বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পোষা প্রাণী কি অসুখ ছড়াচ্ছে?

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২২:৩৮

পশু-পাখি যারা পছন্দ করেন তারা ঘরেও নিজেদের পছন্দের পশু কিংবা পাখি রাখতে চান। অনেকে আবার রেখে দেন। এই পোষ্যটি হতে পারে কুকুর, হতে পারে বিড়াল কিংবা গৃহপালিত যেকোনো পশু। একইসঙ্গে ময়না কিংবা টিয়া পাখিও হতে পারে। নিজেদের প্রিয় প্রাণীটির প্রতি সবারই একটা আলাদা টান থাকে। অনেক সময় দেখা যায় অফিস থেকে ঘরে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে প্রিয় পোষ্যটি দৌঁড়ে কাছে চলে যায়। তাদের সঙ্গে আত্মার নিবিড় একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু এই পোষ্যটি অনেক সময় ঘরে অসুখ ছড়ায়। আপনার সঙ্গেও তাই হচ্ছে না তো? 

শুধু যে পোষা কুকুর, বিড়াল, মুরগি, ছাগল, গরু অসুখ ছড়ায় তা নয়। ঘরে থাকা খরগোশ, ঘোড়া এমনকি টিয়া, ময়নার মতো রকমারি পাখি কিংবা অ্যাকোরারিয়ামে থাকা রংবেরঙের মাছের জন্য জটিল অসুখে আক্রান্ত হতে পারেন মনিব ও তার পরিবার। 

বাড়ির সদস্যদের মনের অনেকটা জায়গা জুড়ে থাকে। আবেগের অংশীদার হয়ে মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে গৃহপালিত পশু-পাখি বাড়ির একজন সদস্য হয়ে ওঠে। আর অনেকেই পোষ্যর সঙ্গে মেশার সময় প্রাথমিক সাবধানতাও অবলম্বন করতে চান না। খানিকটা সচেতনতার অভাবে এই সব নিরীহ জীব থেকে কত বড় রোগ সংক্রমিত হতে পারে তা ভুলে যান। কেউ পোষ্যের সামান্য কামড়ানো বা আঁচড়ানোকে তোয়াক্কা করেন না। ফলে অজান্তে মারাত্মক রোগের কবলে পড়তে হয় প্রভুকে।

গৃহপালিত পশু থেকে হওয়া কিংবা সংক্রামিত বিভিন্ন রোগকে জুনোসিস বলা হয়। এই রোগের ধরন বিভিন্ন হতে পারে। যেমন: 

ব্যাকটেরিয়া বাহিত রোগ যত রোগ 

অ্যানিম্যাল বাইট 
কুকুর, বিড়াল-সহ যে কোনও পশুর মুখের ভিতরে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকে। কোনও মানুষকে কামড়ানোর সময় সেই ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরে প্রবেশ করে যা থেকে ইনফেকশন হয়।

ক্যাট স্ক্র‌্যাচ ফিভার 
বারটোনেল্লা নামে একটি অতি ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া থেকে এই রোগটি হয়। এর ফলে জ্বর হয়, লিম্ফ নোড ফুলে যায়। আঁচড়ের স্থানে ফোসকার মতো হয়। এর চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন।

মাইকোব্যাকটেরিয়াম ইনফেকশন
এই রোগকে মাইকোব্যাকটেরিয়ার গ্রানুলোমাও বলে। অ্যাকোয়ারিয়ামের মাছ দীর্ঘদিন পরিচর্যা করলে হতে পারে। মাছের থেকে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার মানুষের শরীরে প্রবেশের পর প্রধানত হাতের চারদিকে দুই থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে ইনফেকশন হতে দেখা যায়। এর পর তিন থেকে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে ত্বকের কোষে ক্ষতি হয় এবং ক্ষতের সৃষ্টি হয়।

মাইকোব্যাকটেরিয়াম এভিয়াম ইনট্রাকুলার
পাখি ও শুয়োরের দেহ থেকে মানব শরীরে ব্যাকটেরিয়াবাহিত এই রোগটি হতে পারে। গ্ল্যান্ড ফুলে যায়, এডসের মতো দ্রুত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমলে এর প্রকোপ বাড়ে।

সিটাকোসিস
ক্ল্যামিডোফিলা সিট্টাফি নামক একটি ব্যাকটেরিয়া থেকে হয়ে থাকে। টিয়া, পায়রা, কাকাতুয়া, ম্যাকাও, মুরগি, হাঁস-সহ বিভিন্ন পাখির এই রোগ হয়। এদের সংস্পর্শে দীর্ঘদিন থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করে। এই রোগের লক্ষণ হিসাবেও নিউমোনিয়াও হতে পারে।

কিউ ফিভার
এটি কক্সিয়েল্লা বার্নেট্টি নামক একটি ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে হয় যা প্রধানত গরু, ভেড়া ও ছাগলের শরীরে থাকে। কোনও সংক্রামিত এই ধরনের পশুর দ্বারা দূষিত বাতাসে নিঃশ্বাস নিলে কিংবা পশুদের মূত্র থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। ব্যাকটেরিয়া প্রবেশের তিন সপ্তাহের মধ্যে ফ্লু-এর মতো লক্ষণ দেখা যায়। যা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ঠিক হয়ে যেতে পারে। কখনও সুস্থ হতে দীর্ঘদিন লেগে যায়। হার্ট, লিভার, মস্তিষ্ক ও ফুসফুসের ক্ষতি করে।

সালমোনেলাসিস
সালমোনেলা নামক ব্যাকটেরিয়া গবাদি পশুর ক্ষুদ্রান্ত্রে থাকে। আর এই ব্যাকটেরিয়া দ্বারা দূষিত জল বা খাবার থেকে মানুষের শরীরে এই রোগ হয়। এই রোগের লক্ষণ হল ডাইরিয়া, জ্বর, পেটে ব্যথা, বমি ইত্যাদি।

টিউবারকিউলোসিস 
বোভাইন টিউবারকিউলোসিস আমাদের দেশে ব্যতিক্রমী রোগ নয়। বিভিন্ন ধরনের গৃহপালিত পশুর মাধ্যমেই মানুষের শরীরে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে। টিবি রোগের ব্যাকটেরিয়া টিউবারকিউলোসিসের থেকে এটি পৃথক ধরনের ব্যাকটেরিয়া। এই রোগে কখনও কখনও টিবির উপসর্গ দেখা যায় আবার কখনও আলাদা লক্ষণও হতে পারে। ব্রুসোলোসিস, লেপটোস্পাইরোসিস, লিসটেরিওসিস রোগও গরু, ছাগল থেকে ব্যাকটেরিয়া বাহিত রোগ। ফুসফুস ও শরীরের অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আক্রান্ত হয়।

প্রোটোজোয়া বাহিত রোগ যত রোগ 

জিয়ারডিয়া ইনফেকশন
গবাদি পশুর মল, মূত্র থেকে জিয়ারডিয়া প্রোটোজোয়া রোগ ছড়ায়। এই ইনফেকশনের ফলে পেটে ব্যথা, পেট ফুলে যাওয়া, ডাইরিয়া ও কলেরা হতে পারে।

টোক্সোপ্লাসমোসিস
বিড়ালের মল, মূত্র থেকে হয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে এবং বয়স্কদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের এই রোগ হলে বিপদ।

ফাংগাস বাহিত রোগ
গৃহপালিত পশুর থেকে ফাংগাস বাহিত রোগ দাদ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, ত্বকে গোলাকৃতি ইনফেকশন হয়।

পরজীবী বাহিত রোগ

প্রধানত ইকাইনোকক্কাস গ্র‌্যানুলস পরজীবীর কারণে হয় যা কুকুরের ক্ষুদ্রান্ত্রে থাকে। এই পরজীবীর দ্বারা সংক্রামিত কোনও কুকুরের মলের সংস্পর্শে এলে মানুষের শরীরে এই রোগটি হয়। এর ফলে লিভার ও অন্য অঙ্গে সিস্ট হতে পারে।

ভাইরাস বাহিত রোগ

জলাতঙ্ক-কুকুর কামড়ালে বা আঁচড়ালে জলাতঙ্ক হয়। ক্ষত কতটা তার উপর ভ্যাকসিন ও ইমুনোগ্লোবিউলিনের প্রয়োজন হয়। চিকিৎসা না করলে মৃত্যু হতে পারে।

সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে সবাইকে। গৃহপালিত প্রাণীর থাকার জায়গা মল, মূত্র ভালভাবে পরিষ্কার করুন। গৃহপালিত কামড়ে বা আঁচড়ে দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। পরিচর্যার সময় গ্লাভস, বুট-জুতো, অ্যাপ্রন, চশমা ব্যবহার করুন।
গৃহপালিতকে নিয়মিত ভ্যাকসিন দিতে হবে। অসুস্থ হলে পশু চিকিৎসককে দেখান।

পোষ্যটিকে ভ্যাকসিনের আওতায় নিয়ে আসুন। কোন প্রাণীকে কখন ভ্যাকসিন দেবেন তা হলো: 

গরু
অ্যানথ্রাক্স স্পোর ভ্যাকসিন (৪ মাস বয়সে প্রথম। তারপর বর্ষার আগে)।

ছাগল
এফএমডি(ছ’মাস অন্তর), পিপিআর(বছরে একবার)।

কুকুর
কোরোনা ভ্যাকসিন (জন্মের পর ৪২তম দিনে)।

মুরগি
রানিক্ষেত রোগের জন্য এফ১ ভ্যাকসিন, ২৪ দিন বয়সে।

হাঁস
ডাক প্লেগ এড়ানোর ভ্যাকসিন দিতে হবে। জন্মের চার সপ্তাহে।

ভেড়া
সিসিপিপি ভ্যাকসিন (প্রথমে ছ’মাস বয়সে। তারপর বছরে একবার)।

পাখি
পলিমাভাইরাস বুস্টার ডোজ (একবার দেওয়ার পর ২১ দিন অন্তর দিতে হবে)।

পশুর রোম থেকে বাচ্চা ও বয়স্কদের শ্বাসকষ্টের প্রবণতা বাড়ছে। তাই পোষ্যকে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাখা উচিত। পোষ্যর রোমে উকুন হয়। তাই চিরুনি দিয়ে আলতো করে আঁচড়ে দিন। ডেটল দিয়ে ঘর পরিষ্কার করুন। নিজে অসুস্থ থাকলে পোষ্যর কাছাকাছি যাবেন না। আপনার অসুখ পোষ্যর শরীরে ছড়াতে পারে। পোষ্যর মুখে মুখ ঠেকিয়ে আদর করবেন না। পশুর মুখের ব্যাকটেরিয়া থেকে ইনফেকশন হতে পারে। পোষ্যকে প্রোটিন সমৃদ্ধ সুষম খাবার দিন।

ইত্তেফাক/আরএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন