মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ বিপর্যয়: টেলিফোন, স্বাস্থ্যসহ জরুরি সেবা ব্যাহত

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২২, ০৪:০০

জাতীয় গ্রিডের একটি সঞ্চালন লাইনে বিভ্রাট দেখা দেওয়ায় গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহসহ দেশের বড় বড় এলাকা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। এতে নানামুখী দুর্ভোগে পড়ে মানুষ। রাজধানী ঢাকায় পানি সরবারহে বিঘ্ন ঘটে, হাসপাতালগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা ও পোশাক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়। জেনারেটরের জন্য ডিজেল কিনতে পেট্রোলপাম্পগুলোতে ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ পেতেও বিপাকে পড়েন ব্যবহারকারীরা।

ছবি- ফোকাস বাংলা

ঢাকাসহ সারা দেশে দুপুর থেকে লোডশেডিংয়ের কারণে জেনারেটরের তেলের জন্য সিরিয়াল পড়ে রাজধানীর পেট্রোলপাম্পগুলোয়। সরেজমিনে দেখা যায়, নীলক্ষেতের পেট্রোলপাম্পগুলোয় তেল নিতে ড্রাম, কনটেইনার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বিভিন্ন বাসাবাড়ির মালিক ও কেয়ারটেকাররা এবং ব্যাংক ও হাসপাতালের কর্মচারীরা।

ধানমন্ডি ৪ নম্বরের একটি পাম্পে তেল নিতে আসেন মো. তাহের উদ্দিন। তিনি জানান, বাসার জেনারেটরের জন্য তেল নিতে এসেছেন। বলেন, ‘আসতে পথে যতগুলো পেট্রোলপাম্প দেখেছি, সব জায়গায় এর চেয়েও লম্বা সিরিয়াল। এখানেও দাঁড়িয়ে আছি আধা ঘণ্টা ধরে। তেল পেতে হয়তো আরও আধা ঘণ্টা লাগবে।’

ছবি- ফোকাস বাংলা

ধানমন্ডি ৬ নম্বর থেকে আসা বাসার কেয়ারটেকার মাসুম বলেন, বাড়ির জেনারেটরের জন্য ডিজেল নিতে এসেছি। আমাদের বাসার সামনের পাম্প বন্ধ। ঢাকা কলেজের সামনের পাম্পে এর চেয়ে তিন গুণ লম্বা সিরিয়াল। তাই এখানে এসেছি।’ এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যাংক ও হাসপাতালের জেনারেটরের জন্য তেল নিতে সিরিয়ালে দাঁড়িয়েছেন প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মচারীরা। তবে চাহিদা বাড়লেও এখন পর্যন্ত পেট্রোলপাম্পগুলো অতিরিক্ত কোনো দাম চায়নি বলে জানান ক্রেতারা।

পানি সরবরাহ বিঘ্নিত :বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে পানি নিয়ে চরম সংকটে পড়েন ঢাকার অনেক এলাকার বাসিন্দারা। খাওয়ার পানি থেকে শুরু করে রান্নাবান্না, গোসল আর নিত্যকার কাজে সংকটের মধ্যে পড়েন তারা। লিফট বন্ধ থাকায় উঁচু ভবনে ওঠানামায়ও কষ্টের মুখোমুখি হয়েছে মানুষ। শামীম নামে একজন বলেন, ‘দুপুর ২টার দিকে বিদ্যুৎ গেছে। জেনারেটর দিয়ে সার্ভিস দিচ্ছিল। কিন্তু ৪টার পর থেকে সেটাও বন্ধ। ফলে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা আমাদের ছিল না। এমনকি পানিও ছিল না। এ এক মহাবিপদে পড়েছি আমরা।’ পুরান ঢাকার লালবাগের বাসিন্দা জানান, দুপুর ২টার পর থেকে বিদ্যুৎ নাই। পানি সরবরাহও কিছু সময় পর বন্ধ হয়ে গেছে। মসজিদ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে অজু করে নামাজে যেতে। লালবাগ ছাড়াও চকবাজার, আজিমপুর ও বকশীবাজার এলাকা থেকে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের কাছ থেকে একই ধরনের দুর্ভোগে পড়ার কথা জেনেছেন বলে তিনি জানান। পানি-বিদ্যুতের সংকটের কথা জানিয়ে মিরপুরের ফাহমিদা বলেন, ‘যে সময়টাতে বিদ্যুৎ গেছে, সেটা সাধারণত আমাদের সবার গোসলের সময়। আবার সে সময় বাচ্চারাও স্কুল থেকে ফেরে। বিদ্যুৎ যাওয়ার আধা ঘণ্টা পরেই আমাদের বাসার পানি চলে গেছে। আমাদের একজন বাথরুমে গিয়ে গোসল শেষ করতে পারেনি।’

ছবি- ফোকাস বাংলা

হাসপাতালগুলোতে ব্যাহত চিকিৎসাসেবা :সন্ধ্যা ৬টায় রাজধানীর ঢাকা মেডিক্যাল, মধ্য বাড্ডা ও উত্তর বাড্ডার ইবনে সিনা, পপুলার ও এএমজেড হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, জেনারেটরে চলছে সব হাসপাতাল। জেনারেটরের ওপর চাপ কমাতে এসি ও অপ্রয়োজনীয় লাইট-ফ্যান বন্ধ রাখা হয়েছে। বিদ্যুৎ যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরও ফিরে না আসায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পড়েছে বিপাকে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দ্রুত বিদ্যুৎ না এলে রোগীদের জেনারেটর সেবা দেওয়া কষ্টকর হয়ে যাবে। পেট্রলপাম্পেও তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। পপুলার হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা প্রায় সাড়ে ৪ ঘণ্টা জেনারেটর সার্ভিস দিয়েছি। যেন একেবারে বন্ধ না করতে হয়, সেজন্য হাসপাতালে এসি, লাইট কমিয়ে রেখেছি। এভাবে আরও বেশিক্ষণ চললে রোগীদের সেবা দেওয়া সম্ভব হবে না। এমজেড হাসপাতালের এক কর্মচারী জানান, পেট্রল পাম্পগুলো থেকে ডিজেল নেওয়া যাচ্ছে না। ডিজেল না পেলে জেনারেটর সার্ভিসও বন্ধ হয়ে যাবে। এছাড়া বেশিক্ষণ একটানা জেনারেটর সার্ভিস দিতে পারে না।

ছবি- সংগৃহীত

পোশাক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত :অন্যান্য দিনের মতো পোশাক কারখানাগুলো গতকাল বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা ছিল। তবে দুপুর ২টা থেকে ছুটির আগ পর্যন্ত ছিল জেনারেটরনির্ভর। এতে খরচ যেমন বেড়েছে, আবার পণ্যের কোয়ালিটিও কমেছে বলে জানান শিল্প উদ্যোক্তারা। একই সঙ্গে দ্রুত সমস্যা সমাধানের জন্যও সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান তারা। বিকেএমইএর এক পরিচালক বলেন, ‘বিদ্যুতের সমস্যার কারণে আমাদের কারখানায় উৎপাদনে প্রভাব পড়ছে। বিদ্যুতের মাধ্যমে যে খরচ হয়, জেনারেটরে খরচ অনেক বেড়ে যায়। তবে দুপুর থেকে কারখানা বন্ধ পর্যন্ত কী পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে, সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে পণ্যের মান ও উৎপাদনে প্রভাব পড়বে।’

এ বিষয়ে বিজিএমইএর পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘বিদ্যুতের সমস্যার কারণে আমাদের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিটি কারখানায় জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।’

ছবি- সংগৃহীত

মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের দুর্ভোগ :জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে রাজধানীসহ ২৮ জেলায় টেলিযোগাযোগ সেবা পেতে সমস্যায় পড়েন ব্যবহারকারীরা। মোবাইল ফোনে কল করা কিংবা এসএমএস পাঠানোর ক্ষেত্রে বেশি সমস্যায় পড়েন তারা। আবার কোথাও ইন্টারনেটের সংযোগ পেতেও সমস্যা হয়েছে। মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীরা জানিয়েছেন, তাদের ফোন থেকে কল করতে দীর্ঘ সময় নিচ্ছে। আবার কল গেলেও ঘন ঘন কলড্রপ হচ্ছে। আবার কল গেলেও কথোপকথন চালাতে পারছেন না।

মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটব এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড বিপর্যয়ের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাময়িক সময়ের জন্য টেলিযোগাযোগ সেবা বিঘ্নিত হতে পারে। সাময়িক এমন পরিস্থিতির জন্য অ্যামটব দুঃখ প্রকাশ করেছে।

ইত্তেফাক/এমএএম