কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে মাদকাসক্ত শিশুদের দিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করাইতেছেন দায়িত্বরত কর্মচারীরা। এমন গুরুতর সংবাদটি প্রকাশিত হইয়াছে সহযোগী একটি জাতীয় দৈনিকে। খবরে বলা হইয়াছে যে, আন্তঃনগর, মেইল কিংবা লোকাল ট্রেনের ইঞ্জিন খোলা ও লাগাইবার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া করিয়া যাইতেছে ছিন্নমূল শিশু-কিশোররা!
বলিবার অপেক্ষা রাখে না, শিশুশ্রম আমাদের দেশে নিষিদ্ধ। কেবল তাহাই নহে, শিশুশ্রম নিরসনে আমাদের সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে বাস্তবতা হইল, প্রাতিষ্ঠানিক খাতে শিশুশ্রম না থাকিলেও বাংলাদেশে অনেক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত রহিয়াছে, যেইখানে শিশুশ্রম আদৃত। শ্রম জরিপে দেখা গিয়াছে যে, ৫ হইতে ১৭ বত্সর বয়সের কর্মজীবী শিশুর সংখ্যা প্রায় ৭৫ লক্ষ। ইহার মধ্যে ১৩ লক্ষ শিশু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে সম্পৃক্ত। যদিও বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এ নির্দিষ্টভাবে বলা হইয়াছে, ১৪ বত্সরের নিচে কোনো শিশুকে কাজে নেওয়া যাইবে না। ১৪ হইতে ১৮ বত্সর পর্যন্ত শিশুদের কাজে নেওয়া যাইতে পারে, তবে কোনো ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জন্য নহে। কিন্তু ইহার ব্যত্যয়চিত্র ২০১৯ সালে আসিয়াও আমরা প্রতিনিয়তই দেখিতে পাইতেছি। প্রারম্ভে উত্থাপিত অভিযোগ প্রসঙ্গে স্পষ্টতই বলিতে হয়, যেইখানে ছিন্নমূল শিশুদের কমলাপুর স্টেশনে প্রবেশ করিতে পারিবারই কথা নহে, সেইখানে তাহারা কী করিয়া ট্রেনের ইঞ্জিন খোলা ও লাগাইবার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি করিবার সুযোগ পাইতেছে? অভিযোগ রহিয়াছে যে, শুধু কমলাপুর নহে, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেটসহ বিভিন্ন স্টেশনেও ভোর হইতে মধ্যরাত পর্যন্ত এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করিতেছে শিশুরা। ইহা বুঝিতে রকেট সায়েন্টিস্ট হইবার দরকার নাই যে, এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে উনিশ হইতে বিশ হইলেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটিতে পারে। প্রশ্ন হইল, এই কাজে দায়িত্বরত পয়েন্টম্যানরা কী করেন? তাঁহারা কি যত্সামান্য টাকার বিনিময়ে শিশুদের দিয়া কাজগুলি করাইয়া বসিয়া বসিয়া বেতন লইতেছেন? কেবল এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজই নহে, স্টেশনে অবস্থানরত ট্রেনে পানি দেওয়া, গার্ড ও চালকের মালামাল উঠানো-নামানো হইতে শুরু করিয়া গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজই শিশুদের দ্বারা করানো হইতেছে। তাহা হইলে ইহাই কি উপসংহারে বলিতে হইবে—সংশ্লিষ্টরা এতটাই প্রভাবশালী যে, দীর্ঘদিন ধরিয়া এমন অনিয়ম করিয়াও কখনই তাহাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইতেছে না? আমরা আশা করিব সংবাদের সত্যতা যাচাই করিয়া অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে। অন্যদিকে সরিষার মধ্যে ভূত থাকিলে সেই ভূত তাড়াইবারও ব্যবস্থা করিতে হইবে।
রাষ্ট্র, সমাজ ও সচেতন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির দায়িত্ব শিশুদের অধিকার রক্ষা করা। শিশুশ্রম দিবসে কেবল গত্বাঁধা সুন্দর-সুন্দর কথা বলিয়া শিশুশ্রম নিরসন করা যাইবে না। মনে রাখিতে হইবে, আমরা মধ্যম আয়ের দেশের দিকে অগ্রসর হইতেছি, এসডিজিতে ২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্যমাত্রা আছে। এই লক্ষ্য অর্জন করিতে হইলে শিশুশ্রম নিরসনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনাকে আরো জোরদার করিতে হইবে।
