থায় এসেছে তা দেশীয় বিনিয়োগের মাধ্যমেই। আমাদের অনেক ব্যবসায়ী বিদেশি বিনিয়োগ করছেন। তারা চাইলে চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়নে এবং একে ঘিরে যে শিল্প গড়ে উঠছে সেখানে বিনিয়োগ করতে পারেন। এক্ষেত্রে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেটা চিহ্নিত করতে হবে।

দৈনিক ইত্তেফাকের গোলটেবিল বৈঠকে আলোচনা

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. আইনুল ইসলাম বলেন, আমাদেরকে অবশ্যই দেশীয় বিনিয়োগের দিকে নজর দিতে হবে। ভ‚-রাজনৈতিক কারণে আমাদের দেশে বিদেশি বিনিয়োগ কখনো কখনো কমে যায়। এক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা রক্ষায় দেশীয় বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে উদ্যোগ নিতে হবে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে আমাদের দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। বিদেশিরাই কি আমাদের সমুদ্র বন্দরগুলো বানিয়ে দেবে। নাকি আমাদের নিজস্ব দেশীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে হবে। দেশের স্বার্থকে প্রধান্য দিয়ে এ বিষয়ে ভাবতে হবে। 

বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির আহবায়ক রাশেদুল করিম মুন্না বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতের উন্নতির কথাও বলতে হবে। তিনি বলেন, সামনে আমাদের রফতানির পরিমাণ বাড়বে। সেজন্য বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এক্ষেত্রে অবশ্যই দেশীয় বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। 

বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট নূরুল কাইয়ুম খান বলেন, দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে বিদেশি বিনিয়োগের বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে সেটা অবশ্যই দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে।

শিপিং এজেন্ট এসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান ইকবাল আলী শিমুল বলেন, বে-টার্মিনাল চালু হলে ২০৩০ সাল পর্যন্ত আমাদের কোন সমস্যা হবে না। 

এটিএন বাংলার প্রধান নির্বাহী সম্পাদক জ ই মামুন বলেন, মোংলা এবং পায়রা সমুদ্রবন্দরকেও পণ্য আমদানি রপ্তানি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। তাঁর মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে এবং কার্যক্রম পরিচালনায় দেশীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা আছে। 

চ্যানেল টুয়েন্টি ফোরের নির্বাহী পরিচালক তালাত মামুন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর অর্থনীতির চালিকা শক্তি। বিদেশি বিনিয়োগের বিষয়টি স্পষ্ট করা উচিত। 

গোলটেবিল বৈঠকে আরো বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশলী) কমোডর মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, পোর্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির প্রধান ও চট্টগ্রাম চেম্বার পরিচালক অঞ্জন শেখর দাশ, সিএন্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কাজী মাহমুদ ইমাম বিলু, চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ চৌধুরী, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি আলী আব্বাস, এমএসিএনের প্রজেক্ট ম্যানেজার কমোডর (অব.) সৈয়দ আরিফুল ইসলাম, যমুনা টেলিভিশনের সিইও ফাহিম আহমেদ, বৈশাখী টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক সাইফুল ইসলাম, চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম, চট্টগ্রাম বন্দরের চিফ প্ল্যানিং মাহবুব মোর্শেদ চৌধুরী, কমলাপুর আইসিডির ডেপুটি ট্রাফিক ম্যানেজার আহমেদুল করিম চৌধুরী, পানগাঁও আইসিডির টার্মিনাল ম্যানেজার গোলাম মোহাম্মদ সরওয়ারুল ইসলাম প্রমুখ। 

ইত্তেফাক/এএইচপি