শনিবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২১ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আবাসিক এলাকায় নীরবে দূষণ ঘটাচ্ছে ছোট আকারের টেক্সটাইল শিল্প: গবেষণা

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২২, ২১:৪৫

কলকারখানা থেকে নির্গত দূষিত জলের পরিবেশগত ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় শিল্পাঞ্চলগুলোতে কঠোরভাবে তরল বর্জ্য পরিশোধকের (ইটিপি) ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু আবাসিক এলাকায় ছোট পরিসরে গড়ে ওঠা টেক্সটাইল শিল্প-কারখানাগুলো নীরবে পানি দূষণ করে চলেছে, যা নিকটস্থ জলাশয়গুলোর বাস্তুতন্ত্রকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এসব ক্ষতিকর-বিষাক্ত উপাদান খাদ্যশৃঙ্খলেও যুক্ত হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস্ (বিইউপি)-এর পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের একদল গবেষকের করা গবেষণা প্রতিবেদনে, মিরপুর সেকশন-৭ ও শিয়ালবাড়ি সংলগ্ন আবাসিক এলাকায়, বিভিন্ন ধরনের ছোট ছোট টেক্সটাইল শিল্প-কারখানা কর্তৃক পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্ধারিত মানদণ্ড লঙ্ঘনের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। 'ইমার্জিং স্মল স্কেল টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিজ ইন রেসিডেন্সিয়াল এরিয়াজ অব মিরপুর, ঢাকা সিটি, বাংলাদেশ: অ্যান অ্যাসেসমেন্ট অব দ্য ডিসচার্জড্ ওয়েস্ট-ওয়াটার কোয়ালিটি অ্যান্ড পোটেনশিয়াল ইমপ্যাক্টস' শিরোনামে তাদের এ গবেষণাকর্মটি 'ন্যাচার স্প্রিংগার'-এর 'এনভায়রনমেন্টাল মনিটরিং অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্ট' জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষক দলটির প্রধান খাদিজা আক্তার তানিয়া বলেন, 'আমরা মিরপুরের ওই এলাকায় থাকা টেক্সটাইল কারখানাগুলো থেকে নিষ্কাশন হওয়া পানীয় বর্জ্যে দ্রবীভূত অক্সিজেন (ডিও), দ্রবীভূত মোট কঠিন পদার্থ (টিডিএস), স্থিত মোট কঠিন পদার্থ (টিএসএস), তড়িৎ পরিবাহকত্ব (ইসি), জৈব রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা (বিওডি), এবং রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা (সিওডি)-এর মতো ভৌত-রাসায়নিক মান নির্ণায়কের পরিমাণ বিশ্লেষণ করে পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্ধারিত ন্যূণতম মানের চেয়েও অনেক বেশি মাত্রায় এদের উপস্থিতি শনাক্ত ও পরিমাপ করেছি।'

গবেষক দলটির অধীক্ষক ও বিইউপি'র প্রভাষক মো. আরিফুর রহমান ভূঁইয়া জানান, আবাসিক এলাকায় ছোট আকারের টেক্সটাইল কোম্পানিগুলোর অপরিকল্পিত বিস্তার ঘটছে। তবে তাদের পরিসর ছোট হওয়ায় ও স্বল্প উৎপাদন ক্ষমতা থাকায় তা সেভাবে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয় না। অথচ এ ধরনের কারখানাগুলোই পার্শ্ববর্তী এলাকায় থাকা জলাশয়গুলোতে মারাত্মক পানি দূষণ ঘটাচ্ছে। তাই এটি স্পষ্ট যে, এসব ছোট আকারের টেক্সটাইল শিল্পকারখানাগুলোকে যথাযথ নজরদারির আওতায় আনতে হবে, কেননা নীরবে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় ঘটে যাচ্ছে।

গবেষক দলটির ভাষ্যমতে, এসমস্ত ছোট-আকারের প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে নিঃসৃত বর্জ্য জল বড় আকারের শিল্পের মতোই বিষাক্ত, কারণ আবাসিক এলাকার বেশিরভাগ শিল্পকারখানার বর্জ্য-ই পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে। ফলস্বরূপ, এগুলো আশেপাশের পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব তো ফেলবেই, পাশাপাশি নিকটস্থ জলাশয়গুলোর বাস্তুতন্ত্রকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করবে। খাদ্যশৃঙ্খলেও বিষাক্ত উপাদান মিশে গিয়ে তা জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলবে।

প্রকাশিত গবেষণাপত্রে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানকল্পে কিছু উদ্যোগ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। যেমন- পরিবেশবান্ধব টেক্সটাইল ডাইং প্রক্রিয়া উদ্ভাবন, কারখানাগুলোতে নিজস্ব পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রয়োগ, প্রতিটি কারখানায় তরল ব্যর্জ শোধক (ইটিপি) স্থাপন, এবং ইতোমধ্যে স্থাপিত ছোট আকারের শিল্প কারখানাগুলোর পুনঃউন্নয়ন সাধন। 

এছাড়া আবাসিক এলাকাসমূহ থেকে এসব টেক্সটাইল শিল্পকারখানাগুলোকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার ব্যপারেও সরকারি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে, কেননা আবাসিক এলাকাগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই ইটিপি স্থাপনে পর্যাপ্ত স্থান সংকুলান হবে না। শুধু টেক্সটাইল শিল্পকারখানাই নয়, আবাসিক এলাকায় যেকোনো ধরনের শিল্প কারখানা স্থাপনই সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার জোর দাবি জানিয়েছেন গবেষকরা।

ইত্তেফাক/এসটিএম