এতিমখানার দুস্থ নিবাসীদের ভবিষ্যত্ অনিশ্চিত

কুমিল্লায় বিপদে ৩০০ প্রতিষ্ঠান

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২২, ০২:২৫

কুমিল্লার ৭ হাজার দুস্থ শিশু নিবাসীর ভবিষ্যত্ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা আর হতাশার মধ্যে পড়েছে প্রায় ৩০০ এতিমখানা কর্তৃপক্ষ। এসব নিবাসীর কারো বাবা আছে মা নেই, মা আছে বাবা নেই, আবার কারো বাবা-মায়ের বিচ্ছেদসহ নানা কারণে তাদের দায়িত্ব গ্রহণের মতো অভিভাবক নেই। তাদের অনেকে এতিমের চাইতেও অসহায়। সমাজসেবা অধিদপ্তরের নতুন নিয়ম অনুযায়ী এতিম ছাড়া অন্য সব ক্যাটাগরির দুস্থ অসহায় নিবাসীর ক্যাপিটেশন (সরকারি অর্থ বরাদ্দ) বাতিল হওয়ায় এসব এতিমখানা কর্তৃপক্ষ এমন বেকায়দায় পড়েছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মুখে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা এতিমখানাগুলো নতুন নিয়মের কারণে এখন বন্ধের পথে। এ অবস্থায় অধ্যয়নরত এসব দুস্থ নিবাসীকে ছাড়তে হবে এতিমখানা এবং তারা হয়ে পড়বে অভিভাবক ও ঠিকানাহীন। জেলা বেসরকারি এতিমখানা কল্যাণ পরিষদ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

জেলা সমাজসেবা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৪৪ সালের এতিমখানা ও বিধবা সনদ আইন অনুযায়ী পিতা-মাতা এবং আইনগত অভিভাবকহীন ১৮ বছরের কম বয়সের বালক-বালিকাকে এতিম হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০১৩ সালের নীতিমালায় এতিমদের পাশাপাশি সমাজের ১৪ প্রকার অবহেলিত শিশুকে দুস্থ ও অসহায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এতে সমাজের অভিভাবকহীন দুস্থ শিশুরা দেশের সরকারি অর্থ বরাদ্দপ্রাপ্ত বেসরকারি এতিমখানাগুলোতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। এতে অভিভাবকহীন সুবিধাবঞ্চিত কয়েক হাজার শিশুর শিক্ষা এবং বাসস্থানেরও ঠিকানা হয়। সূত্র জানায়, ২০১৫ সালে আরেকটি নীতিমালা করে এতিমখানাগুলোতে অধ্যয়নরত ৫০ ভাগ শিশুর সরকারি অর্থ বরাদ্দ কেটে দেওয়া হয়। এরপর থেকে দেশের অধিকাংশ এতিমখানা বেকায়দায় পড়ে। এতে সামাজিক ও নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে কোনো রকমে চলছিল এতিমখানাগুলো। সম্প্রতি সমাজসেবা অধিদপ্তর ফের নতুন নিয়ম চালু করে। এতে শুধু এতিমদের রেখে অন্য দুস্থদের সরকারি অর্থ বরাদ্দ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এ নিয়মে সমাজের ১৪ প্রকার অবহেলিত দুস্থ শিশুর কলামটি বাদ দেওয়া হয়। এতে কুমিল্লার ১৭টি উপজেলার ২৭৩টি এতিমখানার এতিমদের সঙ্গে অধ্যয়নরত অবহেলিত প্রায় ৭ হাজার দুস্থ শিশু সরকারি অর্থ বরাদ্দ সুবিধা থেকে বাদ পড়ে যায়। এ নিয়মের কারণে কুমিল্লাসহ দেশের ৪ হাজার এতিমখানায় অধ্যয়নরত লক্ষাধিক দুস্থ অসহায় নিবাসীর ভবিষ্যত্ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

কুমিল্লার বিভিন্ন এতিমখানায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব এতিমখানায় এতিমের চাইতে দুস্থদের সংখ্যাই বেশি। তারা এতিমের চেয়েও আরো বেশি অসহায়। জেলার মুরাদনগর উপজেলার রহিমপুর হেজাজিয়া এতিমখানায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে অধ্যয়নরত অধিকাংশ শিশু অসহায়-দুস্থ। এদের কারো বাবা আছে মা নেই, মা আছে বাবা নেই। পারিবারিক কলহ, বাবা মায়ের দূরত্বসহ নানা কারণে তাদের দায়িত্ব গ্রহণের মতো অভিভাবক নেই। সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মাধ্যমে দুস্থ এসব শিশুরা ঠাঁই পেয়েছে এতিমখানায়। অভিন্ন চিত্র ওই উপজেলার কাজিয়াতল খন্দকার অসিউদ্দিন দারুল কোরআন শিশু সদন কমপ্লেক্স, কুমিল্লা কোটবাড়ী জামিয়া মোহাম্মদীয়া শিশু সদন কমপ্লেক্স, দেবিদ্বার দারুল উলুম মাদ্রাসা ও এতিমখানা, হোমনার রামকৃষ্ণপুর ইসলামি শিশু সদন কমপ্লেক্সসহ অধিকাংশ এতিমখানার। বেসরকারি এতিমখানা কল্যাণ পরিষদ কুমিল্লা শাখার সভাপতি হাফেজ বাশারত ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘অসহায় এতিমের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য সমাজের লোকজনও এগিয়ে আসেন। কিন্তু অসহায় অভিভাবকহীন দুস্থদের পুনর্বাসনে তেমনটি দেখা যায় না। তাদের অনেকে এতিমদের চাইতেও অসহায়। তাই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সামাজিক সহায়তা হ্রাসসহ নানা প্রতিকূলতার মাঝেও আমরা অবহেলিত-দুস্থ শিশুদের দায়িত্ব নিয়ে তাদেরকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে আসছিলাম। নতুন নিয়ম সংশোধন করে এতিমখানায় অধ্যয়নরত ৮০ ভাগ নিবাসীকে সরকারি অর্থ বরাদ্দের আওতায় না আনলে এতিমখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। এতে সমাজে দুস্থদের চাপ অনেক বেড়ে যাবে। এ ব্যাপারে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে।’

কুমিল্লা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘সমাজে অনেক দুস্থ অসহায় আছে যাদেরকে সরকারি এতিমখানায় রাখা যায় না, তারা বেসরকারি এতিমখানাগুলোতে আশ্রয় পাচ্ছে। নতুন যে নিয়মটি চালু করা হয়েছে সেটি নীতিমালা নয়, এটি নতুন একটি ছক। এ ছকে এতিম ছাড়া সমাজের দুস্থরা বেসরকারি এতিমখানায় আর সরকারি অর্থ বরাদ্দ পাবে না। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।’

ইত্তেফাক/এএইচপি