শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পানকৌড়ি যখন দোকানের পাহারাদার!

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২২, ১৪:০৩

পাখিপ্রেম নিয়ে অনেক গল্প আছে। কিন্তু বরগুনার মোস্তাফার গল্পটি একটু ভিন্নরকম। নিজের ওয়ার্কশপে কাজ করেন তিনি। পাশাপাশি পাখির ছানাদের সন্তানের স্নেহে বড় করা তার নেশা।

সরেজমিনে দেখা যায়, ৪টি বক ও একটি ছোট পানকৌড়ি কুড়িয়ে পেয়ে লালন-পালন করছেন তিনি। তার ওয়ার্কশপেই বেড়ে উঠছে পাখিগুলো। ওদের ছেড়ে দিলে তা আবারও ফিরে আসে মোস্তাফার কাছে। বরগুনার তালতলী উপজেলার ওয়ার্কশপে বসেই কথা হয় মিস্ত্রি মোস্তফার সঙ্গে।

রডের সংযোগে তৈরি আগুনের ফুলকির মধ্যেও নিরাপদে ঘুরে বেড়াচ্ছে পাখিগুলো। সমুদ্র উপকূলের এলাকা হওয়ায় এখানে রয়েছে অসংখ্য নদী-নালা ও খাল-বিল। সুন্দরবনের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন জঙ্গল রয়েছে বরগুনার তালতলী উপজেলায়। এ জঙ্গলে হাজারও পাখির বাস। হঠাৎ ঝড়ে প্রায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয় এসব পাখির বাসা। আর আহত সেই পাখি বা পাখির ছানা নিচে পড়ে যায়। তখন তাদের কাছে দেবদূতের মতো হাজির হয় পাখিপ্রেমী মোস্তাফা মিস্ত্রী।

মোস্তাফা জানান, চার পাঁচ মাস আগে কোন এক ঝড় বন্যার পর। সকালে মাছ ধারার জন্য খালে যাচ্ছিলাম। বিশাল বিশাল গাছের নিচে ভেঙে যাওয়ায় বাসাসহ কয়েকটি পাখির ছানা পড়ে আছে। গাছ বড় হওয়ায় গাছে উঠতে না পারিনি। ছানাগুলোকে আমার দোকানে এনে সন্তানের মতো লালন-পালন করছি।

ওয়ার্কশপে নিয়মিত কাজ চলছে। পাশেই দুটি বক ও পানকৌড়ি ঘোরাফেরা করছে। মোস্তফা তার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। পাশাপাশি পাখিগুলোকে খাবার দিতেও ভুলছেন না তিনি। মোস্তফার এ পাখিপ্রেম দেখে মুগ্ধ তার আশেপাশের মানুষও।  

স্থানীয়রা বলেন, বাজারে এলেই চোখে পড়ে মোস্তফার পাখিপ্রেম। আগে অন্যজায়গা থেকে ওয়ার্কশপের কাজ করলেও এখন মোস্তফার দোকানে কাজ করান।

পাখিপ্রেমী মোস্তফা বলেন, ওয়ার্কশপ ব্যবসার সঙ্গে সঙ্গে উপকূলের ছোট খালগুলোতে মাছ ধরি আমি। জঙ্গলের গাছগুলোতে থাকা পাখির বাসাগুলো মাঝেমধ্যেই ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। অনেক পাখির ছানা গাছ থেকে পড়ে যায়। আমি বাচ্চাগুলোকে কুড়িয়ে আনি। পাখিদের খাবার জোগাতে ওয়ার্কশপের কাজের ফাঁকে খালে মাছ ধরি। পাখি বড় হলে বনে অবমুক্ত করলেও আবারও আমার কাছে চলে আসে। তেমনই পানকৌড়ি ও কয়েকটি বক।

মোস্তফা আরও জানান, পাখিগুলো সব সময় মুক্ত অবস্থায় থাকে। তার ঘর ও আশপাশের এলাকায় ঘোরাঘুরি করে। তবে এলাকার কেউ যেন পাখিদের ক্ষতি করতে না পারে, এজন্য তাদের গায়ে লাল রং লাগিয়ে দিয়েছি। সবাই বুঝতে পারে এগুলো মোস্তফার কাছে বেড়ে ওঠা পাখি। ফিরে আসা বক ও পানকৌড়ি এখন আমার দোকানের পাহারাদার! দোকানে আমি না থাকলেও ‘পাহারাদার’ হিসেবে ওরা কাজ করে। ওদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কেউ কিছু নিতে পারে না।

সালাম দফাদার নামের একজন প্রতিবেশী জানায়, তালতলী বাজারে কোনো কাজে এলে মাঝেমধ্যেই চোখে পড়ে মোস্তফার পাখিপ্রেম। দেখা যায়, মোস্তফা বক বা পানকৌড়ির ছানাদের খাওয়াচ্ছেন। সেগুলো যদি মোস্তফার চোখে না পরতো তাহলে হয়তো জঙ্গলেই মারা পরতো।  

পরিবেশকর্মী নজরুল ইসলাম খান লিটু বলেন, বন আর বনের প্রাণীগুলো পরিবেশের একটি অংশ। আমরা যেভাবে পরিবেশ ধ্বংসের উৎসবে মেতে থাকি সেখানে এমন পাখিপ্রেম সত্যি প্রশংসার দাবিদার। পরিবেশের সব উৎসগুলোকে আমাদের সবার বাঁচিয়ে রাখা উচিত। কারণ পরিবেশ বাঁচলেই বাঁচবো আমরা।

বরগুনার পরিবেশ আন্দোলনের সমন্বয় আরিফ রহমান জানান, বন ও প্রাণীগুলো পরিবেশের একটি অংশ। আমরা যেভাবে পরিবেশ ধ্বংসের উৎসবে মেতে থাকি সেখানে এমন পাখিপ্রেম সত্যি প্রশংসার দাবিদার। কারণ পরিবেশ বাঁচলেই বাঁচব আমরা।

তালতলী বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, পাখিগুলো অবমুক্ত করা হলেও আবারও ফিরে আসছে মোস্তাফার কাছে। এ পাখিগুলো যাতে আর ফিরে না আসে। সেজন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও পাখি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ নিয়ে পরে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

ইত্তেফাক/পিও/এআই

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন