সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

চীনে কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেস 

সভাকক্ষ থেকে বের করা হলো সাবেক প্রেসিডেন্টকে

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২২, ০০:৩৭

চীনা কম্যুনিস্ট পার্টি কংগ্রেসের শেষ দিনে বেইজিংয়ের গ্রেট হলে নাটকীয় এক ঘটনা ঘটেছে। হঠাৎ করেই দুজন কর্মকর্তা এসে সাবেক প্রেসিডেন্ট হু জিনতাওকে সভাকক্ষ থেকে বের করে নিয়ে যায়। এ ঘটনার লাইভ ফুটেজ বিশ্ব জুড়ে বেশ আলোড়ন ফেলেছে। নানা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ চলছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পাশের আসনে একেবারে সামনের সারিতে বসেছিলেন ৭৯ বছরের এই নেতা। এদিকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় পেয়েছেন এবং দলের সংবিধান সংশোধন করে তাকে আরো দৃঢ় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক চীনের কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলেন, এই কংগ্রেসের মাধ্যমে শি এমন ক্ষমতা পেলেন যে তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারবেন। তাকে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না।

  • রেব করা হলো সাবেক প্রেসিডেন্টকে

রুদ্ধদ্বার এক বৈঠকের পরপরই লাইভ ক্যামেরার সামনে বৈঠক শুরুর প্রায় পরপরই দেখা যায় দুজন কর্মকর্তা তার কাছে এসে কিছু বলছে। অল্প কিছুক্ষণ পর দেখা যায় সাবেক এই প্রেসিডেন্ট উঠে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট শিকে কিছু বলছেন এবং শি মাথা নাড়ছেন। এরপর ঐ দুই কর্মকর্তা হু জিনতাওকে গ্রেট হলের বাইরে নিয়ে যান। সে সময় একজন কর্মকর্তাকে তার হাত ধরে থাকতে দেখা যায়। বেরিয়ে যাওয়ার পথে হু বসে থাকা প্রধানমন্ত্রী লি কে কিয়াংয়ের কাঁধে হাত দিয়ে টোকা দিয়ে যান। ভিডিও ফুটেজ দেখে অনেকেই ব্যাখ্যা করছেন যে হু জিনতাও বেরুতে চাইছিলেন না কিন্তু বাধ্য হয়েই যেন তাকে সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে হয়। বিশ্বের সব বড় বড় মিডিয়ায় সঙ্গেই সঙ্গেই ঐ খবর ও ভিডিও ফুটেজ প্রকাশিত হয়।

  • কেন হু জিনতাওয়ের এই নাটকীয় প্রস্থান

বেইজিং থেকে বিবিসির সংবাদদাতা স্টিভেন ম্যাকডোনেল বলছেন কংগ্রেস থেকে হু জিনতাওয়ের মতো এত বড় নেতাকে যেভাবে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠছে, কিন্তু চীনা সরকার বা চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এখনো কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। সংবাদদাতা বলছেন দুটো সম্ভাব্য কারণ হতে পারে—এক, হু জিনতাওকে বের করে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে চীনের বর্তমান ক্ষমতার রাজনীতির হয়তো সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। প্রতীকীভাবে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে হু জিনতাও জামানার চিন্তা-চেতনার কোনো জায়গা শি জিনপিংয়ের বর্তমান চীনে আর নেই। এমন খবরও বেরুচ্ছে যে এই ঘটনার পর চীনের জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফরম ওয়েইবো এবং অন্যান্য ওয়েব প্ল্যাটফরম থেকে হু জিনতাও সম্পর্কিত সামপ্রতিক সব খবরাখবর সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অথবা, বিবিসির সংবাদদাতা বলছেন—এমনও হয়তো হতে পারে যে হু জিনতাওয়ের শরীরের অবস্থা এতই খারাপ হয়ে পড়ে যে তাকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়।

সাবেক এই প্রেসিডেন্ট উঠে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট শিকে কিছু বলছেন এবং শি মাথা নাড়ছেন।

দীর্ঘ ফুটেজে দেখা যায় প্রেসিডেন্ট শি হু জিনতাওয়ের দিকে তাকাচ্ছেন এবং হুর বাম পাশে বসা সিনিয়র পার্টি নেতা লি ঝানশু এবং ওয়াং হুনিনকে বেশ উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির বড় সভাগুলো খুবই পরিকল্পনা মাফিক হয়। সে কারণেই অসুস্থতার সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে ক্যামেরার সামনে কেন এই ঘটনা ঘটতে দেওয়া হলো? পরিস্থিতি কি সত্যিই এতটাই জরুরি হয়ে পড়েছিল। তাহলে হু কেন বেরিয়ে যেতে গড়িমসি করছিলেন? হু এর কিছুক্ষণ আগেই সভাকক্ষে এক গোপন বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন। তারপর যখন ক্যামেরা চালানোর অনুমতি দেওয়া হয় তার পরপরই এই ঘটনা। হু জিনতাও ২০০৩ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত চীনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তার শাসনামলে চীন এখনকার চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন পথে ছিল। তিনি চীনকে বাকি বিশ্বের কাছে অনেকটাই উন্মুক্ত করেছিলেন। তার সময়ে ক্ষমতার অনেক ভাগাভাগি ছিল। নেতা হিসাবে তিনি অনেক সহনশীল ছিলেন এবং নতুন নতুন ধারণাকে তিনি গ্রহণ করতেন।

হু জিনতাওয়ের পর শি দল এবং দেশের দায়িত্ব নেওয়ার পর চীনকে অনেকটাই ভিন্ন ধারায় পরিচালিত করতে শুরু করেন। বলা হয়, দলের ভেতর তিনি একচেটিয়া কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। এমনকি নতুন কেন্দ্রীয় কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং এবং ওয়াং ইয়াংয়ের মত লোককে রাখা হয়নি যাদেরকে হুর ঘনিষ্ঠ হিসাবে দেখা হয়। দলের মূল নেতৃত্বে জায়গা পেয়েছেন শির অনুগত লোকজন।

হু জিনতাওকে গ্রেট হলের বাইরে নিয়ে যাওয়ার সময় একজন কর্মকর্তাকে তার হাত ধরে থাকতে দেখা যায়।

  • তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতা আরো দৃঢ় হচ্ছে শির

তৃতীয় মেয়াদে ফের চীনের প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন শি জিনপিং। গতকাল শনিবার বিশ্বের সবচেয়ে বড় কমিউনিস্ট দল চায়না কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কংগ্রেস শেষ হয়েছে। কংগ্রেস শিকে আগামী পাঁচ বছরের জন্য কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ ফোরাম পলিটব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটির (পিএসসি) প্রধান হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে। এ নিয়ে টানা তৃতীয় বারের মতো সিপিসির পলিটব্যুরো কমিটির প্রধানের পদে এলেন ৬৯ বছর বয়সি শি জিনপিং। এর মাধ্যমে মাও সেতুংয়ের পর চীনের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতার তালিকায় নাম লেখা হলো শির। কমিউনিস্ট শাসিত চীনের সংবিধান অনুযায়ী, পার্টির ২৫ সদস্যবিশিষ্ট পলিটব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটির প্রধানই দেশটির রাষ্ট্রপতি হন। শি জিনপিং তৃতীয় বারের মতো এই কমিটির প্রধান হওয়ায় নিশ্চিতভাবেই আরো পাঁচ বছর চীনের রাষ্ট্রপতি থাকছেন তিনি। 

চীনের রাষ্ট্রীয় মিডিয়া সিনহুয়া জানিয়েছে, শনিবার পলিটব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটির প্রধান নির্বাচিত হলেও এই কমিটির বাকি সদস্যরা নির্বাচিত হননি। আজ রবিবার কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হবেন পলিটব্যুরো সদস্যরা। বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে সপ্তাহ জুড়ে চলা সিসিপির পঞ্চবার্ষিক সম্মেলন শেষ হয়েছে গতকাল। গতকাল পার্টিতে ব্যাপক রদবদল আসে, যেখানে লি কেকিয়াংকে সরিয়ে শিকে পার্টির প্রধান করা হয়। তাছাড়া পূর্ণ তালিকা প্রকাশ না করেই প্রায় ২০০ জ্যেষ্ঠ নেতা নিয়ে সিসিপির নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। —বিবিসি ও রয়টার্স

 

ইত্তেফাক/ইআ