রোববার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

একের পর এক খুন, ফের অশান্ত লক্ষ্মীপুর

  • বাহিনীপ্রধানরা পুরোপুরি নির্মূল না হওয়ায় জেলাবাসী
  • আতঙ্কে, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবি
আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২২, ০১:১৯

একসময় সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে কুখ্যাতি ছিল লক্ষ্মীপুরের। প্রতিনিয়তই বিভিন্ন সন্ত্রাসী বাহিনীর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে চলত খুনাখুনি। প্রশাসনের তত্পরতায় এসব বাহিনী প্রধানদের কেউ কেউ নির্মূল হলেও  অনেক বাহিনীর প্রধান ও সদস্যরা অক্ষত রয়ে গেছে, উদ্ধার হয়নি তাদের ব্যবহূত অবৈধ অস্ত্রও। এতদিন তারা গা-ঢাকা দিয়ে থাকলেও বর্তমানে এলাকায় তাদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। এতে ফের অশান্ত হয়ে উঠেছে লক্ষ্মীপুর। ঘটছে একের পর এক খুন।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগ নেতাসহ কয়েকটি খুনের পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তবে জেলা পুলিশ প্রধান বলছে, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অপরাধ দমনে লক্ষ্মীপুরের পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা রয়েছে। আশা করি, সন্ত্রাসীদের অস্তিত্ব বেশি দিন থাকবে না।

জানা যায়, গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে সদর উপজেলার বশিকপুর ইউনিয়নের পদ্মা দীঘিরপাড়ে ইউনিয়ন যুবলীগের সহসভাপতি মো. আলাউদ্দিনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সম্প্রতি প্রকাশ্যে দত্তপাড়া ইউনিয়নের আলাদাদপুর এলাকার চায়ের দোকানের সামনে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি সদস্য খোরশেদ আলম মিরনকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এর আগে ৩০ জুলাই রাতে সদর উপজেলায় বশিকপুর ইউনিয়নের কাশিমপুর গ্রামে রুবেল হোসেন নামের এক সৌদি প্রবাসীকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করে তার ব্যবহূত মোটরসাইকেল ছিনতাই করে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। এসব ঘটনার পর আবারও এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৪ সালের লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার হামছাদি ইউনিয়নের হাসন্দি গ্রামে এক ছাত্রলীগ নেতাকে হত্যা করা হয়। মূলত এ হত্যাকাণ্ডের পরই এ জনপদে শুরু হয় সন্ত্রাসীদের খুনাখুনি ও বাহিনী গঠনের কাজ। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতে লক্ষ্মীপুরে অন্তত ২০ থেকে ২৫টি ছোটবড় সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে উঠে। প্রতিটি বাহিনীতে ছিল ৫০ থেকে ৩০০ সদস্য। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার পূর্বাঞ্চলের চন্দ্রগঞ্জ থানার ৯টি ইউনিয়ন এসব সন্ত্রাসীর অভয়ারণ্য ছিল। তাদের হাতে বিপুলসংখ্যক অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র মজুত থাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত গোলাগুলিতে জড়িয়ে পড়ত তারা। সন্ত্রাসী বাহিনীর খুন, ধর্ষণ ও চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল এখানকার জনপদ। পরে পুলিশ-র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অভিযানে সন্ত্রাসী বাহিনী প্রধান কয়েক জনের মৃত্যু হয়। এর পর থেকে গত কয়েক বছর লক্ষ্মীপুর শান্ত ছিল। কিন্তু বাহিনীর প্রধানরা ও কয়েক জন সদস্য মারা গেলেও বাহিনীদের অন্যান্য সদস্যরা আটক না হওয়ায় ও অস্ত্রগুলো উদ্ধার না হওয়ায় সম্প্রতি বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য, মাদক ব্যবসায়ী ও অস্ত্রধারীরা আবারও এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম শুরু করেছে। এতে প্রাণভয়ে আতঙ্কিত জেলাবাসী।

স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সন্ত্রাসীদের আতঙ্কে স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারছেন না তারা। তাই চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় এনে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানান তারা। এছাড়া এখনো কয়েকটি বাহিনীর প্রধানরা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাই দ্রুত এসব বাহিনীর প্রধানদের গ্রেফতারের দাবি তাদের।

লক্ষ্মীপুর আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোসাদ্দেক হোসেন চৌধুরী সবুজ বলেন, বাহিনী প্রধানরা পুরোপুরি নির্মূল না হওয়ায় এখনো লক্ষ্মীপুরে খুনাখুনি চলছে। অবৈধ অস্ত্রগুলো উদ্ধার না হলে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সামাজিক ব্যক্তিবর্গসহ সমাজের কেউই নিরাপদ নয়। এ অবস্থায় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করেন তিনি।

পুলিশ সুপার মো. মাহফুজ্জামান আশরাফ বলেন, স্থানীয়দের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে তত্পর রয়েছে পুলিশ প্রশাসন। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে উল্লেখ করে পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের আটক করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছে। জেলাবাসীর নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

প্রসঙ্গত, জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১০৪টি এলজি, ২৮টি পাইপগান, ১০টি বিদেশি পিস্তল, ৪২টি দেশীয় একনলা বন্দুকসহ ২৬২টি অস্ত্র ও প্রায় হাজার রাউন্ড গুলি উদ্ধার হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৭২টি। গ্রেফতার হয়েছে ২৩৭ জন।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি