বিভাগীয় নগরী রংপুরে গণসমাবেশকে ঘিরে বিএনপির নেতা-কর্মীরা পুলিশের হয়রানির আশঙ্কা করছেন। এই গণসমাবেশকে ঘিরে যে কোনো ধরনের নাশকতা বা বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে পুলিশ।
শুক্রবার (২৮ অক্টোবর) সকাল থেকে পুলিশের বিশেষ-বিশেষ দল জেলা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার ক্রাইম আবু মারুফ হেসেন।
বিএনপি সমাবেশ সফল করতে সকল প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই সম্পন্ন করেছে বলে জানিয়েছেন সমাবেশের আয়োজক কমিটি। এই গণসমাবেশকে ঘিরে নেতা-কর্মীরা নানা ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছেন। এদিকে এরই মধ্যে আজ শুক্রবার (২৮ অক্টোবর) ভোর থেকে শনিবার (২৯ অক্টোবর) সন্ধ্যা পর্যন্ত ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে রংপুর জেলা মোটর মালিক সমিতি। ফলে দলীয় নেতা-কর্মীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। ভোগান্তির কথা চিন্তা করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ। তবে এবারের গণসমাবেশে দলীয় নেতা-কর্মীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। তারা ‘চলো চলো রংপুর চলো’ স্লোগান দিয়ে পায়ে হেঁটে সমাবেশ স্থলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ইতোমধ্যে রওনা হয়েছেন সভাস্থলে।
এদিকে গণসমাবেশের জন্য জিলা স্কুল মাঠ চেয়ে বিএনপি আবেদন করলেও মহানগর পুলিশ মৌখিক অনুমতি দিয়েছে কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে। অনুমতি পাওয়ার পর থেকেই গত তিনদিন ধরে দলীয় নেতা-কর্মীদের একটি অংশ রংপুর কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে অবস্থান নিয়ে মঞ্চ তৈরির কাজ সম্পন্ন করেছেন। রংপুর নগরীসহ বিভাগের সকল জেলা-উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন এমনকি ওয়ার্ড-গ্রাম পর্যন্ত বিএনপির পোস্টার- ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে। এরই মধ্যে দলীয় নেতাকর্মীরা পায়ে হেঁটে রংপুরের গণসমাবেশে অংশ নিতে আগে থেকেই হাজির হচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার অনেক নেতাকর্মী নগরীর আবাসিক হোটেল, ছাত্রাবাস, স্বজন, পরিজন ছাড়াও নগরীর বাইরে বিভিন্ন উপজেলার আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে অবস্থান নিয়েছেন। আজ শুক্রবারের মধ্যেই সমাবেশের ৬০ ভাগ লোক রংপুরে প্রবেশ করবে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা। পুলিশ নেতা-কর্মীদের এখনও গ্রেফতার না করলেও ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ নানা হয়রানিরর আশঙ্কা করছেন দলের নেতা-কর্মীরা।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এছাড়া দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেগম সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ. জেড .এম জাহিদ হোসেন, যুগ্ম মহাসচিব ও সংসদ সদস্য হারুন অর রশিদ, রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুসহ কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় বিএনপি এবং অঙ্গ সংগঠনের নেতারা উপস্থিত থাকবেন।
লালমনিরহাটের পাটগ্রামের শ্রীরামপুর ইউনিয়নের আজিজপুর গ্রাম থেকে সমাবেশস্থলে এসেছেন মোস্তাফিজুর রহমান (৪৬) ও রহিদুল ইসলাম (৪০)। তারা বলেন, গত বুধবার সন্ধ্যায় ট্রেনে করে পাটগ্রাম থেকে রংপুর স্টেশনে এসে পৌঁছেছি। রংপুর রেল স্টেশনে চিড়া-মুড়ি খেয়ে রাত যাপনের পর বৃহস্পতিবার সকালে সমাবেশস্থলে উপস্থিত হয়েছেন। সঙ্গে কম্বলও এনেছেন। ২৯ অক্টোবর সমাবেশ শেষে বাড়ি ফিরবেন।
গাইবান্ধার সাঘাটার ঘুড়িদহ থেকে এসেছেন আরিফুল ইসলাম, কুড়িগ্রমের রাজারহাটের সাদ্দাম হোসেন ও গোবিন্দগঞ্জ মহিমাগঞ্জের জাহিদুল ইসলামসহ অনেকেই। তাদের আতঙ্ক যদি গাড়ি-ঘোড়া বন্ধ থাকে, পথে বাধা দেওয়া হয়, মারামারি হয় তাহলে তো সমাবেশে আসতে পারবো না, এ জন্য আগেই আসা।
রংপুর জেলা বিএনপির আহবায়ক সাইফুল ইসলাম বলেন, রংপুর জিলা স্কুল মাঠে অনুমতি না দেওয়ার মাধ্যমে সরকার এবং প্রশাসন বার্তা দিয়েছে। তারা আমাদের গণসমাবেশ বাধাগ্রস্থ করার পাঁয়তারা করছেন। এজন্য সরকারের যোগসাজসে পরিবহন ধর্মঘট ডাক দেওয়া হয়েছে। সকল ধরনের বাধা অতিক্রম করে নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ গণসমাবেশে উপস্থিত হবেই।
রংপুর মহানগর বিএনপির আহবায়ক সামসুজ্জামান সামু বলেন, কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠের মিনারের সামনেই কাঠ ও বাঁশ দিয়ে ৫০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২৫ প্রস্থ ফুট প্রস্থের মঞ্চ তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। মাঠের পাশে কয়েকটি গেটও করা হচ্ছে।
তিনি জানান, পুলিশ চীনের প্রাচীর দিলেও মানুষের স্রোত আটকাতে পারবে না। সমাবেশস্থলের লোকজন বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে আসতে শুরু করেছে। নেতা-কর্মীদের আটক বা গ্রেফতার করা না হলেও সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা নেতা-কর্মীদের বিষয়ে খোঁজ করা হচ্ছে।
রংপুর জেলা যুবদলের সভাপতি নাজমুল আলম নাজু বলেন, গণসমাবেশ সফল করতে সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। গণসমাবেশে কমপক্ষে পাঁচ লক্ষাধিক লোকের সমাগম হবে। কোনো বাধাই এই সমাবেশ ঠেকাতে পারবে না।
এদিকে রংপুরে বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশের দুদিন আগেই পরিবহন ধর্মঘট আহবান করেছে রংপুর জেলা মোটর মালিক সমিতি। অবৈধ যানচলাচল বন্ধের দাবিতে শুক্রবার ভোর ৬টা থেকে শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলবে এ ধর্মঘট। শুক্রবার ধর্মঘট ডাকা হলেও বৃহস্পতিবার থেকে সড়ক পথে যানবাহন চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে।
জেলা মোটর মালিক সমিতির সভাপতি একেএম মোজাম্মেল হক বলেন, মহাসড়কে নিরাপত্তার জন্য পরিবহন মালিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার আইন করেছে। কিন্তু রংপুরের মহাসড়কগুলোতে এখনো নছিমন, করিমন, ভটভটিসহ বিভিন্ন অবৈধ যানবাহন চলাচল করছে। এ জন্য প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। এমন অবস্থায় মহাসড়কে এসব যান চলাচল বন্ধের জন্য আমরা কয়েকটি সংগঠন মিলে সভা করে রংপুরের সকল সড়ক পথে ওই পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দিয়েছি।
রংপুর বিভাগীয় গণসমাবেশ বাস্তবায়ন কমিটির সমন্বয়ক ও বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে প্রায় সোয়া মাস আগেই সমাবেশের জন্য রংপুর জিলা স্কুল মাঠের জন্য আবেদন করা হয়েছিল। সে অনুযায়ী পোস্টারিংসহ প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়। কিন্তু অন্তিম মুহূর্তে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার আমাদের গণসমাবেশের জন্য কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে মৌখিক অনমুতি প্রদান করেছেন। প্রশাসনের প্রতি সম্মান জানিয়ে কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে মঞ্চ তৈরিসহ অন্যান্য কাজ চালাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, রংপুর বিভাগীয় গণ-সমাবেশ হবে একটি পরিচ্ছন্ন সমাবেশ। স্মরণকালের সর্ববৃহৎ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে আমাদের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। শুধু বিএনপি নেতাকর্মী নয়, তৃণমূল, নগর, শহর ও বন্দরের সাধারণ মানুষরাও এই কর্মসূচিতে অংশ নিবেন।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার নুরে আলম মিনা সাংবাদিদের জানিয়েছেন, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন, বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তারা যে কোনো ধরনের সহিংসতা ঠেকাতে পুলিশ প্রস্তুত। তাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য আছে রংপুরের মিঠাপুকুর ও পীরগাছা থেকে বিএনপির সমাবেশে বিপুল সংখ্যক জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী উপস্থিত থাকবে। এ জন্য তারা রংপুর কারমাইকেল কলেজের আশেপাশে ও আশরতপুরসহ দর্শনা মোড়ে শিবির নিয়ন্ত্রিত ছাত্রাবাসগুলোতে অবস্থান নিচ্ছে। সেখান থেকে তারা সমাবেশ উপস্থিত থেকে যেন কোনো নাশকতা ঘটিয়ে অন্য কারো ওপর দায় চাপাতে না পারে সে জন্য পুলিশের পক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুলিশ পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করে যাবে শেষ পর্যন্ত। কোনো উস্কানি বা কোনো ধরনের উত্তেজনা যেন কোন সংঘাতে রূপ না নেয় সে জন্য সাদা পোষাকে নগরীতে ও সমাবেশস্থলের চারপাশে গোয়েন্দা সংস্থাসহ সাদা পোষাকে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। পুলিশ সদস্যরা যেন পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে সে জন্য প্রায় দেড় হাজারের অধিক পুলিশ সদস্যকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তাদের কি পরিস্থিতিতে কি করতে হবে সে সম্পর্কে আগাম জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটি রাজনৈতিক দল সমাবেশ করতেই পারে। আমরা সেটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ থেকে দেখছি। এই সমাবেশকে কেন্দ্র করে কিছু সংগঠন একই মাঠে অভিন্ন সমাবেশের অনুমতি চাইলে আমরা তাদের বুঝিয়ে নিভৃত করেছি। আমরা সমাবেশ সকল ধরনের নিরাপত্তা ও নাশকতার কথা বিবেচনা করে নগরীর সকল প্রবশে পথে শুক্রবার সকাল থেকে চেকপোস্ট বসিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তুতি নিয়েছি।
