মাহবুবুল হক ইকবাল
গত পহেলা জুন দৈনিক ইত্তেফাকের ‘মানিক মিয়াকে যেন বিস্মৃত না হই’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে করা কয়েকটি প্রশ্ন ও বাক্য—‘তাহাকে স্মরণে রাখিবার, শ্রদ্ধায় রাখিবার; তাঁহার দৃষ্টিভঙ্গি, তাঁহার আদর্শ, দেশপ্রেম, কঠোর পরিশ্রম স্মৃতিতে রাখিবার দায় কি কেবল তাঁহারই প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান দৈনিক ইত্তেফাকের, নাকি গোটা জাতির? মানিক মিয়া কি শুধুই ইত্তেফাকের সম্পদ, নাকি গোটা জাতির? এই প্রশ্ন রাখিবার উপযুক্ত স্থানও কমিয়া আসিতেছে। বর্তমানকালে মানিক মিয়ার নাম উচ্চারিত হইলেই তাঁহাকে ‘নির্ভীক সাংবাদিক’, ‘সাংবাদিকতার পথিকৃত্’ বলিয়া আমরা দায় শেষ করিতেছি...।’ সম্পাদকীয়টি পাঠ করে মনে হচ্ছে—মানিক মিয়া যে এখনো বেঁচে আছেন, ইত্তেফাক এখনো বেঁচে আছে বলে। বিগত বছরগুলোতে দেখে আসছি মানিক মিয়ার মৃত্যুবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয় শুধুমাত্র ইত্তেফাক পরিবারে।
বাঙালি জাতীয়তার জাগরণে এবং তার সংগ্রামে মোসাফিরের লেখনিকে ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের লেখনির সঙ্গে তুলনা করা হয়। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকারের ভরাডুবিতে মানিক মিয়ার লেখনি অবস্মরণীয়। ১৯৬৬ সালে ছয় দফার সমর্থনে লিখে মানিক মিয়াই তাকে গণমুখী করেন। এজন্য তাঁকে জেলে যেতে হয় এবং তাঁর পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। মানিক মিয়া পশ্চিম পাকিস্তানিদের এতটাই রোষানলে ছিলেন, তাঁর মৃত্যুর ১ বছর ৮ মাস ২৪ দিনের মাথায় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালোরাতে ইত্তেফাক ভবন ও প্রেস পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ইত্তেফাক ছিল বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের কণ্ঠস্বর। মানিক মিয়া ছিলেন মুক্তিসংগ্রামের মন্ত্রগুরু। কোথায় ছিলেন না মানিক মিয়া? ১৯৫৮-এর আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে, ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠান আয়োজনে, ১৯৬৪ সালে জানুয়ারিতে দাঙ্গাবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের প্রধান উদ্যোক্তাদেরও একজন ছিলেন মানিক মিয়া। মানিক মিয়া সেই দুর্দিনে তাঁর ক্ষুরধার লেখনির মাধ্যমে শক্তি ও সাহস জুগিয়ে ঘুমন্ত মানুষগুলোকে জাগিয়ে তোলেন। নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেন এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রটিও প্রস্তুত করেন। এটি এখন যতটা সহজে বলা যায় তখনকার পরিস্থিতিতে তা মোটেই সহজ ছিল না। পদে পদে বাধা। কিন্তু নীতির প্রশ্নে, বাংলার মানুষের অধিকারের বিষয়ে মানিক মিয়া কখনো আপস করেননি। তাঁর সমগ্র সত্তা জুড়ে ছিল দেশের অধিকার বঞ্চিত মানুষের মুক্তির স্বপ্ন।
তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী পালনে দেশের সকল রাজনৈতিক দলের এগিয়ে আসা উচিত। দেশের সকল প্রেসক্লাবে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী কেন পালিত হলো না? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা আর ইতিহাস বিভাগ কেন কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করল না? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ খোলার ব্যাপারে মানিক মিয়ার অবদান বিশাল।
তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে আমাদের নিজেদের স্বার্থেই স্মরণ করা উচিত। স্বাধীন বাংলাদেশ মানিক মিয়া কাছে ঋণী। ১ জুন ২০১৯ তারিখে ড. সাখাওয়াত আলী খান ‘মানিক মিয়ার স্মৃতি রক্ষায় কী করা যায়?’ শীর্ষক লেখায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে ‘মানিক মিয়া চেয়ার’ সৃষ্টির প্রস্তাব করেছেন। এতে মানিক মিয়ার কর্ম ও জীবনের উপর প্রামাণ্য গবেষণার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হবে। তাঁর নামে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে কৃতী সাংবাদিকদের জন্য বড় আকারে আন্তর্জাতিক পুরস্কারের ব্যবস্থা করারও প্রস্তাব করেছেন তিনি। প্রস্তাব দুটি নিঃসন্দেহে উত্তম। মানিক মিয়া বরিশালের কৃতী সন্তান। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হল তাঁর নামে নামকরণ করা যেতে পারে। গত ৩০ মে ইত্তেফাক পাঠে জানলাম, পাল্টে যাচ্ছে শিক্ষাক্রম আর ২০২১ সাল থেকে বদলে যাচ্ছে বই। বদলে যাওয়া মাধ্যমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের প্রত্যেক শ্রেণির বাংলা বইয়ে মানিক মিয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি ভাষণ কিংবা তাঁর লিখিত ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ কলাম থেকে একটি করে লেখা ‘প্রবন্ধ’ হিসেবে পাঠ্যভুক্ত করা যেতে পারে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস—আদর্শবিবর্জিত রাজনীতি আর বাণিজ্যিক সাংবাদিকতাকে পাশ কাটিয়ে তরুণ প্রজন্ম মানিক মিয়াকে নিশ্চয়ই স্মরণ করবে এবং বারবার ফিরিয়ে আনবে।
বরিশাল
