চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেস এখন চলছে - যাতে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংএর তৃতীয় মেয়াদের জন্য ক্ষমতায় থাকা অনুমোদিত হবে বলেই বিশ্লেষকরা বলছেন। বিশ্ব-রাজনীতিতে চীনের নেতৃস্থানীয় ভূমিকাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা, চীনের অর্থনীতি, সামরিক শক্তি, তাইওয়ান প্রশ্ন, - ইত্যাদি ক্ষেত্রে তৃতীয় মেয়াদে কেমন ধরনের পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন মি. শি?
আরো প্রশ্ন, কীভাবে এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে চীনা সরকার?
মি. শি-র ভাষণ ছাড়াও চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রচারণা থেকে এক কিছুটা আভাস পাওয়া যায়।
অনেকের চোখে মনে হতে পারে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রচারণার ভাষা - যাকে বল যায় 'শুষ্ক' এবং বিমূর্ত । কিন্তু অভিজ্ঞরা বলেন, ওই সব ঘোষণার ভেতরেই কিছু সাংকেতিক শব্দ থাকে যাতে ইঙ্গিত দেয়া হয় যে চীনের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতা আসলে কি করতে যাচ্ছেন।
কিছু সাংকেতিক ও অর্থপূর্ণ শব্দ
চীনে কী হচ্ছে, চীন কী করছে - এ নিয়ে বিশ্বের আগ্রহ এখন যে স্তরে উঠেছে - আগে তা কখনোই এমন ছিল না। কিন্তু চীনের রাজনীতি - আগে যেমন ছিল ঠিক তেমনি অস্পষ্ট ও ধোঁয়াটে রয়ে গেছে।
শি জিনপিং এখন চীনে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতা। কমিউনিস্ট চীনের প্রতিষ্ঠাতা মাওজেদংএর পর কেউই তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন হননি - যা শি জিনপিং হতে যাচ্ছেন।
চীনে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হয় রুদ্ধদ্বার বৈঠকে। আর এসব বৈঠকে যে সিদ্ধান্তগুলো হয় - তা জানানো হয় এমন এক ভাষায় যার আসল অর্থ উদ্ধার করা সহজ নয়।
এ কারণেই চীনা কমিউনিস্ট পার্টি কীভাবে কাজ করে, বা তাদের নেতা শি জিনপিংই বা কী করতে চাইছেন - এগুলো বোঝা অনেকসময়ই বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
কিন্তু তাদের কাজের ধারা সম্পর্কে অভিজ্ঞ যারা তারা বলেন, পার্টির ওই শুষ্ক প্রচারণার ভাষার মধ্যে এমন অনেক ইঙ্গিত থাকতে পারে যাতে নেতার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আন্দাজ করা সম্ভব।
চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সবচেয়ে বড় সংবাদপত্র হচ্ছে দ্য পিপলস ডেইলি। এই দৈনিকটির পুরনো সংখ্যাগুলো খুঁজে বিবিসি এমন কিছু সাংকেতিক শব্দ চিহ্নিত করেছে - যা শি জিনপিংএর শাসনামলকে বুঝতে সহায়ক হবে।
কীভাবে শি জিনপিং এত ক্ষমতাধর হলেন?
মাওজেদংএর একটি বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে, "রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস হচ্ছে বন্দুকের নল।" গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর মাও এটা নিশ্চিত করেছিলেন যে চীনের সেনাবাহিনী বা পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) নিয়ন্ত্রণ করবে পার্টি - রাষ্ট্র নয়। তা ছাড়া কমিউনিস্ট পার্টির নেতাই তখন হতেন কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনেরও (সিএমসি) চেয়ারম্যান।
ক্ষমতায় আসার পর শি জিনপিংও সামরিক বাহিনীর ভেতরে থাকা তার বিরোধীদের উচ্ছেদ করতে কোন বিলম্ব করেননি।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাগুলো ঘটেছিল ২০১৪ ও ২০১৫ সালে, যখন সিএমসির ভাইস চেয়ারম্যান শু কাইহু এবং পিএলএর সাবেক জেনারেল গুও বক্সিওংএর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়।
এরা যদিও তখন অবসর নিয়েছিলেন, কিন্তু মি. শি এই পদক্ষেপের মাধ্যমে একটা জোরালো বার্তা দিয়েছিলেন যে সামরিক অফিসারদের কেউ যদি তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় বাধা দেয়, তাহলে তার পরিণাম ভালো হবে না - বলছেন পেন্টাগনের অর্থে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির সিনিয়র ফেলো জোয়েল উটনাও।
২০১৫ সালে মি. শি সামরিক বাহিনীর কাঠামোতে পরিবর্তনে এনে চারটি হেডকোয়ার্টার ভেঙে দেন, এবং ১৫টি ছোট ছোট এজেন্সি প্রতিষ্ঠা করেন। এর ফলে সিএমসির পক্ষে সরাসরি সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন স্তরে আদেশ পাঠানো সম্ভব হলো - এবং মি. শির প্রতি আনুগত্য প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটি জোরদার হলো।
মার্কিন থিংক ট্যাংক র্যান্ড কর্পোরেশনের সিনিয়র প্রতিরক্ষা গবেষক টিমোথি হীথ বলছেন, পার্টির প্রতি চীনা সামরিক বাহিনীর আনুগত্যের মানে হচ্ছে "তাদের কর্তব্য হবে পার্টি এবং বিশেষ করে মি. শি-কে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা।" বিবিসি।
