কন্যাশিশুর সুরক্ষার ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ যেমন প্রয়োজন, তেমনি জনসচেতনতাও বিশেষ প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে জনসচেতনতায় আরও মনোযোগ প্রয়োজন। যেকোনো জাতীয় সমস্যা সমাধানে আইনের প্রয়োজন আছে। তবে আইনই সব সমস্যার সমাধান নয়, আমাদের মানসিকতারও পরিবর্তন করতে হবে বলে জানান মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেহের আফরোজ চুমকি, এমপি।
মঙ্গলবার রাজধানীর এফডিসিতে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস-২০২২ উপলক্ষে আয়োজিত ছায়া সংসদে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘আইনের প্রয়োগ নয়, জনসচেতনতাই পারে কন্যাশিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে’ বিষয়ে ছায়া সংসদে বিতর্ক প্রতিযোগিতার যৌথভাবে আয়োজন করে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি ও জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম। আয়োজনে সহযোগিতা করে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি আরও বলেন, সব ধর্মে কন্যাশিশুর জন্য সম্পদ বণ্টনে ন্যায্যতা সুরক্ষা করা উচিৎ। আমাদের দেশে ডিএনএ ল্যাব আছে, ফরেনসিক ল্যাব আছে, যা পৃথিবীর অনেক দেশে নাই। কন্যাশিশুর সুরক্ষার জন্য সর্বক্ষেত্রে সরকার ইতোমধ্যে অনেক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের জন্য কন্যাশিশুদের স্বাবলম্বী করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। কন্যাশিশুরদের পাশাপাশি সমাজে ছেলে শিশুরাও সেক্সচুয়াল হ্যারাজ হয় কিন্তু সমাজে তার বিরূপ প্রতিফলন কন্যাশিশুদের মতো তীব্র হয় না। তাই কন্যাশিশুর সুরক্ষার দায়িত্ব সমাজের সর্বস্তরের শ্রেণি-পেশার মানুষের।
সভাপতির বক্তব্যে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’র চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, বাংলাদেশের ১৮ শতাংশ মেয়ের ১৫ বছর বয়সের মধ্যে বিয়ে হয়। ১৫ থেকে ১৯ বছরের কিশোরীদের ৩১ শতাংশই গর্ভবতী হন। যারা শারিরিক ও মানসিকভাবে সন্তান জন্মদানের জন্য প্রস্তুত নয়। ৪৩ শতাংশ কিশোরী মা গর্ভজনিত সমস্যার কারণে মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকে। বিশ্বে প্রতি ৭ সেকেন্ডে ১৫ বছরের কম বয়সী একটি কন্যাশিশুর বিয়ে হচ্ছে। আফগানিস্তান, ইয়েমেন ও সোমালিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে অল্প বয়সী কন্যাশিশুদের সঙ্গে বেশী বয়সী পুরুষদের বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা খুবই বেশী। ইউনিসেফের তথ্যমতে বর্তমান বিশ্বে ৭০ কোটি মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার। এই ধারা চলতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ের শিকার কন্যাশিশুর সংখ্যা ৯৫ কোটিতে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের শিকার মেয়েদের ২০ শতাংশ ২৪ বছর বয়সের মধ্যেই ২ বা তার অধিক সন্তানের মা হচ্ছে। ফলে প্রসূতি মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে বেগ পেতে হচ্ছে। বাল্যবিবাহ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে অশিক্ষা, দারিদ্র্য, কুসংস্কার, বখাটেদের উৎপাত ও অসচেতনতাকে দায়ী করা যেতে পারে। মেয়েদের একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি যদি টেকনিক্যাল শিক্ষা দেওয়া যায়, তাহলে তারা নিজের ও পরিবারের জন্য কিছু আয় করতে পারবে। এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ড্রপ আউট কন্যাশিশুদের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে তাদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ করা উচিত। এসব বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে বাল্যবিবাহের শিকার সেই মেয়েগুলোর সুরক্ষায় কাজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের সিনিয়র ডিরেক্টর চন্দন জেড গোমেজ ও জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সম্পাদক নাছিমা আক্তার জলি। প্রতিযোগিতায় বিচারক ছিলেন অধ্যাপক আবু মোহাম্মদ রইস, সাংবাদিক সাকিলা জেসমিন ও সাবেক বিতার্কিক কৃষিবিদ ফালগুনী মজুমদার।
প্রতিযোগিতায় বিরোধী দল ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশকে পরাজিত করে সরকারি দল প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এর বিতার্কিকরা বিজয়ী হয়। প্রতিযোগিতা শেষে অংশগ্রহণকারী দলের মাঝে ট্রফি, ক্রেস্ট, নগদ অর্থসহ সনদপত্র প্রদান করা হয়।
