কাজী মনিরা তরফদার, সহকারী শিক্ষক ( বাংলা )
ঝনকা বাজার উচ্চ বিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।
সুপ্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা, আশা করি তোমরা ভালো আছ। বন্ধুরা বাংলা ভাষাতে কথা বলে আমরা মনের আবেগ যতটা প্রকাশ করতে পারি অন্য ভাষাতে তা পারি না। কেননা এ ভাষাতেই আমরা কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে থাকি। এবং যুগে যুগে হিসাব-নিকাশ থেকে শুরু করে মনের যাবতীয় ভাষিক খোরাক মিটিয়ে থাকি আমাদের মাতৃভাষায়।
বন্ধুরা দৈনন্দিন জীবনে চলতে ফিরতে আমরা নিজেদের প্রয়োজনে অনেক জিনিসপত্র কেনা-বেচা করি, গণনা করি। আবার কোনো কোনো সময় পরিমাণও করে থাকি। আমরা সাধারণত যেসব জিনিস ধরতে ছুঁইতে পারি সেগুলোই গণনা করি। আকাশের তারা আমরা ধরতে পারি না । কিন্তু দেখে দেখে গণনা করতে পারি। আবার বালি কণাও আমরা গণনা করতে পারি না। কিন্তু পরিমাণ করে বলতে পারি। আবার কোনো রূপ, সৌন্দর্য, সেবা, যত্ন, প্রেম, ভালোবাসা গণনা করা সম্ভব নয়। এগুলো অনুভূতি দিয়ে বুঝে নিতে হয়। তাই আমরা বলব বাংলা ব্যাকরণে বিশেষ্য ও সর্বনাম পদের সংখ্যার ধারণাকেই বচন বলে। বচন শব্দের অর্থ সংখ্যার ধারণা। বচন ব্যাকরণের পারিভাষিক শব্দ। যাকে ইংরেজিতে বলা হয় Number.
প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা, তাহলে এসো আজ আমরা “বচন” নিয়ে কিছু আলোচনা করি।
বন্ধুরা, ধর বিকেল বেলা একটি মাঠের একপ্রান্তে ছেলেরা ফুটবল খেলছে। অন্য প্রান্তে দুটি ছেলে মোরগ লড়াই খেলছে। এবং পাশেই একটি ছোট মেয়ে দাঁড়িয়ে সবার খেলা দেখছে। এখন চল আমরা দেখবো ব্যাকরণের ভাষায় এদের কীভাবে প্রকাশ করা যায়। এদেরকে আমরা গণনা করে প্রকাশ করবো। তাহলে আমরা জানলাম বচন হচ্ছে সংখ্যার ধারণা।
বচন দুই প্রকার: ১.একবচন ২. বহুবচন
একবচন: যে শব্দ দ্বারা কোন বস্তু, প্রাণী বা ব্যক্তির একটিমাত্র সংখ্যার ধারণা বোঝায়, তাকে একবচন বলে। যেমন:সিনাম কলেজে পড়ে। ছেলেটি বল খেলে।
বহুবচন:যে শব্দ দ্বারা কোন বস্তু, প্রাণী বা ব্যক্তির একের অধিক সংখ্যার ধারণা বোঝায়, তাকে বহুবচন বলে। যেমন:তারা এসেছে। ছেলেরা মাঠে যায়নি।
এবার আমরা একবচন ও বহুবচন এর কয়েকটি নিয়ম জানবো।
একবচন:১. শুধুমাত্র বিশেষ্য ও সর্বনাম শব্দের বচনভেদ হয়। শব্দের শেষে টা, টি, খানা, খানি ইত্যাদি যোগ করে বিশেষ্যের একবচন নির্দেশ করা হয়। যেমন - বিড়ালটি খুব চালাক। কলমটা আমার। বইখানা আমি পড়েছি।
২. শব্দের আগে এক, একটা, একটি, একজন ইত্যাদি সংখ্যাবাচক শব্দ বসিয়ে। যেমন- এক রাজ্যে এক রাজকুমারী ছিল। আমার একটা কথা ছিল। একজন প্রাক্তন ছাত্র এসেছিল।
বহুবচন:১. বহুবচন প্রকাশের জন্য রা, এরা, গুলি, গুলো, প্রভৃতি বিভক্তি যুক্ত হয়। আবার সমুদয়, সকল, সব, কুল, বৃন্দ বর্গ, মালা, রাশি, আবালি, রাজি প্রভৃতি সমষ্টিবোধক শব্দও ব্যবহূত হয়। তত্সম বা সংস্কৃত ভাষা থেকে এই সমষ্টিবোধক শব্দ গুলোর বেশির ভাগই আগত।
২. প্রাণিবাচক ও অপ্রাণিবাচক এবং ইতর প্রাণিবাচক ও উন্নত প্রাণিবাচক শব্দভেদে বিভিন্ন ধরনের বহু বচনবোধক প্রত্যয় ও সমষ্টিবোধক শব্দ যুক্ত হয়। যেমন: উন্নত প্রাণিবাচক শব্দের সঙ্গে ‘রা’ বিভক্তির ব্যবহার পাওয়া যায়। যেমন: ছাত্রীরা বাগান করেছে।
উন্নত প্রাণিবাচক মনুষ্য শব্দের বহুবচনে ব্যবহূত শব্দ-
** গণ- জনগণ, নরগণ, দেবগণ ইত্যাদি।
** বৃন্দ- শিক্ষকবৃন্দ, ভক্তবৃন্দ, সুধীবৃন্দ ইত্যাদি।
** মণ্ডলী- সম্পাদকমণ্ডলী, শিক্ষকমণ্ডলী ইত্যাদি।
** বর্গ- মন্ত্রীবর্গ, পণ্ডিতবর্গ ইত্যাদি।
** প্রাণিবাচক ও উন্নত প্রাণিবাচক শব্দে বহুবচনে ব্যবহূত শব্দ কুল- বৃক্ষকুল, মাতৃকুল ইত্যাদি।
** সকল- পর্বতসকল, মনুষ্যসকল ইত্যাদি।
** সব- ভাইসব, পাখিসব ইত্যাদি।
** সমূহ- বৃক্ষসমূহ, মনুষ্যসমূহ ইত্যাদি।
৩. অনেক সময় বিশেষ্য ও বিশেষণ পদের দ্বিত্ব প্রয়োগেও বহুবচন সাধিত হয়। যেমন:সাদা সাদা মেঘ, বড় বড় আম, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ইত্যাদি।
৪. সদৃসার্থক শব্দের সঙ্গে সমাসজাত অনির্দিষ্ট বহুবচন। যেমন: মানুষজন, চাকরবাকর, লোকজন, রাজাবাদশা, কাগজপত্র ইত্যাদি।
৫. আগে সংখ্যা বাচক শব্দ বসিয়ে: বিদ্যালয়ে শ চারেক শিক্ষার্থী আছে। পাঁচ কেজি মণ্ডা দিন তো। মাস দুই পরে আমি ঢাকা যাব।
৬. বিশেষ নিয়মে সাধিত বহুবচন। বহুবচন সর্বনাম ও বিশেষ্য , যেমন:মেয়েরা কানাকানি করছে। নজরুলরা প্রতিদিন জন্মায় না । সকলে সব জানে না ।
৭.কতিপয় বিদেশি শব্দে, সে ভাষার অনুসরণে বহুবচন হয়। যেমন: আন যোগে বুজুর্গ-বুজুর্গান , সাহেব-সাহেবান ।
(সুত্র: বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি, অষ্টম শ্রেণি, বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, নবম-দশম শ্রেণি, ও প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, প্রথম খণ্ড, বাংলা একাডেমি)
আরো জানতে চোখ রাখো দৈনিক ইত্তেফাক-এর অনুশীলন পাতায় ও ফেসবুক পেইজের ‘বাংলা বানানের নিয়ম-কানুন’ গ্রুপে। আমরা আছি তোমাদের সাথে সবসময়।
