শনিবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৩, ১৪ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সার্জারি চিকিৎসায় দেশে দক্ষ অ্যানেসথেসিওলজিস্ট সংকট

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২২, ০৭:০৩

দেশে অ্যানেসথেসিওলজিস্টের সংকট কাটছে না। চাহিদা অনুপাতে দক্ষ জনবল সৃষ্টি হচ্ছে না। চিকিৎসকরা জানান, প্রাইভেট চেম্বার করে রোগী দেখার সুযোগ নেই, উপযুক্ত ফি পাওয়া যায় না, সার্জনদের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। এসব কারণে মেডিক্যালের শিক্ষার্থীরা এই বিষয়ে পড়ালেখায় আগ্রহী হচ্ছে না। দেশের উপজেলা হাসপাতালগুলোতে অ্যানেসথেসিওলজিস্টের সৃজন করা পদ থাকলেও চিকিৎসক নেই। দেশে এই বিষয়ে এমডি ও এফসিপিএস ডিগ্রিধারী একশর বেশি নেই। বিভিন্ন স্থানে দুই বছরমেয়াদি ডিপ্লোমাধারী অ্যানেসথেসিওলজিস্টরা সার্জারি চিকিৎসায় অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগ করছেন। ফলে এই বিষয়ে দেশে দক্ষ জনবলের চরম সংকট রয়েছে।

পুরো দেশে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে অ্যানেসথেসিওলজিস্টের সংকট বিরাজ করছে। চাহিদা অনুপাতে অ্যানেসথেসিওলজিস্ট সৃষ্টি হচ্ছে না। এতে উপজেলা পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালগুলোতে অ্যানেসথেসিওলজিস্ট না থাকায় সার্জারি চিকিৎসায় অচলাবস্থা বিরাজ করছে। ওটি সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অপারেশন ছাড়াও গাইনি রোগীদের সিজারিয়ান করা যাচ্ছে না। আইসিইউ চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য ক্রিটিক্যাল মেডিসিনের ডিগ্রিধারী হতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে হাসপাতালগুলোতে অ্যানেসথেসিওলজিস্টরা আইসিইউ চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। ফলে আইসিইউ পরিচালনার জন্য ক্রিটিক্যাল মেডিসিনের চিকিৎসক সংকট আরো প্রকট।

চট্টগ্রামে উপজেলা পর্যায়ে ৫০ ও ৩১ শয্যার ১৬টি সরকারি হাসপাতাল রয়েছে। জনবলের অর্গানোগ্রামে অ্যানেসথেসিওলজিস্টের পদও সৃজন রয়েছে। কিন্তু অ্যানেসথেসিওলজিস্ট কর্মরত নেই। এতে সার্জারি চিকিৎসা করা যাচ্ছে না। ফলে দেখা যাচ্ছে সরকারি বেসরকারি বড় কয়েকটি হাসপাতালে সার্জারি ও সিজারিয়ান চিকিৎসা সীমাবদ্ধ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, অ্যানেসথেসিয়া বিষয়ে পড়ালেখায় মেডিক্যালের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ নেই। ফলে অ্যানেসথেসিওলজিস্ট সৃষ্টি হচ্ছে না। কারণ, এসব চিকিৎসক প্রাইভেট চেম্বার করে বাড়তি আয়ের সুযোগ নেই। নামের পাশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক লেখা যায় না। রোগীর অপারেশনের জন্য সার্জারি চিকিৎসক টিমের প্রধান হিসাবে থাকেন। তিনিই রোগীর সঙ্গে নির্ধারিত টাকায় চুক্তি করেন। ফলে সার্জারি চিকিৎসকের ওপর অ্যানেসথেসিওলজিস্টের কর্ম নির্ভর করে। চিকিৎসক খরচ যা দেন, তারা তাই পেয়ে থাকেন। পর্যাপ্ত চিকিৎসা ফি পাওয়া যায় না। ফলে এই বিষয়ে দক্ষ জনবল সৃষ্টি হচ্ছে না।

অনেকেই অভিযোগ করেছেন বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে অদক্ষ ও ডিপ্লোমাধারী অ্যানেসথেসিওলজিস্ট দিয়ে অপারেশনের রোগীদের অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া হয়। এতে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে। এমনকি রোগী মারাও যাচ্ছে। অ্যানেসথেসিয়া বিষয়ে পাঁচ বছরমেয়াদি এফসিপিএস ও এমডি কোর্স চালু রয়েছে। পাশাপাশি দুই বছরমেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্সও চালু রয়েছে। দেশে বর্তমানে প্রায় আড়াই হাজারের মতো অ্যানেসথেসিওলজিস্ট রয়েছে। তার মধ্যে এফসিপিএস ও এমডি ডিগ্রিধারী চিকিৎসক একশর বেশি নেই। বাকিরা দুই বছরমেয়াদি ডিপ্লোমাধারী অ্যানেসথেসিওলজিস্ট।

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, অপারেশনের রোগীকে অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। সাবজেটও অন্যান্য বিষয় থেকে কঠিন। কিন্তু পরিশ্রম অনুপাতে ফি পাওয়া যায় না। সার্জারিতে অ্যানেসথেসিওলজিস্ট ফি আলাদাভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত। এখন সার্জনরা যা দেন তা-ই পাই। আয়ের সুবিধা কম থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ কম থাকে।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের সব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দুই বছরমেয়াদি অ্যানেসথেসিওলজিস্ট কোর্স চালু আছে। কিন্তু শিক্ষার্থীর পরিমাণ খুবই কম। চমেক হাসপাতালে অ্যানেসথেসিওলজিস্টের ওপর  পাঁচ বছরমেয়াদি এফসিপিএস ও এমডি কোর্স চালু রয়েছে। ডিপ্লোমা কোর্সে ৩০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এছাড়া ১৮ জন শিক্ষার্থী এমডি কোর্সে ও এক জন এফসিপিএস কোর্সে প্রশিক্ষণার্থী রয়েছে। চমেক হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. হারুণ অর রশিদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘নানা কারণে মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের এই বিষয়ে পড়ালেখায় অনীহা রয়েছে। অপারেশন নিয়ে সার্জনদের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। এখন অনেক ক্ষেত্রে সার্জনরা এমডি করা অ্যানেসথেসিওলজিস্টদের ফি বেশি দিতে হবে মনে করে নিতে চায় না। একটা রোগীর জন্য তিন-চার ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করতে হয়। কিন্তু সেই অনুপাতে ফি পাওয়া যায় না। বিষয়ও অনেক কঠিন। এমডি ও এফসিপিএস করা দেশে প্রায় ১০০ জনের মতো হতে পারে। ডিপ্লোমাধারীরাই বিভিন্ন হাসপাতালে অ্যানেসথেসিয়া দিয়ে যাচ্ছে।’

 

 

ইত্তেফাক/ইআ