শনিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২২, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ধর্ষণের জন্ম নেওয়া শিশুর পিতৃত্ব নির্ধারণে আপিল বিভাগে ভুক্তভোগী

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২২, ০২:২৮

১৩ বছর সংসারের পর প্রথম স্বামীর সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে যায়। ডিভোর্সের পর পরিচয় সূত্রে সেই নারীকে ধর্ষণ করেন এক চিকিৎসক। পরে বিয়ের প্রলোভন দিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়। ধর্ষণের ফলে জন্ম নেয় এক শিশু। মামলা হয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে। সেই মামলায় ওই চিকিৎসককে অব্যাহতি দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা। অব্যাহতি প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে ওই নারী নারাজি দিলে গ্রহণ করে ট্রাইব্যুনাল।

একইসঙ্গে শিশুর পিতৃত্ব নির্ধারণে চিকিৎসকের ডিএনএ টেস্টের পাশাপাশি তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের এই আদেশ রিকল (প্রত্যাহার) চেয়ে আবেদন করেন ভিকটিমের প্রথম স্বামী। ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আবেদন না মঞ্জুর করলে হাইকোর্টে যান তিনি। হাইকোর্ট ওই আবেদন গ্রহণ করে ট্রাইব্যুনালের আদেশ বাতিল করে রায় দেন। হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে আবেদন করেন ভিকটিম। আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালতের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম হাইকোর্টের রায় আট সপ্তাহের জন্য স্থগিতের আদেশ দেন। একইসঙ্গে রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল দায়েরের অনুমতি দেওয়া হয়েছে ভিকটিমকে।

হাইকোর্ট। ছবি: সংগৃহীত

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনেই ডিএনএ টেস্টের বিধান রয়েছে। এই বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে একটা শিশুর পিতৃত্ব নির্ধারণের বিষয়টির ফায়সালা হয়ে থাকে। ডিএনএ পরীক্ষায় যদি কিছু না পাওয়া যায় তাহলে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হবেন।

২০০৩ সালে কামাল হোসেন নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে বিবাহ হয় এক নারীর। ২০১৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্বামীকে তালাক দেন তিনি। পরিচয়ের সূত্র ধরে ২০১৭ সালের ২ জানুয়ারি ওই নারীকে নিজ কোয়ার্টারে ডেকে নেন ঢাকার একটি হাসপাতালে ওই চিকিৎসক। কোমল পানীয়র সঙ্গে নেশাজাতীয় দ্রব্য মিশিয়ে খাইয়ে অচেতন করে ধর্ষণ করা হয়। বিয়ের প্রলোভন দিয়ে ধর্ষণ করা হয় একাধিকবার। ২০১৮ সালের ১৭ জুন একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেন ওই নারী। বিয়ে না করায় ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এ মামলা করেন। ট্রাইব্যুনাল ভিকটিমের জবানবন্দি গ্রহণ করে মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেয়। পিবিআই অনুসন্ধান শেষে ওই চিকিৎসককে অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন। 

হাইকোর্ট। ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল ৫ লাখ টাকা দেনমোহরে বাদীনিকে বিয়ে করেন চিকিৎসক। ২০২০ সালের ৮ অক্টোবর তাকে তালাক দেন। তালাকের নোটিশ পেয়ে বাদীনি ধর্ষণ মামলা করেন। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হয় নাই। তবে বাদীর ছোট সন্তান এর পিতা কে তা ডিএনএ পরীক্ষা ব্যতীত বিস্তারিত মতামত প্রদান করা সম্ভব নয়।

ডিএনএ টেস্টের নির্দেশ

চিকিৎসককে অব্যাহতির প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে ভিকটিম ট্রাইব্যুনালে নারাজি দরখাস্ত দেন। একইসঙ্গে সন্তানের পিতৃত্ব নির্ধারণের জন্য ডিএনএ টেস্টেরও আবেদন করেন। ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক বেগম মাফরোজা পারভীন গত বছরের ১৫ মার্চ নারাজির আবেদন গ্রহণ করে শিশুর পিতৃত্ব নির্ধারণে চিকিৎসকের ডিএনএ টেস্টের নির্দেশ দেন। আদেশে বলা হয়, তদন্তকারী কর্মকর্তা তার প্রতিবেদনে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। একস্থানে তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন সন্তান জন্মের সময় প্রথম স্বামীর সাথে বাদীর বিয়ে বলবত ছিলো। আবার উল্লেখ করেছেন বাদীর (ভিকটিম) ছোট সন্তানের পিতা কে তা ডিএনএ পরীক্ষা ব্যতীত বিস্তারিত মতামত প্রদান করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ তদন্তকারী কর্মকর্তা নিজেই সন্দিহান। তদন্তকারী কর্মকর্তা কর্তৃক সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও দাখিলী কাগজপত্র এবং নারাজির জবানবন্দি পরীক্ষান্তে এবং তদন্তকারী কর্মকর্তার ডিএনএ বিষয়ে উক্তরুপ বক্তব্য থাকায় মামলাটি ডিএনএ টেস্টসহ অধিকতর তদন্ত হওয়া আবশ্যক মর্মে প্রতীয়মান হয়। মামলাটি সিআইডি কর্তৃক আসামি ও অভিযোগকারীর ছোট সন্তানের ডিএনএ টেস্ট করা ও অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হলো।

হাইকোর্ট। ছবি: সংগৃহীত

ডিএনএ টেস্টের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে তালাকপ্রাপ্ত প্রথম স্বামী

ডিএনএ টেস্টের এই আদেশ রিকল চেয়ে আবেদন করেন ভিকটিমের প্রথম স্বামী কামাল হোসেন। ওই আবেদনে দাবি করা হয়, ওই নারীর তৃতীয় সন্তানের পিতা সে। বিয়ে বলবত থাকাবস্থায় তার জন্ম। ডিএনএ টেস্টের আদেশ রিকল করা হোক। তবে ওই রিকল আবেদন খারিজ করে ট্রাইব্যুনালের বিচারক বলেন, কামাল হোসেন এই মামলার কোন পক্ষ নয়। এই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে যান তিনি। গত ২৩ আগস্ট ট্রাইব্যুনালের আদেশ বাতিল করে রায় দেয় হাইকোর্ট। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করেন ভিকটিম। আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালত হাইকোর্টের রায় আট সপ্তাহের জন্য স্থগিতের আদেশ দেন। 

হাইকোর্ট। ছবি: সংগৃহীত

এ প্রসঙ্গে ভিকটিমের কৌসুলি ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ইত্তেফাককে বলেন, বিষয়টি আপিল বিভাগে বিচারাধীন। হাইকোর্টের রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর লিভ টু আপিল হবে। তখন আপিল বিভাগে শুনানির মাধ্যমে বিষয়টির চূড়ান্ত ফায়সালা হবে। 

ভিকটিম বলেন, ওই চিকিৎসক অনেক প্রভাবশালী ও অর্থবিত্ত রয়েছে। আমার তৃতীয় সন্তানের পিতা সে। এজন্যই ডিএনএ টেস্ট চেয়েছি এবং ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেছে। 

ইত্তেফাক/এমএএম