বুধবার, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৮ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

দুই দশক পর কাশ্মীরে খুলল সিনেমা হল, দেখল ‘বিক্রম ভেদা’

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২২, ০২:৩৩

ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে দুই দশকেরও বেশি সময় পর প্রথমবার সিনেমা হল চালু হলো। দেখানো হচ্ছে বলিউড তারকা হৃতিক রোশন, সাইফ আলী খান অভিনীত একটি চলচ্চিত্র। কাশ্মীরের প্রধান শহর শ্রীনগরের আইনক্স মাল্টিপ্লেক্সে হলের বাইরের খোলামেলা জায়গার সিলিং আর দরজায় এখন ঐ অঞ্চলের কারুকার্যমণ্ডিত কাঠের কাজের নির্দশন ও কাগজের মণ্ড দিয়ে বানানো লোগো দৃশ্যমান। 

মালিক বিকাশ ধর জানান, এই দিনে পৌঁছাতে আমাদের চার বছর সময় লেগেছে। তিনি এবং তার বাবা ভারতের মালটিপ্লেক্স চেইন আইনক্সের সঙ্গে মিলে কাশ্মীরে অনেক দিন পর সিনেমা হল খুলছেন। কাজটা মোটেও সহজসাধ্য ছিল না। একটি আট রুমের গেস্টহাউজ গুঁড়িয়ে দিয়ে ধর পরিবারকে এই চার তলার মালটিপ্লেক্স বানানোর কাজে হাত দিতে হয়েছে। বলিউড সুপারস্টার আমির খানের ‘লাল সিং চাড্ডা’ দিয়ে গত ২০ সেপ্টেম্বর হলের প্রথম উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়। হলিউডের ব্যবসা সফল ছবি ফরেস্ট গাম্পের অনুকরণে লাল সিং চাড্ডা বানানো হয় বলে জানা গেছে। জম্মু-কাশ্মীরের লেফটেন্যান্ট গভর্নর মনোজ সিনহা কয়েক দশক পর অঞ্চলটিতে সিনেমা হলের প্রত্যাবর্তনকে ‘ঐতিহাসিক দিন’ এবং মানুষের আশা, স্বপ্ন, আস্থা ও আকাঙ্ক্ষার নতুন ভোরের প্রতিফলন বলে অভিহিত করেন। সিনেমা কমপ্লেক্সটিতে তিনটি হল, সবগুলোতেই আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম আছে।  এদের মধ্যে শুক্রবার থেকে দুটি হল জনসাধারণের জন্য খুলছে, দেখানো হচ্ছে হৃতিক, সাইফ অভিনীত ‘বিক্রম ভেদা’। তৃতীয় হলটির কাজ এখনো শেষ হয়নি। কমপ্লেক্সটির ভেতরে বাচ্চাদের জন্য একটি ‘বিনোদন এলাকাও’ আছে।

ধর পরিবার বলছে, দশকের পর দশক ধরে সংঘাত-সহিংসতায় বিপর্যন্ত কাশ্মীরের শিশুদের ‘কল্পনার জগতে প্রবেশের’ সুযোগ দিতে চান তারা। বিকাশ ধর বলেন, স্কুল শেষে বিনোদনের সুযোগ পায় না কাশ্মীরের বাচ্চারা। আমরা এটা নিয়ে অনেক ভেবেছি এবং মালটিপ্লেক্স খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ১৯৯০ দশকের শুরুর দিকেও ভারতের একমাত্র মুসলিমপ্রধান অঞ্চল কাশ্মীরের কেবল শ্রীনগরেই ১০টির মতো সিনেমা হল ছিল। শান্ত মনোরম তৃণভূমি আর ছবির মতো সুন্দর দৃশ্যপটের জন্য এই এলাকায় বলিউডের অসংখ্য ছবির শুটিং হয়েছে। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকের শেষদিকে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া সশস্ত্র বিদ্রোহ হলগুলো বন্ধ করতে বাধ্য করে।

সহিংসতার এক পর্যায়ে ‘আল্লাহ টাইগারস’ নামের একটি জঙ্গি গোষ্ঠী চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও মদের দোকানকে ইসলামবিরোধী অ্যাখ্যা দিয়ে এগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এসব সিনেমা কমপ্লেক্সের বেশির ভাগই পরে ভারতীয় নিরাপত্তারক্ষীদের ক্যাম্পে পরিণত হয়, বাকিগুলো হয়েছে শপিংকমপ্লেক্স ও হাসপাতাল।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ১৯৯৯ সালে তিনটি হল পুনরায় চালুর চেষ্টা করে কিন্তু রেগাল সিনেমায় প্রাণঘাতী এক জঙ্গি হামলার পর তা থমকে যায়। সেবারের জঙ্গি হামলায় এক জন নিহত ও আট জন আহত হয়।

কাশ্মীরের সবচেয়ে প্রাচীন পালাডিয়াম সিনেমার (একসময়কার কাশ্মীর টকিজ) স্বত্বাধিকারী মনমোহন সিং গৌরি এখনো তাদের হলে সর্বশেষ চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর কথা মনে করতে পারেন। দিনটি ছিল ১৯৮৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর, দেখানো হয়েছিল বলিউড তারকা বিনোদ খান্না অভিনীত ‘মহা বদমাশ’।

গৌরির দাদা ১৯৩২ সালে শ্রীনগরের লাল চকে হলটি বানিয়েছিলেন, যা দশকের পর দশক কাশ্মীরিদের বিনোদন দিয়েছিল। ১৯৯৩ সালে হলটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। আমরা জীবিকাহীন ছিলাম, বাড়ি থেকে দূরে শরণার্থীদের মতো বসবাস করতাম, বলেন গৌরি, কাশ্মীরে সহিংসতার এক পর্যায়ে যিনি পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরে পালিয়ে যান। সিনেমা হলের প্রত্যাবর্তন তাকেও তার পারিবারিক পুরোনো পেশায় ফেরার উদ্দীপনা জোগাচ্ছে। গৌরি জানান, তিনি লেফটেন্যান্ট গভর্নর সিনহার সঙ্গে দেখা করেছেন, যিনি সিনেমার মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীর ও ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পেরবন্ধনকে নবজীবন দেওয়ার কথা বলেছেন। ২০১৯ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নিয়ে অঞ্চলটিকে লাদাখ এবং জম্মু-কাশ্মীর নামে আলাদা দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করেন। তার পর থেকে সেখানে একের পর এক আইন ও নীতির প্রয়োগ শুরু হয়, যেগুলো উন্নয়ন আনবে বলে বলছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। অন্যদিকে কাশ্মীরের বাসিন্দাদের আশঙ্কা, সরকার এগুলো করছে অঞ্চলটির জনমিতি বদলে দিতে।

চলচ্চিত্র নির্মাতাদের এই অঞ্চলে টেনে আনার লক্ষ্যে লেফটেন্যান্ট গভর্নর সিনহার প্রশাসন একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও জানা গেছে। আইনক্স সিনেমা হলে উদ্বোধনীতে দেওয়া বক্তৃতায় সিনহা বলেন,  আমরা এখানে একটি ফিল্ম সিটি এবং জম্মু-কাশ্মীরের ২০ জেলার সবগুলোতেই ১০০ আসনের সিনেমা হল বানানোর প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি। সিনেমা হলের প্রত্যাবর্তন স্থানীয় শিল্পীদেরও আশান্বিত করছে। অভিনেতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা মুশতাক আলি আহমদ খান বলেন, আমার আশা, নতুন সিনেমা হলগুলোতে প্রতিদিন অন্তত একটি শোতে স্থানীয়ভাবে নির্মিত ছবিগুলো দেখানো হবে। দুই দশকেরও বেশি সময় পর সিনেমা হলের প্রত্যাবর্তন অনেককে স্মৃতিকাতরও করে তুলছে।

উত্তর কাশ্মীরের বারামুল্লা জেলার ৭৩ বছর বয়সি গৃহিণী দিলশাদার মনে পড়ে, একসময় তিনিও তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সিনেমা দেখতেন। জ্ঞাতি ভাইবোনদের নিয়ে ঋষি কাপুর, ডিম্পল কাপাডিয়ার ১৯৭৩ সালের ছবি ‘ববি’ দেখার কথা মনে করতে পারেন তিনি, যেন ধরা পড়ে না যান, সেজন্য বোনরা সবাই মুখ ঢেকে হলে গিয়েছিলেন। কাশ্মীরে সিনেমা হলের প্রত্যাবর্তনে দিলশাদার মতো অনেকে উত্ফুল্ল হলেও অনেকের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষ একে রাজনৈতিক প্রকল্পে পরিণত করছে।

 

ইত্তেফাক/ইআ