বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

গরুর লাম্পি স্কিন রোগ, দুশ্চিন্তায় খামারিরা

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:০৬

ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বাড়ছে ভাইরাসজনিত ‘লাম্পি স্কিন’ রোগে আক্রান্ত গরুর সংখ্যা। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন খামারি ও প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকেরা। এই রোগে আক্রান্ত গরুর গায়ে গুটি বের হতে দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে গায়ে প্রচণ্ড ব্যথায় গরু অসুস্থ হয়ে পড়ে। নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা না থাকায় গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে রয়েছেন খামারি ও গরু পালনকারীরা।তবে রোগটি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছেন  উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্র জানা যায়, উপজেলায় ৯৪ হাজার ৩৪০টি গরু রয়েছে। আক্রান্ত গরুর শরীরে ফোসকা পড়ছে। কোনো গরুর পা ফুলে যাচ্ছে, কোনো গরুর গলায় ঘা হচ্ছে।

বোরহানউদ্দিন সরকারি আব্দুল জব্বার কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নীল কমল দে এবং কৃষি বিজ্ঞান বিভাগের এএইচএম মোস্তফা কামাল বলেন, ‌‘গ্রামীণ  অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে গরু পালন। প্রতিটি বাড়িতেই এখন গরু পালন করা হয়। এদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামার বৃদ্ধি পাচ্ছে। গরু পালনে অনেকের সংসারে সচ্ছলতা এনেছে। পাশাপাশি বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু নতুন এই রোগের কারণে শঙ্কিত গরু পালনকারীরা।’ 

প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তা, খামারি ও সংশি­ষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এ রোগটি সাধারণত মশা-মাছির বিস্তারের সময় ব্যাপক আকার ধারণ করে। মশা-মাছির ও খাবারের মাধ্যমে এক গরু থেকে অন্য গরুতে এ রোগ ছড়ায়। টিকা দিয়ে আক্রান্ত থেকে গরুকে রক্ষা করা যায়। 

আক্রান্ত গরু আলাদা ও মশারির ভেতর রাখা জরুরি। এ রোগের লক্ষণ হচ্ছে আক্রান্ত গরুর গা হঠাৎ গরম হয়ে যায়। শরীরজুড়ে ছোট ছোট মাংসপিণ্ডের মতো ফুলে ওঠে। অনেকটা আঁচিলের মতো। পা, ঘাড়, মাথায় এসব বেশি ওঠে। চামড়া উঠে ক্ষতে পরিণত হয়। এ রোগে আক্রান্ত গরু খাওয়া ছেড়ে দেয়। সব ধরনের গরু এ রোগে আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত  গবাদিপশুর চোখ দিয়ে পানি ঝরে চোখ অন্ধ হয়েও যেতে পারে। এ রোগে মারা যাওয়ার হার ১-৩ শতাংশ। ষাঁড় গরুর ক্ষেত্রে ইনফাটিলিটি এবং গর্ভবতী প্রাণীতে গর্ভপাত ঘটে। খুরা রোগের চেয়েও এটি বেশি ভয়ঙ্কর।

কুতুবা ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কামাল বলেন, তার ৫টির মধ্যে ৪টি, ঝন্টু কাজির ৫টি, জাকিরের ৩টি, বড় মানিকা ৮ নম্বর ওয়ার্ডের শেখ ফরিদ বলেন, তা ৮টি, তাজুল ইসলামের ৪টি, পক্ষিয়া ইউনিয়নের আলাউদ্দিনের ৩টি, মালেক এর ২টি গরু আক্রান্ত হয়েছে। তাদের মতো গ্রামের বেশির ভাগ গরুই এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্ত গরুগুলো ঝিমায়, খাবার কম খায়।

জাকির হোসেন নামে এক খামারি বলেন, সপ্তাহখানেক আগে আমার খামারের দুটো গরু অসুস্থ হয়। পরে পশু চিকিৎসক ডাকা হলে তারা ইনজেকশন ও ওষুধ দিয়েছে। গরু ভালো হবার পথে। 

জান্টু  বলেন, আমি রোগাক্রান্ত দুটি গরুকে প্রথম থেকে আলাদা রাখলেও আমার খামারে থাকা আরেকটা গরুর গায়েও দু’দিন আগে গুটি বের হতে শুরু করেছে। আক্রান্ত পশুকে আমি আলাদা রাখছি।

পল্লীচিকিৎসক আব্দুল মন্নান বলেন, গরুর লাম্পি স্কিন রোগ বর্তমানে উপজেলায় ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ পর্যন্ত আমি পক্ষিয়া, বড় মানিকা ৮ নম্বর ওয়ার্ড, কুতুবা ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আক্রান্ত ১০০ থেকে ১৫০ গরুর চিকিৎসা করেছি। আমার জানা মতে, লাম্পি স্কিন রোগে উপজেলায় এ পর্যন্ত কোনো গরু মারা যায়নি। অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় গত দেড় মাসে গরুর লাম্পি স্কিন রোগের ওষুধ বেশি বিক্রি হচ্ছে।

অপর চিকিৎসক আব্দুর রব জানান, এ পর্যন্ত তিনি শতাধিক গরুর চিকিৎসা করেন, যাদের মধ্যে হাবু ফরাজীর ৪টি, খালেকের ২টি।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতালের ভেটেরিনারি সার্জন ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) কে, এম, আসাদুজ্জামান বলেন, গত এক মাসে প্রতিটি ইউনিয়নে পাঁচ থেকে সাতটি গরু আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করলে এর সঠিক চিকিৎসা প্রদান সম্ভব। মারা যাওয়ার হার খুব কম। এ ছাড়া সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রান্তিক পর্যায়ে কাজ চলমান রয়েছে। এলএসডি প্রতিরোধে কৃষক পর্যায়েও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করা হচ্ছে।

ইত্তেফাক/এইচএম