চালের দাম বাড়ে, ডালের দাম বাড়ে। বাড়ে মাছমাংস, সবজি, তেল, নুনসহ সব কিছুর দাম। কিন্তু বাড়ে না শুধু আমাদের মতো দিনমজুরের শ্রমঘামের দাম। আগে দিনে ছয় ঘণ্টা কাজ করতাম। এখন আট ঘণ্টা। তাহলে কাজের সময় বাড়লে কেন মজুরি বাড়বে না, এমন প্রশ্ন সুষমা নকরেকের।
সুষমার বাড়ি টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার ধরাটি গ্রামে। বংশাই নদীর পূর্ব পাড়ে লালমাটির পাহাড়ি টিলায় উত্তর-দক্ষিণে অগোছালো গারো গ্রাম ধরাটি। সেই গ্রামের মাটির দেয়াল আর পুরোনো টিনের ছাউনির ছোট্ট ঘরে চার সদস্যের পরিবার নিয়ে তার বসবাস। জমিজমা বলতে শুধু বাড়িভিটা। স্বামী ফ্রান্সিস বেশ অনেকদিন ধরে অসুস্থ। তাই সংসারের হাল তাকে একাই ধরতে হয়। তাছাড়া মাতৃতান্ত্রিক পরিবারের দরুন বাইরে কাজকর্ম ও দায়িত্বের প্রায় পুরোটাই সারতে হয় তাকে।
শুধু সুষমা নয়, মধুপুরের পাহাড়ি এলাকায় আনারস, কলা, হলুদ, আদা, ফল ও সবজি বাগানসহ কৃষিকাজে শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন বহু দরিদ্র গারো, কোচ ও বাঙালি নারী। বেসরকারি সংস্থা সেডের এক জরিপে দেখা যায়, মধুপুর উপজেলার অরনখোলা, শোলাকুড়ি, বেড়িবাইদ, ফুলবাগচালা, কুড়াগাছা ও আউসনারা ইউনিয়নে প্রায় ৫ হাজার বিত্তহীন ও দরিদ্র নারী দিনমজুরি করে সংসার চালান। এদের সিংহভাগ আবার গারো ও কোচসম্প্রদায়ের। এক সময়কার কর্মসংস্থান ও খাদ্যের উত্স প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হওয়ায় এবং তাদের জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অভাব অনটন দিন দিন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা অন্তরায় হওয়ায় এলাকায় বিকল্প কোনো কর্মসংস্থান গড়ে ওঠেনি। তাই গারো ও কোচ তরুণীদের বড় একটি অংশ বিউটি পার্লারে কাজ করছেন। তবে অপেক্ষাকৃত বয়স্ক নারী, যাদের বাচ্চাকাচ্চা ও প্রবীণদের দেখাশোনা করতে হয়, তারাই বাড়িতে থেকে দিনমজুরি করেন।
শোলাকুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ডিকসন নকরেক জানান, পাহাড়ি এলাকায় বাণিজ্যিক ফল, মসলা ও সবজির খামার বেড়েছে। আর এসব খামারে সস্তা শ্রমের শিকার হচ্ছেন নারী শ্রমিকরা। বেড়িবাইদ গ্রামের দিনমজুর অনিতা সাংমা জানান, গারো ও বাঙালিরা জমিজমা বহিরাগত মহাজনের কাছে লিজ দিয়েছেন। তারা এসব জমিতে কলা, আনারস, পেয়ারা এবং হলুদ ও আদার বাগান গড়ে তুলেছেন। বিত্তহীন নারীরা এখানে শ্রম দেন। কয়েক বছর ধরে জমিতে ভালো ফলন হচ্ছে। সব ফল ও মসলার বাজারমূল্যও বেশ। মহাজনরা আবাদ করে প্রচুর লাভবান হলেও খেটে খাওয়া শ্রমিক বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের মজুরি বাড়ছে না।
গাছাবাড়ী গ্রামের নারী শ্রমিক বিউটি মৃ জানান, পুরুষ শ্রমিকরা যেখানে মজুরি পান ৫০০ টাকা, সেখানে নারীরা ৩০০ টাকা। অথচ কাজের সময়কাল ও ধরন একই এবং কোনো কোনো সময় বেশি খাটানোর প্রবণতাও দেখা যায়। কিন্তু প্রতিবাদ করার সুযোগ নেই। মুখ খুললেই বাগানে আসতে নিষেধ করা হয়। কাকড়াগুণি গ্রামের নারী শ্রমিক অর্চনা নকরেক জানান, সারা দিন খেটে যে মজুরি পাওয়া যায়, তা দিয়ে সংসার চলে না। কারণ চাল, ডাল, তেল, নুনসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। বাড়েনি শুধু আমাদের পারিশ্রমিক।
জয়নাগাছা গ্রামের সীতা নকরেক জানান, সারা বছর পাহাড়ে কাজ থাকে না। তখন তাদের অর্ধাহারে-অনাহারে থাকতে হয়। পুরুষ শ্রমিকের পারিশ্রমিক এবার বেড়েছে। তাহলে নারী শ্রমিকদের দোষ কোথায়? পুরুষ আর নারী শ্রমিকের ঘামের গন্ধে তো কোনো পার্থক্য নেই। ভেদুরিয়া গ্রামের নারী-উদ্যোক্তা মুনমুন নকরেক জানান, পাহাড়ের অধিকাংশ গারো ও কোচরা দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। তাই শ্রম এখানে সস্তা। মহাজনরা দয়া করে যা দেন, তা নিয়েই নারী শ্রমিকদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়। প্রতিবাদ করলে কাজ দেয় না। খামারের মালিক সমিতির নেতা আখতার হোসেন জানান, সস্তাশ্রম পাওয়া গেলে কেন বাড়তি পারিশ্রমিক দেবেন তারা?
