শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

এবার চিনি নিয়ে কারসাজি

মিল থেকে চিনি সরবরাহ করা হচ্ছে না

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২২, ০৮:৩১

ভোজ্য তেলের পর এবার চিনি নিয়ে কারসাজি করছে একটি চক্র। বাজার থেকে অনেকটা ‘উধাও’ হয়ে গেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটি। অনেক ঘুরে দুই-একটি দোকানে চিনি পাওয়া গেলেও বিক্রি করা হচ্ছে বেশি দামে। শুধু তাই নয়, চিনির সঙ্গে অন্য পণ্য কেনার শর্তও জুড়ে দেওয়া হচ্ছে।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর সবচেয়ে বড় বাজারগুলোর অন্যতম কাওরান বাজারের পাশাপাশি মহাখালী বাজার ও তুরাগ এলাকার নতুনবাজারে খোঁজ নিয়ে এ অবস্থা দেখা যায়। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলেছেন, মিল থেকে চিনি সরবরাহ করা হচ্ছে না। তাই তাদের দোকানেও কোনো চিনি নেই। তারা বলেন, মিলাররা জানিয়েছে, চিনির দাম আরো বাড়বে।

উল্লেখ্য, গত ৬ অক্টোবর সরকার প্রতি কেজি চিনিতে ছয় টাকা বাড়িয়ে খোলা চিনির দাম ৯০ টাকা ও প্যাকেট চিনি ৯৫ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলেন, মূলত :দাম বেঁধে দেওয়ার পর থেকেই বাজারে চিনির সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) গতকাল তাদের বাজারদরের প্রতিবেদনে খুচরাবাজারে চিনি না পাওয়ার বিষয়টি না জানালেও সংস্থাটি জানিয়েছে, বাজারে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। তবে বাজার ঘুরে দেখা গেছে, যে দুই-একটি দোকানে চিনি পাওয়া গেছে তা প্রতি কেজি ১১০ থেকে ১১৫ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।

গতকাল কাওরান বাজারের আলী স্টোর, জব্বার স্টোর ও ভাই ভাই জেনারেল স্টোরে খোঁজ নিয়ে একটি দোকানেও চিনি পাওয়া যায়নি। আলী স্টোরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিক্রেতা বলেন, মিল থেকে কোনো চিনি সরবরাহ করা হচ্ছে না। তাই তাদের দোকানে কোনো চিনি নেই। তিনি বলেন, সরকার কয়েক দিন আগে চিনির যে দর নির্ধারণ করে দিয়েছে, চিনি কোম্পানিগুলো সে দরে চিনি বিক্রি করতে আগ্রহী না। মিলাররা আরো বেশি দাম বাড়াবে বলে সরবরাহকারীরা আমাদের জানিয়েছেন। ভাই ভাই জেনারেল স্টোরের বিক্রেতা কামরুজ্জামান বলেন, গত দুই দিন ধরে তাদের দোকানে কোনো চিনি নেই। তিনি বলেন, চিনির দাম আরো বাড়বে। একই কথা জানিয়ে, তুরাগ এলাকার একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের স্বত্বাধিকারী সাদ্দাম হোসেন বলেছেন, তার দোকানে যে চিনি ছিল তা বিক্রি হয়ে গেছে। নতুন করে কোম্পানিগুলো কোনো চিনি সরবরাহ করছে না।

গতকাল কাওরান বাজারে কথা হয়, বাজার করতে আসা ক্রেতা আমিনুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, তার বাড়ি মহাখালী এলাকায়। কিন্তু মহাখালী বাজারে তিনি চিনি না পেয়ে কাওরান বাজারে এসেছেন। কিন্তু এখানেও তিনি চিনি পাননি। অনেকটা আক্ষেপ করে তিনি বলেন, চিনিতো একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। শিশুরা তাদের খাবারে চিনির ওপর নির্ভরশীল। তাই সরকারের উচিত হটাত্ করে চিনির সংকট কেন হলো তা খুঁজে বের করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।

পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলেছেন, বাজারে প্যাকেটজাত চিনির সরবরাহ একবারেই নেই। খোলা চিনির সরবরাহও কম। পাইকারি বাজারে কিছু খোলা চিনি পাওয়া গেলেও খরচসহ সবমিলিয়ে দাম পড়ছে ১০০ টাকা কেজিরও বেশি। তারপর চিনি পাওয়া যাচ্ছে না।

মিলাররা জানিয়েছেন, গ্যাস সংকটের কারণে চিনি পরিশোধন কারখানাগুলো চাহিদামতো চিনি পরিশোধন করতে পারছে না। ফলে চিনির উত্পাদন কমেছে।

বাংলাদেশ চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি আবুল হাশেম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, বাজারেতো চিনির সরবরাহ নেই। তাহলে চিনি পাওয়া যাবে কীভাবে। তিনি বলেন, আমি মিল থেকে যে চিনি কিনব, তাতো পারছি না। কারণ চিনি নেই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মিলাররা জানিয়েছে, গ্যাসসংকটের কারণে তারা চাহিদামতো চিনি উত্পাদন করতে পারছে না। তাদের উত্পাদন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। এছাড়া, সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চিনির যে দর নির্ধারণ করে দিয়েছে তাতে চিনি বিক্রি করলে তো লোকসান গুণতে হবে।

সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিত্ সাহা এ প্রসঙ্গে বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে তাদের চিনির উত্পাদন অনেক কমে গেছে। তিনি বলেন, আগে মিলগুলো ২৪ ঘণ্টাই গ্যাস পেত। কিন্তু এখন তা চার ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। এর প্রভাব পড়েছে চিনি উত্পাদনের ওপর।

এদিক সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, হঠাত্ করে চিনির সংকটে কড়া নজর রাখছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নিতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা জেলা কার্যালয়ের প্রধান আব্দুল জব্বার মন্ডল গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, হঠাত্ করে চিনির সংকটের কারণ খুঁজে বের করতে আমরা মাঠে নেমেছি। আজ শনিবার আমরা মিলগুলোতে যাব। সেখানে তারা কত দরে চিনি বিক্রি করছে। কী পরিমাণ চিনি বাজারে সরবরাহ করছে। কোনো ধরনের সমস্যা আছে কি না, সে ব্যাপারে খোঁজখবর নেব। কোনো কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চিনির বাজার অস্থিতিশীল করা হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইত্তেফাক/এএইচপি